প্রতি মাসের প্রথম শনিবার ‘ক্লিনিং ডে’ পালন করবে ডিএসসিসি, জানালেন প্রশাসক
রাজধানীতে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ, জলাবদ্ধতা কমানো এবং নগরকে আরও পরিচ্ছন্ন রাখতে প্রতি মাসের প্রথম শনিবার ‘ক্লিনিং ডে’ পালন করার উদ্যোগ নিয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন (ডিএসসিসি)। এ কর্মসূচিতে নগরবাসীর সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন সংস্থাটির প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুস সালাম।
সোমবার নগরভবনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, রাজধানীর উন্নয়নে শুধু সিটি কর্পোরেশনের উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। প্রশাসন ও নাগরিক—উভয় পক্ষ যদি নিজ নিজ দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করে, তাহলে আগামী দুই বছরের মধ্যেই ঢাকার দৃশ্যমান পরিবর্তন সম্ভব।
তিনি বলেন, বিশ্বের দূষিত শহর, যানজট এবং অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার তালিকায় ঢাকার অবস্থান কোনোভাবেই সন্তোষজনক নয়। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে সিটি কর্পোরেশনকে আরও দক্ষ, জবাবদিহিমূলক ও সেবাকেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের কাজ চলছে।
আবদুস সালামের মতে, একটি শহরের উন্নয়নে প্রশাসন ও জনগণের দায়িত্ব সমান গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, নাগরিকরা যদি নিয়ম মেনে চলেন এবং সিটি কর্পোরেশনও দায়িত্বশীলভাবে সেবা দেয়, তাহলে রাজধানীকে একটি আধুনিক ও বাসযোগ্য নগরীতে রূপ দেওয়া সম্ভব।
তিনি জানান, আধুনিক নগর ব্যবস্থাপনায় পর্যাপ্ত সড়কবাতি, নিয়মিত বর্জ্য অপসারণ এবং পরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। দীর্ঘদিন বিকল অবস্থায় স্ট্রিট লাইট পড়ে থাকা কিংবা বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় অবহেলা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না।
পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম প্রসঙ্গে তিনি বলেন, নির্ধারিত কর্মীরা নিয়মিত দায়িত্ব পালন করলে শহর পরিষ্কার রাখা কঠিন নয়। তবে নাগরিকদেরও যত্রতত্র ময়লা না ফেলে নির্ধারিত ব্যবস্থার মাধ্যমে বর্জ্য অপসারণে সহযোগিতা করতে হবে। বর্তমানে বাড়ি থেকে বর্জ্য সংগ্রহের পাশাপাশি বাজার ও বাণিজ্যিক এলাকার জন্যও আলাদা ব্যবস্থা রয়েছে।
রাজধানীর জলাবদ্ধতার বিষয়ে তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে দখল, ভরাট এবং রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অনেক খালের স্বাভাবিক প্রবাহ নষ্ট হয়েছে। কোথাও খালের প্রস্থ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে, আবার অনেক খাল প্লাস্টিক ও অন্যান্য বর্জ্যে ভরে যাওয়ায় বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশন ব্যাহত হচ্ছে।
তিনি জানান, ড্রেন ও খাল নিয়মিত পরিষ্কার না হওয়ায় অল্প বৃষ্টিতেই নগরীর বিভিন্ন এলাকায় পানি জমে যায়। এ সমস্যা মোকাবিলায় জলাবদ্ধতাপ্রবণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে দ্রুত কার্যক্রম নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে আধুনিক ভূগর্ভস্থ ড্রেনেজ ব্যবস্থা গড়ে তুলে বৃষ্টির পানি সরাসরি বুড়িগঙ্গা নদীতে নিষ্কাশনের পরিকল্পনাও রয়েছে।
ডিএসসিসি প্রশাসক বলেন, রাজধানীতে পর্যাপ্ত পানি নিষ্কাশনের পথ নেই। এ জন্য অন্তত ২০ থেকে ৩০টি নতুন করিডোর প্রয়োজন। সরকারের সহযোগিতায় চলতি বছর দুটি নতুন সংযোগপথ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এগুলো চালু হলে আগামী বছর থেকে জলাবদ্ধতার সময়কাল অনেকটাই কমে আসবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে তিনি বলেন, মৌসুম শুরুর আগেই দক্ষিণ সিটির সব ওয়ার্ডে পরিচালিত জরিপে প্রায় ৬০ শতাংশ এলাকায় এডিস মশার লার্ভা শনাক্ত হয়েছে, যা ঝুঁকির ইঙ্গিত দিচ্ছে।
তার ভাষায়, শুধু মশকনাশক প্রয়োগ করে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। বাড়ির ছাদ, বারান্দা, ফুলের টব, পরিত্যক্ত পাত্র বা যেকোনো স্থানে দুই থেকে তিন দিনের বেশি পানি জমে থাকতে দেওয়া যাবে না।
ডেঙ্গু প্রতিরোধে সচেতনতাকেই সবচেয়ে কার্যকর উপায় উল্লেখ করে তিনি বলেন, চিকিৎসার চেয়ে প্রতিরোধই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এ লক্ষ্যেই প্রতি মাসের প্রথম শনিবার ‘ক্লিনিং ডে’ পালন করা হবে। ওই দিন নগরবাসীকে নিজ নিজ বাড়ি, আঙিনা, ছাদ এবং আশপাশের এলাকা পরিষ্কার করার পাশাপাশি কোথাও যাতে পানি জমে না থাকে, তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হবে। এছাড়া মসজিদের ইমাম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের মাধ্যমে ব্যাপক সচেতনতামূলক প্রচারণা পরিচালনা করা হবে।
সিটি কর্পোরেশনের আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়েও গুরুত্ব দিয়ে আবদুস সালাম বলেন, শুধু হোল্ডিং ট্যাক্সের ওপর নির্ভর না করে নতুন রাজস্ব উৎস তৈরি করতে হবে। এ বিষয়ে সরকারের কাছে কয়েকটি প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি তিনি নাগরিকদের নিয়মিত কর পরিশোধ, ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন এবং বকেয়া রাজস্ব পরিশোধের আহ্বান জানান।
ফুটপাত দখল ও হকার সমস্যা নিয়ে তিনি বলেন, দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে প্রতিনিয়ত মানুষের ঢাকামুখী হওয়ায় নগর ব্যবস্থাপনার ওপর চাপ বাড়ছে। ফুটপাত পথচারীদের জন্য উন্মুক্ত রাখতে হবে, তবে জীবিকার বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হবে। তাই হকারদের জন্য মানবিক ও পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হবে। জোরপূর্বক উচ্ছেদের পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের দিকেই গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার।
শেষে ডিএসসিসি প্রশাসক বলেন, পরিচ্ছন্ন, আধুনিক ও টেকসই রাজধানী গড়তে প্রশাসন, বিভিন্ন সরকারি সংস্থা এবং সাধারণ মানুষের সমন্বিত প্রচেষ্টা অপরিহার্য। সবাই নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করলে অল্প সময়ের মধ্যেই ঢাকাকে আরও পরিচ্ছন্ন, নিরাপদ ও বাসযোগ্য নগরীতে রূপান্তর করা সম্ভব হবে।


























