ঢাকা ০৪:১২ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬, ১৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে ৭১ সালের যুদ্ধে ভারতের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ?

নিজস্ব সংবাদ :

মনিরুজ্জামান মনির ,প্রধান প্রতিবেদক।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, ভারতের ভূমিকা এবং ১৯৭১ সালের আঞ্চলিক রাজনীতি নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। সম্প্রতি ভারতের সংসদে কংগ্রেস নেত্রী প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর এক বক্তব্য এই আলোচনাকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।

ভারতের সংসদে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি তার দাদি ও ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর নেতৃত্বের প্রশংসা করেন। প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর ভাষ্য অনুযায়ী, ইন্দিরা গান্ধীর দূরদর্শী কূটনীতি, রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ের সক্ষমতার ফলে এমন একটি পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়, যার পরিণতিতে পাকিস্তান বিভক্ত হয়ে বাংলাদেশের জন্ম হয়। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, এত বড় সামরিক ও রাজনৈতিক সাফল্যকে ইন্দিরা গান্ধী ব্যক্তিগত রাজনৈতিক লাভের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেননি।

এই বক্তব্যকে ঘিরে আবারও প্রশ্ন উঠেছে—১৯৭১ সালে ভারতের মূল উদ্দেশ্য কী ছিল? মানবিক দায়িত্ব, কৌশলগত নিরাপত্তা, নাকি আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে ১৯৭১ সালের সামগ্রিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করতে হয়। ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলেও পাকিস্তানের সামরিক শাসকগোষ্ঠী জনগণের রায় মেনে ক্ষমতা হস্তান্তর করেনি। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ভাষণ বাঙালির স্বাধীনতার সংগ্রামকে নতুন দিকনির্দেশনা দেয়। এরপর ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ‘অপারেশন সার্চলাইট’ পরিচালনা করে, যার মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তানে ব্যাপক গণহত্যা, দমন-পীড়ন ও ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়। এই ঘটনাই মুক্তিযুদ্ধের সূচনাকে অনিবার্য করে তোলে।

মুক্তিযুদ্ধের শুরুর দিনগুলোতে তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমানও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন, যা দেশের ভেতরে ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মুক্তিযুদ্ধের বার্তা দ্রুত ছড়িয়ে দিতে সহায়ক হয়। পরবর্তীতে তিনি মুক্তিযুদ্ধে সেক্টর কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং সম্মুখযুদ্ধে নেতৃত্ব দেন। তাঁর বীরত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার তাঁকে ‘বীর উত্তম’ খেতাবে ভূষিত করে।

১৭ এপ্রিল ১৯৭১ সালে গঠিত মুজিবনগর সরকার মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক নেতৃত্ব দেয় এবং সারা দেশে ১১টি সেক্টরের মাধ্যমে সশস্ত্র প্রতিরোধ সংগঠিত হয়। মুক্তিযোদ্ধাদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষ, ছাত্র, কৃষক, শ্রমিক, নারী ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ স্বাধীনতার সংগ্রামে অংশ নেন।

পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর অভিযানের ফলে এক কোটিরও বেশি শরণার্থী ভারতে আশ্রয় নেয়। এত বিপুল সংখ্যক মানুষের চাপ ভারতের অর্থনীতি, প্রশাসন ও নিরাপত্তার ওপর বড় প্রভাব ফেলে। একই সঙ্গে মানবিক বিপর্যয়ের খবর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়, যা বিশ্ব জনমতকে বাংলাদেশের পক্ষে প্রভাবিত করতে শুরু করে।

ভারত একদিকে মানবিক সংকট মোকাবিলা করছিল, অন্যদিকে নিজের নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বার্থও বিবেচনা করছিল। ১৯৭১ সালের আগস্টে ভারতের সঙ্গে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের ২০ বছর মেয়াদি মৈত্রী ও সহযোগিতা চুক্তি দেশটির কূটনৈতিক অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন সে সময় পাকিস্তানের প্রতি তুলনামূলকভাবে সহানুভূতিশীল অবস্থানে ছিল। ফলে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ দক্ষিণ এশিয়ার সীমা ছাড়িয়ে স্নায়ুযুদ্ধের বৈশ্বিক ভূরাজনীতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে পরিণত হয়।

১৯৭১ সালের ৩ ডিসেম্বর পাকিস্তান পশ্চিম সীমান্তে ভারতের বিমানঘাঁটিতে হামলা চালানোর পর ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। ৬ ডিসেম্বর ভারত ও ভুটান বাংলাদেশকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এরপর মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর যৌথ অভিযানে পাকিস্তানি বাহিনী দ্রুত কোণঠাসা হয়ে পড়ে এবং ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করে। এর মধ্য দিয়ে বিশ্বের মানচিত্রে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে।

তবে ইতিহাসের আরেকটি অনস্বীকার্য সত্য হলো—বাংলাদেশের স্বাধীনতার মূল ভিত্তি ছিল এ দেশের জনগণের দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম, মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মত্যাগ এবং সাধারণ মানুষের অকুণ্ঠ সমর্থন। ভারতের সামরিক, কূটনৈতিক ও মানবিক সহায়তা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে শুধুমাত্র ভারতের কৌশলগত সাফল্য হিসেবে ব্যাখ্যা করা ইতিহাসকে অসম্পূর্ণ করে।

স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ২৫ বছর মেয়াদি মৈত্রী, সহযোগিতা ও শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। পরবর্তী দশকগুলোতে দুই দেশের সম্পর্ক বিভিন্ন সময়ে উষ্ণ ও শীতল—উভয় পর্যায় অতিক্রম করেছে। বর্তমানে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন, তিস্তা চুক্তি, বাণিজ্য, জ্বালানি, বিদ্যুৎ, সংযোগ, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং চীন-ভারত ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা দুই দেশের সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের বিভিন্ন সরকারের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের প্রকৃতি সময়ে সময়ে ভিন্ন ছিল। অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষকের মতে, ভারত সাধারণত এমন সরকারকে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যের সঙ্গে দেখে, যাদের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা, সীমান্ত নিরাপত্তা, আঞ্চলিক সংযোগ এবং কৌশলগত নীতিতে সমন্বয় সহজ হয়।  এ কারণে অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষকের মতে , ভারত আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রতি তুলনামূলকভাবে বেশি ইতিবাচক অবস্থান নিয়েছে। তবে অন্য বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের মূল লক্ষ্য কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল নয়; বরং যে সরকার ভারতের নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থের সঙ্গে কার্যকরভাবে কাজ করতে পারে, তার সঙ্গেই ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখা। একই সময়ে বাংলাদেশের জন্যও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—যে সরকারই ক্ষমতায় থাকুক, তার পররাষ্ট্রনীতি যেন দেশের সার্বভৌমত্ব, জাতীয় স্বার্থ এবং জনগণের দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়।

বাংলাদেশের মানুষের মধ্যেও জাতীয় স্বার্থ, আত্মমর্যাদা এবং স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা বেড়েছে। অনেক বিশ্লেষকের মতে, একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তার নিজস্ব সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা। প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব বজায় রাখা যেমন জরুরি, তেমনি জাতীয় স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব, অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষা করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

আজকের বাংলাদেশ আর ১৯৭১ কিংবা ১৯৭২ সালের বাংলাদেশ নয়। স্বাধীনতার পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পরে দেশটি দক্ষিণ এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। ফলে বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্কও এখন ইতিহাসের আবেগের পাশাপাশি পারস্পরিক স্বার্থ, সমতা, সম্মান এবং বাস্তববাদী কূটনীতির ভিত্তিতে এগিয়ে নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা আরও বেশি।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা কোনো একক ব্যক্তি বা একক রাষ্ট্রের দান নয়; এটি এ দেশের কোটি মানুষের সংগ্রাম, আত্মত্যাগ ও রক্তের বিনিময়ে অর্জিত। ভারতের সহায়তা ছিল গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সেই সহায়তা বাংলাদেশের জনগণের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষার বিকল্প নয়। একইভাবে ১৯৭১ সালের ঘটনাপ্রবাহে ভারতের কূটনৈতিক ও সামরিক ভূমিকার গুরুত্বও ইতিহাসের অংশ।

ইতিহাসের মর্যাদা রক্ষার সর্বোত্তম উপায় হলো তথ্যভিত্তিক গবেষণা, প্রমাণনির্ভর আলোচনা এবং জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া। ইতিহাস থেকে বিভাজন নয়, বরং আত্মবিশ্বাস, পারস্পরিক সম্মান এবং শান্তিপূর্ণ সহযোগিতার শিক্ষা নিয়েই বাংলাদেশকে ভবিষ্যতের পথে এগিয়ে যেতে হবে।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

আপলোডকারীর তথ্য

বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে ৭১ সালের যুদ্ধে ভারতের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ?

আপডেট সময় ০৩:০০:০৫ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬

মনিরুজ্জামান মনির ,প্রধান প্রতিবেদক।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, ভারতের ভূমিকা এবং ১৯৭১ সালের আঞ্চলিক রাজনীতি নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। সম্প্রতি ভারতের সংসদে কংগ্রেস নেত্রী প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর এক বক্তব্য এই আলোচনাকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।

ভারতের সংসদে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি তার দাদি ও ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর নেতৃত্বের প্রশংসা করেন। প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর ভাষ্য অনুযায়ী, ইন্দিরা গান্ধীর দূরদর্শী কূটনীতি, রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ের সক্ষমতার ফলে এমন একটি পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়, যার পরিণতিতে পাকিস্তান বিভক্ত হয়ে বাংলাদেশের জন্ম হয়। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, এত বড় সামরিক ও রাজনৈতিক সাফল্যকে ইন্দিরা গান্ধী ব্যক্তিগত রাজনৈতিক লাভের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেননি।

এই বক্তব্যকে ঘিরে আবারও প্রশ্ন উঠেছে—১৯৭১ সালে ভারতের মূল উদ্দেশ্য কী ছিল? মানবিক দায়িত্ব, কৌশলগত নিরাপত্তা, নাকি আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে ১৯৭১ সালের সামগ্রিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করতে হয়। ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলেও পাকিস্তানের সামরিক শাসকগোষ্ঠী জনগণের রায় মেনে ক্ষমতা হস্তান্তর করেনি। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ভাষণ বাঙালির স্বাধীনতার সংগ্রামকে নতুন দিকনির্দেশনা দেয়। এরপর ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ‘অপারেশন সার্চলাইট’ পরিচালনা করে, যার মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তানে ব্যাপক গণহত্যা, দমন-পীড়ন ও ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়। এই ঘটনাই মুক্তিযুদ্ধের সূচনাকে অনিবার্য করে তোলে।

মুক্তিযুদ্ধের শুরুর দিনগুলোতে তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমানও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন, যা দেশের ভেতরে ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মুক্তিযুদ্ধের বার্তা দ্রুত ছড়িয়ে দিতে সহায়ক হয়। পরবর্তীতে তিনি মুক্তিযুদ্ধে সেক্টর কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং সম্মুখযুদ্ধে নেতৃত্ব দেন। তাঁর বীরত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার তাঁকে ‘বীর উত্তম’ খেতাবে ভূষিত করে।

১৭ এপ্রিল ১৯৭১ সালে গঠিত মুজিবনগর সরকার মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক নেতৃত্ব দেয় এবং সারা দেশে ১১টি সেক্টরের মাধ্যমে সশস্ত্র প্রতিরোধ সংগঠিত হয়। মুক্তিযোদ্ধাদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষ, ছাত্র, কৃষক, শ্রমিক, নারী ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ স্বাধীনতার সংগ্রামে অংশ নেন।

পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর অভিযানের ফলে এক কোটিরও বেশি শরণার্থী ভারতে আশ্রয় নেয়। এত বিপুল সংখ্যক মানুষের চাপ ভারতের অর্থনীতি, প্রশাসন ও নিরাপত্তার ওপর বড় প্রভাব ফেলে। একই সঙ্গে মানবিক বিপর্যয়ের খবর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়, যা বিশ্ব জনমতকে বাংলাদেশের পক্ষে প্রভাবিত করতে শুরু করে।

ভারত একদিকে মানবিক সংকট মোকাবিলা করছিল, অন্যদিকে নিজের নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বার্থও বিবেচনা করছিল। ১৯৭১ সালের আগস্টে ভারতের সঙ্গে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের ২০ বছর মেয়াদি মৈত্রী ও সহযোগিতা চুক্তি দেশটির কূটনৈতিক অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন সে সময় পাকিস্তানের প্রতি তুলনামূলকভাবে সহানুভূতিশীল অবস্থানে ছিল। ফলে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ দক্ষিণ এশিয়ার সীমা ছাড়িয়ে স্নায়ুযুদ্ধের বৈশ্বিক ভূরাজনীতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে পরিণত হয়।

১৯৭১ সালের ৩ ডিসেম্বর পাকিস্তান পশ্চিম সীমান্তে ভারতের বিমানঘাঁটিতে হামলা চালানোর পর ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। ৬ ডিসেম্বর ভারত ও ভুটান বাংলাদেশকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এরপর মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর যৌথ অভিযানে পাকিস্তানি বাহিনী দ্রুত কোণঠাসা হয়ে পড়ে এবং ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করে। এর মধ্য দিয়ে বিশ্বের মানচিত্রে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে।

তবে ইতিহাসের আরেকটি অনস্বীকার্য সত্য হলো—বাংলাদেশের স্বাধীনতার মূল ভিত্তি ছিল এ দেশের জনগণের দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম, মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মত্যাগ এবং সাধারণ মানুষের অকুণ্ঠ সমর্থন। ভারতের সামরিক, কূটনৈতিক ও মানবিক সহায়তা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে শুধুমাত্র ভারতের কৌশলগত সাফল্য হিসেবে ব্যাখ্যা করা ইতিহাসকে অসম্পূর্ণ করে।

স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ২৫ বছর মেয়াদি মৈত্রী, সহযোগিতা ও শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। পরবর্তী দশকগুলোতে দুই দেশের সম্পর্ক বিভিন্ন সময়ে উষ্ণ ও শীতল—উভয় পর্যায় অতিক্রম করেছে। বর্তমানে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন, তিস্তা চুক্তি, বাণিজ্য, জ্বালানি, বিদ্যুৎ, সংযোগ, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং চীন-ভারত ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা দুই দেশের সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের বিভিন্ন সরকারের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের প্রকৃতি সময়ে সময়ে ভিন্ন ছিল। অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষকের মতে, ভারত সাধারণত এমন সরকারকে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যের সঙ্গে দেখে, যাদের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা, সীমান্ত নিরাপত্তা, আঞ্চলিক সংযোগ এবং কৌশলগত নীতিতে সমন্বয় সহজ হয়।  এ কারণে অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষকের মতে , ভারত আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রতি তুলনামূলকভাবে বেশি ইতিবাচক অবস্থান নিয়েছে। তবে অন্য বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের মূল লক্ষ্য কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল নয়; বরং যে সরকার ভারতের নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থের সঙ্গে কার্যকরভাবে কাজ করতে পারে, তার সঙ্গেই ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখা। একই সময়ে বাংলাদেশের জন্যও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—যে সরকারই ক্ষমতায় থাকুক, তার পররাষ্ট্রনীতি যেন দেশের সার্বভৌমত্ব, জাতীয় স্বার্থ এবং জনগণের দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়।

বাংলাদেশের মানুষের মধ্যেও জাতীয় স্বার্থ, আত্মমর্যাদা এবং স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা বেড়েছে। অনেক বিশ্লেষকের মতে, একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তার নিজস্ব সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা। প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব বজায় রাখা যেমন জরুরি, তেমনি জাতীয় স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব, অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষা করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

আজকের বাংলাদেশ আর ১৯৭১ কিংবা ১৯৭২ সালের বাংলাদেশ নয়। স্বাধীনতার পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পরে দেশটি দক্ষিণ এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। ফলে বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্কও এখন ইতিহাসের আবেগের পাশাপাশি পারস্পরিক স্বার্থ, সমতা, সম্মান এবং বাস্তববাদী কূটনীতির ভিত্তিতে এগিয়ে নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা আরও বেশি।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা কোনো একক ব্যক্তি বা একক রাষ্ট্রের দান নয়; এটি এ দেশের কোটি মানুষের সংগ্রাম, আত্মত্যাগ ও রক্তের বিনিময়ে অর্জিত। ভারতের সহায়তা ছিল গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সেই সহায়তা বাংলাদেশের জনগণের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষার বিকল্প নয়। একইভাবে ১৯৭১ সালের ঘটনাপ্রবাহে ভারতের কূটনৈতিক ও সামরিক ভূমিকার গুরুত্বও ইতিহাসের অংশ।

ইতিহাসের মর্যাদা রক্ষার সর্বোত্তম উপায় হলো তথ্যভিত্তিক গবেষণা, প্রমাণনির্ভর আলোচনা এবং জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া। ইতিহাস থেকে বিভাজন নয়, বরং আত্মবিশ্বাস, পারস্পরিক সম্মান এবং শান্তিপূর্ণ সহযোগিতার শিক্ষা নিয়েই বাংলাদেশকে ভবিষ্যতের পথে এগিয়ে যেতে হবে।