ঢাকা ১২:৩৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

নবম পে স্কেলে নতুন গতি, উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন: বাড়তে পারে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন

নিজস্ব সংবাদ :

দীর্ঘদিনের আলোচনার পর নবম জাতীয় পে স্কেল বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ায় আবারও নতুন গতি এসেছে। বিচার বিভাগীয় বেতন কমিশনের সুপারিশ পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় মতামত দেওয়ার জন্য সরকার সাত সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করেছে। এতে সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছে।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের জারি করা প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস পে কমিশন-২০২৫ এর প্রতিবেদন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বাস্তবসম্মত সুপারিশ তৈরি করাই হবে এই কমিটির মূল দায়িত্ব। কমিটির নেতৃত্বে রয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। প্রয়োজন হলে কমিটি অতিরিক্ত সদস্যও অন্তর্ভুক্ত করতে পারবে।

শিগগিরই মন্ত্রিসভায় উঠতে পারে প্রস্তাব

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, চলতি মাসের শেষ দিকে অথবা এর কিছুদিনের মধ্যেই নবম পে স্কেল সংক্রান্ত প্রস্তাব মন্ত্রিসভার বৈঠকে উপস্থাপন করা হতে পারে। সেখানে অনুমোদন মিললে পরবর্তী ধাপে আনুষ্ঠানিক প্রজ্ঞাপন জারির কার্যক্রম শুরু হবে। তবে নতুন বেতন কাঠামো কোন তারিখ থেকে কার্যকর হবে, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।

বড় চ্যালেঞ্জ আর্থিক চাপ

অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকারের সবচেয়ে বড় বিবেচ্য বিষয় হচ্ছে অতিরিক্ত আর্থিক ব্যয়। বেতন উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানো হলে সরকারের বার্ষিক ব্যয় অনেক বৃদ্ধি পেতে পারে। পাশাপাশি বাজারে মূল্যস্ফীতির ওপরও এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এ কারণে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) দ্রুত বাস্তবায়নের পরিবর্তে বিষয়টি কিছুটা সময় নিয়ে করার পরামর্শ দিয়েছে বলে জানা গেছে। তবে সরকার পুরো উদ্যোগ স্থগিত না রেখে আর্থিক সক্ষমতা অনুযায়ী ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের বিকল্পও বিবেচনা করছে

১০ বছর পর নতুন বেতন কাঠামোর আলোচনা

বাংলাদেশে সর্বশেষ অষ্টম জাতীয় পে স্কেল কার্যকর হয়েছিল ২০১৫ সালে। এরপর এক দশকের বেশি সময় ধরে নতুন কোনো জাতীয় বেতন কাঠামো ঘোষণা হয়নি। এ সময় সরকারি চাকরিজীবীদের নিয়মিত বার্ষিক বৃদ্ধি থাকলেও জীবনযাত্রার ব্যয় ও মূল্যস্ফীতি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ায় নবম পে স্কেলের দাবি ক্রমেই জোরালো হয়ে ওঠে।

কী ছিল পে কমিশনের সুপারিশ?

২০২৫ সালের জুলাইয়ে নবম পে কমিশন সরকারের কাছে তাদের প্রতিবেদন জমা দেয়। সেখানে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মূল বেতন ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়।

প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী—

  • সর্বনিম্ন মূল বেতন: ৮,২৫০ টাকা থেকে ২০,০০০ টাকা
  • সর্বোচ্চ মূল বেতন: ৭৮,০০০ টাকা থেকে ১,৬০,০০০ টাকা

এই সুপারিশ বাস্তবায়িত হলে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতনে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

বিশেষ কমিটির পর্যালোচনার পর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত

নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ২১ এপ্রিল পে কমিশনের সুপারিশগুলো পুনরায় মূল্যায়নের জন্য একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়। বর্তমানে সেই কমিটির পর্যালোচনা ও সুপারিশের ভিত্তিতেই চূড়ান্ত বেতন কাঠামো নির্ধারণের প্রক্রিয়া এগোচ্ছে।

অর্থনীতিবিদদের মত

অর্থনীতিবিদদের মতে, প্রস্তাবিত কাঠামো পুরোপুরি কার্যকর হলে সরকারের বার্ষিক ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাবে। সেই চাপ সামাল দিতে হলে রাজস্ব আয় বাড়ানো, কর প্রশাসন আরও কার্যকর করা এবং সরকারি ব্যয় ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বাড়ানো প্রয়োজন হবে।

সরকারি চাকরিজীবীদের চোখ এখন মন্ত্রিসভার দিকে

নবম পে স্কেল ঘিরে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে ইতোমধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। এখন সবার নজর তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের দিকে—

  1. প্রস্তাবটি কবে মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন হবে
  2. অনুমোদনের পর কখন প্রজ্ঞাপন জারি হবে
  3. নতুন বেতন কাঠামো একসঙ্গে নাকি ধাপে ধাপে কার্যকর করা হবে

সব মিলিয়ে, নবম জাতীয় পে স্কেল বাস্তবায়নের পথে সরকার নতুন করে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ায় দীর্ঘদিনের অপেক্ষার পর সরকারি চাকরিজীবীদের প্রত্যাশা আরও বেড়েছে। এখন দেখার বিষয়, আর্থিক বাস্তবতা ও প্রশাসনিক প্রস্তুতি বিবেচনায় সরকার শেষ পর্যন্ত কী ধরনের বেতন কাঠামো অনুমোদন করে।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

আপলোডকারীর তথ্য

নবম পে স্কেলে নতুন গতি, উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন: বাড়তে পারে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন

আপডেট সময় ০২:২৮:২০ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৩ অগাস্ট ২০২৬

দীর্ঘদিনের আলোচনার পর নবম জাতীয় পে স্কেল বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ায় আবারও নতুন গতি এসেছে। বিচার বিভাগীয় বেতন কমিশনের সুপারিশ পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় মতামত দেওয়ার জন্য সরকার সাত সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করেছে। এতে সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছে।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের জারি করা প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস পে কমিশন-২০২৫ এর প্রতিবেদন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বাস্তবসম্মত সুপারিশ তৈরি করাই হবে এই কমিটির মূল দায়িত্ব। কমিটির নেতৃত্বে রয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। প্রয়োজন হলে কমিটি অতিরিক্ত সদস্যও অন্তর্ভুক্ত করতে পারবে।

শিগগিরই মন্ত্রিসভায় উঠতে পারে প্রস্তাব

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, চলতি মাসের শেষ দিকে অথবা এর কিছুদিনের মধ্যেই নবম পে স্কেল সংক্রান্ত প্রস্তাব মন্ত্রিসভার বৈঠকে উপস্থাপন করা হতে পারে। সেখানে অনুমোদন মিললে পরবর্তী ধাপে আনুষ্ঠানিক প্রজ্ঞাপন জারির কার্যক্রম শুরু হবে। তবে নতুন বেতন কাঠামো কোন তারিখ থেকে কার্যকর হবে, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।

বড় চ্যালেঞ্জ আর্থিক চাপ

অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকারের সবচেয়ে বড় বিবেচ্য বিষয় হচ্ছে অতিরিক্ত আর্থিক ব্যয়। বেতন উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানো হলে সরকারের বার্ষিক ব্যয় অনেক বৃদ্ধি পেতে পারে। পাশাপাশি বাজারে মূল্যস্ফীতির ওপরও এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এ কারণে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) দ্রুত বাস্তবায়নের পরিবর্তে বিষয়টি কিছুটা সময় নিয়ে করার পরামর্শ দিয়েছে বলে জানা গেছে। তবে সরকার পুরো উদ্যোগ স্থগিত না রেখে আর্থিক সক্ষমতা অনুযায়ী ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের বিকল্পও বিবেচনা করছে

১০ বছর পর নতুন বেতন কাঠামোর আলোচনা

বাংলাদেশে সর্বশেষ অষ্টম জাতীয় পে স্কেল কার্যকর হয়েছিল ২০১৫ সালে। এরপর এক দশকের বেশি সময় ধরে নতুন কোনো জাতীয় বেতন কাঠামো ঘোষণা হয়নি। এ সময় সরকারি চাকরিজীবীদের নিয়মিত বার্ষিক বৃদ্ধি থাকলেও জীবনযাত্রার ব্যয় ও মূল্যস্ফীতি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ায় নবম পে স্কেলের দাবি ক্রমেই জোরালো হয়ে ওঠে।

কী ছিল পে কমিশনের সুপারিশ?

২০২৫ সালের জুলাইয়ে নবম পে কমিশন সরকারের কাছে তাদের প্রতিবেদন জমা দেয়। সেখানে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মূল বেতন ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়।

প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী—

  • সর্বনিম্ন মূল বেতন: ৮,২৫০ টাকা থেকে ২০,০০০ টাকা
  • সর্বোচ্চ মূল বেতন: ৭৮,০০০ টাকা থেকে ১,৬০,০০০ টাকা

এই সুপারিশ বাস্তবায়িত হলে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতনে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

বিশেষ কমিটির পর্যালোচনার পর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত

নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ২১ এপ্রিল পে কমিশনের সুপারিশগুলো পুনরায় মূল্যায়নের জন্য একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়। বর্তমানে সেই কমিটির পর্যালোচনা ও সুপারিশের ভিত্তিতেই চূড়ান্ত বেতন কাঠামো নির্ধারণের প্রক্রিয়া এগোচ্ছে।

অর্থনীতিবিদদের মত

অর্থনীতিবিদদের মতে, প্রস্তাবিত কাঠামো পুরোপুরি কার্যকর হলে সরকারের বার্ষিক ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাবে। সেই চাপ সামাল দিতে হলে রাজস্ব আয় বাড়ানো, কর প্রশাসন আরও কার্যকর করা এবং সরকারি ব্যয় ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বাড়ানো প্রয়োজন হবে।

সরকারি চাকরিজীবীদের চোখ এখন মন্ত্রিসভার দিকে

নবম পে স্কেল ঘিরে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে ইতোমধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। এখন সবার নজর তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের দিকে—

  1. প্রস্তাবটি কবে মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন হবে
  2. অনুমোদনের পর কখন প্রজ্ঞাপন জারি হবে
  3. নতুন বেতন কাঠামো একসঙ্গে নাকি ধাপে ধাপে কার্যকর করা হবে

সব মিলিয়ে, নবম জাতীয় পে স্কেল বাস্তবায়নের পথে সরকার নতুন করে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ায় দীর্ঘদিনের অপেক্ষার পর সরকারি চাকরিজীবীদের প্রত্যাশা আরও বেড়েছে। এখন দেখার বিষয়, আর্থিক বাস্তবতা ও প্রশাসনিক প্রস্তুতি বিবেচনায় সরকার শেষ পর্যন্ত কী ধরনের বেতন কাঠামো অনুমোদন করে।