ফেসবুকের প্রেম, ব্যক্তিগত ছবি ও পরিণতি: স্বামী-স্ত্রীর পরিকল্পনায় তরুণ খুন
ফেসবুকে পরিচয়, এরপর প্রেমের সম্পর্ক। ব্যক্তিগত ছবি ও বার্তা আদান-প্রদান ঘিরে সেই সম্পর্কে তৈরি হয় জটিলতা। একপর্যায়ে বিষয়টি জানতে পারেন তরুণীর স্বামী। দাম্পত্য সম্পর্কে তৈরি হওয়া সন্দেহ ও উত্তেজনার মধ্যে শেষ পর্যন্ত প্রেমিককে হত্যার পরিকল্পনা করেন স্বামী-স্ত্রী। রাজধানীর বছিলার একটি মেসে ডেকে নিয়ে সাজ্জাদ হোসেন (২৪) নামের এক তরুণকে হত্যার পর তাঁর মরদেহ খণ্ডিত করে বিভিন্ন স্থানে ফেলে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে তাঁদের বিরুদ্ধে।
মামলাটির তদন্ত শেষে আদালতে দেওয়া অভিযোগপত্রে এসব তথ্য উল্লেখ করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। বর্তমানে মামলাটি সাক্ষ্য গ্রহণ পর্যায়ে রয়েছে। আগামী ৩১ আগস্ট পরবর্তী সাক্ষ্য গ্রহণের দিন ধার্য করা হয়েছে।
ভুয়া ফেসবুক আইডি থেকে পরিচয়
পিবিআইয়ের তদন্ত অনুযায়ী, সাজ্জাদের সঙ্গে সুমাইয়া তৃষ্ণা (২৬) নামের এক তরুণীর পরিচয় হয় একটি ভুয়া ফেসবুক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে। পরিচয়ের পর তাঁদের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয় এবং একপর্যায়ে তা প্রেমের সম্পর্কে রূপ নেয়।
সাজ্জাদ সাভারের হেমায়েতপুরে মা-বাবার সঙ্গে থাকতেন। তিনি ছিলেন তাঁদের একমাত্র সন্তান। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরিও করতেন। অন্যদিকে সুমাইয়া ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। তাঁর স্বামী রোকনুজ্জামান পলাশও একই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী।
তদন্তে বলা হয়েছে, সাজ্জাদ ও সুমাইয়ার মধ্যে ব্যক্তিগত ছবি আদান-প্রদান ও ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের বিষয়টি জানতে পারেন রোকনুজ্জামান। এরপর তাঁদের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়। সুমাইয়া তাঁর স্বামীর কাছে সম্পর্কের প্রকৃত তথ্য গোপন করেন এবং পরে হত্যার পরিকল্পনায় সম্মত হন বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
বছিলার মেসে ডেকে নেওয়া হয় সাজ্জাদকে
পিবিআইয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ২ এপ্রিল রাতে রোকনুজ্জামান অন্য একজনের নামে নিবন্ধিত একটি সিম সংগ্রহ করেন। ওই নম্বর ব্যবহার করে সাজ্জাদকে ফোন করা হয়। পরদিন সকালে বছিলার একটি মেসে তাঁকে আসতে বলা হয়।
৩ এপ্রিল সকালে সাজ্জাদ ওই মেসে পৌঁছালে আগে থেকেই সেখানে অবস্থান করছিলেন রোকনুজ্জামান। অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, তিনি গোসলখানায় লুকিয়ে ছিলেন। সাজ্জাদ কক্ষে প্রবেশের পর পেছন থেকে তাঁর ওপর হামলা চালানো হয়। একপর্যায়ে তিনি নিস্তেজ হয়ে পড়েন।
রোকনুজ্জামানের জবানবন্দি অনুযায়ী, ঘটনার পর কক্ষের মেঝেতে রক্ত ছড়িয়ে পড়ে। মরদেহ সরিয়ে নেওয়া সম্ভব না হওয়ায় সেটিকে খণ্ডিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
মরদেহের খণ্ড নিয়ে দুই জেলায়
অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, মরদেহ সরানোর জন্য চালের বস্তা, ব্যাগ, কার্টন ও টেপ সংগ্রহ করা হয়। পরে খণ্ডিত মরদেহ তিনটি কার্টনে ভরে রাতের বেলায় একটি ভাড়া করা গাড়িতে করে নিয়ে যাওয়া হয়।
একটি কার্টন মুন্সিগঞ্জের মেদিনীমণ্ডল এলাকায় ফেলে দেওয়া হয়। অন্য দুটি কার্টন কেরানীগঞ্জের নির্জন এলাকায় রেখে আসার অভিযোগ রয়েছে।
পরদিন একটি কার্টন থেকে কুকুরের মাধ্যমে মরদেহের অংশ বেরিয়ে আসার পর বিষয়টি পুলিশের নজরে আসে। পরে মুন্সিগঞ্জ থেকেও আরেকটি কার্টন উদ্ধার করা হয়।
উদ্ধার হওয়া মরদেহের অংশগুলো স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। ফিঙ্গারপ্রিন্ট, হাড়, দাঁত ও নখের নমুনা পরীক্ষা এবং ডিএনএ বিশ্লেষণের পর সেগুলো সাজ্জাদের বলে নিশ্চিত হয় পিবিআই।
প্রযুক্তির সূত্র ধরে শনাক্ত
সাজ্জাদের সন্ধান না পেয়ে তাঁর বাবা ৩ এপ্রিল রাতে সাভার মডেল থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছিলেন। পরে মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় সেটি হত্যা মামলায় রূপ নেয়।
তদন্ত কর্মকর্তার ভাষ্য, শুরুতে মামলাটি ছিল অনেকটাই সূত্রহীন। পরে মুঠোফোনের কল রেকর্ড, অবস্থান ও অন্যান্য প্রযুক্তিগত তথ্য বিশ্লেষণ করে তদন্ত এগিয়ে নেয় পিবিআই।
যে সিম ব্যবহার করে সাজ্জাদকে ফোন করা হয়েছিল, সেটির সূত্র ধরে প্রথমে এক রিকশাচালকের সন্ধান পাওয়া যায়। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি জানান, ৫০০ টাকার বিনিময়ে তাঁর নামে নিবন্ধিত সিমটি অন্য একজন নিয়েছিলেন। সেখান থেকে তদন্তকারীরা রোকনুজ্জামানের কাছে পৌঁছান। পরে শনাক্ত হন সুমাইয়াও।
সীমান্ত দিয়ে পালানোর চেষ্টার অভিযোগ
হত্যাকাণ্ডের পর ভারত পালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন রোকনুজ্জামান ও সুমাইয়া—এমন তথ্যও তদন্তে উঠে এসেছে। রোকনুজ্জামানের বাড়ি চুয়াডাঙ্গার জীবননগরে হওয়ায় ওই সীমান্তপথ ব্যবহার করার পরিকল্পনা ছিল বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
নিজের অবস্থান আড়াল করতে সুমাইয়া ব্যবহৃত সিম ফেনীতে রেখে অন্য একটি পথে জীবননগরের উদ্দেশে রওনা হন। প্রযুক্তিগত নজরদারির মাধ্যমে তাঁর অবস্থান শনাক্ত করে পুলিশ।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, একটি বাসে যাত্রীবেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যও ওঠেন। পরে জীবননগরে বাস থেকে নামার পর ৮ এপ্রিল রাত দেড়টার দিকে সুমাইয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়। রোকনুজ্জামানকেও গ্রেপ্তার করা হয়। বর্তমানে দুজনই কারাগারে এবং তাঁদের বিরুদ্ধে দায়ের করা হত্যা মামলার বিচার চলছে।
নিহত সাজ্জাদের বাবা মোহাম্মদ ইউসুফ আলী বলেন, তাঁর ছেলে কোনো ধরনের শত্রুতার মধ্যে ছিলেন না। তিনি ছেলের হত্যার বিচার দাবি করেছেন।
মামলায় পিবিআই মোট ৪০ জনকে সাক্ষী করেছে। ২০২৫ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর রোকনুজ্জামান ও সুমাইয়ার বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হয়। এখন আদালতে সাক্ষ্য গ্রহণ চলছে।

























