ডেঙ্গুর দাপটে মুগদা হাসপাতাল: ৪৮ শয্যায় ১২৭ রোগী, মেঝেতেও চলছে চিকিৎসা
রাজধানীতে ডেঙ্গুর সংক্রমণ বাড়তে থাকায় রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে মুগদা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল। হাসপাতালের ডেঙ্গু ওয়ার্ডে নির্ধারিত ৪৮টি শয্যার বিপরীতে মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) চিকিৎসা নিচ্ছিলেন ১২৭ জন। ফলে শয্যার সংকট দেখা দেওয়ায় অতিরিক্ত রোগীদের অনেককেই মেঝে ও বারান্দায় রেখে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে।
মঙ্গলবার হাসপাতাল ঘুরে দেখা যায়, ডেঙ্গু ওয়ার্ডের প্রতিটি বেডেই রোগী ভর্তি। জায়গা না পেয়ে বেশ কয়েকজন রোগীর জন্য মেঝেতে বিছানা পেতে দেওয়া হয়েছে। সেখানেই স্যালাইন ও প্রয়োজনীয় ওষুধ দিয়ে চলছে চিকিৎসা।
হাসপাতাল সূত্র বলছে, আগস্টের শুরু থেকেই ডেঙ্গু রোগীর চাপ বাড়তে থাকে। গত ২০ আগস্ট ২০ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হলেও ২১ আগস্ট এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৪০ জনে। ২২ আগস্ট ৩৬ জন, ২৩ আগস্ট ৩৫ জন এবং ২৪ আগস্ট ৪৪ জন রোগী ভর্তি হন। ২৫ আগস্ট দুপুর ২টা পর্যন্ত নতুন করে আরও ২০ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
ডেঙ্গু ওয়ার্ডের সাব-ইনচার্জ নাসিমা জানান, ওয়ার্ডটির ধারণক্ষমতা ৪৮ জন হলেও বর্তমানে রোগী রয়েছেন ১২৭ জন। জুলাই মাসে রোগীর চাপ তুলনামূলক কম থাকলেও আগস্টে হঠাৎ করেই ভর্তি রোগীর সংখ্যা বেড়ে গেছে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, সাধারণত একজন ডেঙ্গু রোগীকে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরতে প্রায় এক সপ্তাহ সময় লাগে। তবে রোগীর অবস্থা গুরুতর হলে চিকিৎসার সময় আরও বাড়তে পারে। এতে নতুন রোগী ভর্তি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শয্যা সংকটও তীব্র হচ্ছে।
মুগদা হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, খিলগাঁও, মুগদা, বনশ্রী, টিকাটুলি, মান্ডা, যাত্রাবাড়ী, বাড্ডা, মাতুয়াইল, ডেমরা, জুরাইনসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে বেশি রোগী আসছেন। ঢাকার বাইরে থেকে আসা রোগীর সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম।
হাসপাতালের মেডিক্যাল অফিসার ডা. সারা বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের মধ্যে তরুণ ও প্রাপ্তবয়স্কদের সংখ্যাই বেশি। শিশু ও বয়স্ক রোগীর সংখ্যা তুলনামূলক কম। এখন পর্যন্ত হাসপাতালে একজন ডেঙ্গু রোগীর মৃত্যু হয়েছে বলেও জানান তিনি।
ডেঙ্গু প্রতিরোধে মশারি ব্যবহারের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন চিকিৎসকরা। পরিবারের একজন সদস্য ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলেও অন্য সদস্যদের মশারি ব্যবহার করে ঘুমানোর পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। চিকিৎসকদের মতে, অনেক রোগীই জানিয়েছেন, তারা নিয়মিত মশারি ব্যবহার করতেন না।
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন বাড্ডার বাসিন্দা স্বপন মিয়া জানান, প্রায় এক সপ্তাহ আগে তাঁর জ্বর শুরু হয়। পরে বমি, মাথাব্যথা এবং চোখের পেছনে তীব্র ব্যথা দেখা দিলে তিনি হাসপাতালে আসেন। পরীক্ষার পর ডেঙ্গু শনাক্ত হয়। শয্যা না পাওয়ায় মেঝেতে থেকেই চিকিৎসা নিতে হচ্ছে বলে জানান তিনি।
খিলগাঁওয়ের ২৫ বছর বয়সী তামান্নাও চার দিন ধরে হাসপাতালে ভর্তি। তাঁর দাবি, বাসার আশপাশ পরিষ্কার রাখার পাশাপাশি নিয়মিত মশারি ব্যবহার করলেও তিনি ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন। তাঁর অভিযোগ, মশক নিধন কার্যক্রম আরও জোরদার করা প্রয়োজন। অসুস্থতার কারণে সন্তানদের পড়াশোনাও ব্যাহত হচ্ছে বলে জানান তিনি।
রোগী বেশি এমন এলাকায় বিশেষ নজর
ডেঙ্গুর ঊর্ধ্বমুখী সংক্রমণ মোকাবিলায় রোগী শনাক্তের হার বেশি এমন এলাকাগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে মশক নিধন কার্যক্রম চালানো হচ্ছে বলে জানিয়েছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. আব্দুস সালাম।
তিনি জানান, এসব এলাকায় একাধিক টিম মাঠে কাজ করছে এবং তাদের কার্যক্রম নিয়মিত তদারকি করা হচ্ছে। পাশাপাশি ডেঙ্গু প্রতিরোধে নাগরিকদের সচেতন করতে বিভিন্ন কর্মসূচিও চালু রয়েছে।
তবে হাসপাতালের চিত্র বলছে, রাজধানীতে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসাব্যবস্থার ওপরও চাপ দ্রুত বাড়ছে। বিশেষ করে মুগদা হাসপাতালে ধারণক্ষমতার প্রায় তিন গুণ রোগী ভর্তি থাকায় দ্রুত শয্যা ও চিকিৎসা সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।

























