ঢাকা ১২:৫৭ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬, ১৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

টানা বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতায় বাড়ছে সংক্রমণের ঝুঁকি, যেসব রোগ থেকে এখনই সতর্ক থাকবেন

নিজস্ব সংবাদ :

রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে টানা কয়েক দিনের বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। অনেক এলাকায় ঘরবাড়ি স্যাঁতসেঁতে হয়ে পড়েছে। একই সময়ে উজানের ঢলে দেশের বিভিন্ন জেলায় বন্যা পরিস্থিতিরও অবনতি হয়েছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন হাজারো মানুষ। এমন পরিস্থিতিতে পানিবাহিত ও সংক্রামক নানা রোগের ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় সতর্ক থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বন্যা ও জলাবদ্ধতার সময় সবচেয়ে বড় সংকট তৈরি হয় নিরাপদ খাবার, বিশুদ্ধ পানি এবং স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশনের অভাবে। দূষিত পানি ও খাবারের কারণে অল্প সময়েই ডায়রিয়া, কলেরা, টাইফয়েড, হেপাটাইটিস-এ ও ই, চর্মরোগ এবং ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশন (ইউটিআই) ছড়িয়ে পড়তে পারে।

ডায়রিয়া ও কলেরা সবচেয়ে বড় উদ্বেগ

ডায়রিয়া সাধারণত দূষিত পানি ও খাবার গ্রহণের ফলে হয়। এতে শরীর থেকে দ্রুত পানি ও প্রয়োজনীয় লবণ বের হয়ে যায়, যা বিশেষ করে শিশুদের জন্য প্রাণঘাতী হতে পারে।

অন্যদিকে কলেরা একটি ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রামক রোগ। এর প্রধান লক্ষণ তীব্র ডায়রিয়া ও বারবার বমি হওয়া। চিকিৎসা দেরি হলে শরীরে মারাত্মক পানিশূন্যতা, রক্তচাপ কমে যাওয়া, কিডনির জটিলতা এমনকি শকের মতো পরিস্থিতিও তৈরি হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, ডায়রিয়া বা কলেরার লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত ওরস্যালাইন খাওয়ানো, পর্যাপ্ত নিরাপদ পানি পান করানো এবং গুরুতর অবস্থা হলে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া জরুরি।

জলাবদ্ধতায় দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়ে

শুধু সংক্রামক রোগই নয়, জলাবদ্ধতার সময় নানা দুর্ঘটনার আশঙ্কাও বেড়ে যায়। পানিতে ডুবে শিশুদের মৃত্যু, সাপের কামড়, কিংবা কাচ, টিন বা ধারালো বস্তুর আঘাতে পায়ে ক্ষত হওয়ার ঘটনা বাড়তে পারে। এসব ক্ষত দ্রুত পরিষ্কার ও চিকিৎসা না করলে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে।

বন্যার পরেও থাকে স্বাস্থ্যঝুঁকি

বন্যার পানি নেমে গেলেও ঝুঁকি শেষ হয় না। পরবর্তী সময়ে টাইফয়েড এবং হেপাটাইটিস-এ ও ই-এর মতো পানিবাহিত রোগের প্রকোপ বাড়তে পারে।

টাইফয়েডের কারণে অন্ত্রে রক্তক্ষরণ, অন্ত্র ছিদ্র, মস্তিষ্কে প্রদাহসহ গুরুতর জটিলতা দেখা দিতে পারে। অন্যদিকে হেপাটাইটিস-ই বিশেষ করে গর্ভবতী নারীদের জন্য বেশি ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করেন চিকিৎসকরা।

স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে বাড়ছে চর্মরোগ

দীর্ঘদিন ভেজা ও স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে বসবাস এবং আশ্রয়কেন্দ্রে গাদাগাদি করে থাকার কারণে স্ক্যাবিসসহ বিভিন্ন চর্মরোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। সময়মতো চিকিৎসা না করলে এসব সংক্রমণ আরও জটিল আকার ধারণ করতে পারে।

এ ছাড়া শিশু ও বয়স্কদের মধ্যে নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি এবং অন্যান্য শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণের ঝুঁকিও বেড়ে যায়।

নারীদের মধ্যে ইউটিআইয়ের ঝুঁকি বেশি

দীর্ঘ সময় দূষিত পানির সংস্পর্শে থাকলে নারী-পুরুষ উভয়েরই ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশন (ইউটিআই) হতে পারে। তবে নারীরা তুলনামূলকভাবে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। পাশাপাশি আশ্রয়কেন্দ্রে মানুষ ও গবাদিপশু একসঙ্গে অবস্থান করলে কিছু প্রাণিবাহিত রোগের আশঙ্কাও তৈরি হতে পারে।

কারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে?

  • শিশু ও নবজাতক
  • বয়স্ক ব্যক্তি
  • গর্ভবতী নারী
  • ডায়াবেটিস, হৃদরোগ ও হাঁপানিতে আক্রান্ত ব্যক্তি
  • যাদের শরীরে কাটা বা ক্ষত রয়েছে এবং নিয়মিত জলাবদ্ধ পানিতে কাজ করতে হয়

যেভাবে নিরাপদ থাকবেন

  • শুধু বিশুদ্ধ ও ফুটানো পানি পান করুন।
  • খাবার সবসময় ঢেকে রাখুন এবং ভালোভাবে রান্না করুন।
  • ডায়রিয়া হলে দ্রুত ওরস্যালাইন খাওয়ান।
  • জলাবদ্ধ পানিতে অপ্রয়োজনে হাঁটা এড়িয়ে চলুন।
  • পানিতে নামলে পরে সাবান দিয়ে হাত-পা ও শরীর ভালোভাবে ধুয়ে ফেলুন।
  • শরীরে কোনো ক্ষত থাকলে পরিষ্কার ও শুকনো রাখুন।
  • শিশুদের সবসময় নজরদারিতে রাখুন।
  • জ্বর, বমি, তীব্র ডায়রিয়া বা শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্ষা ও বন্যার সময় রোগ প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো নিরাপদ পানি, স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন, ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা এবং দ্রুত চিকিৎসা গ্রহণ। সচেতনতা ও প্রয়োজনীয় সতর্কতা মেনে চললে এ সময়ের অধিকাংশ সংক্রামক রোগের ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

আপলোডকারীর তথ্য

টানা বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতায় বাড়ছে সংক্রমণের ঝুঁকি, যেসব রোগ থেকে এখনই সতর্ক থাকবেন

আপডেট সময় ০৩:৩৬:৪৫ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬

রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে টানা কয়েক দিনের বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। অনেক এলাকায় ঘরবাড়ি স্যাঁতসেঁতে হয়ে পড়েছে। একই সময়ে উজানের ঢলে দেশের বিভিন্ন জেলায় বন্যা পরিস্থিতিরও অবনতি হয়েছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন হাজারো মানুষ। এমন পরিস্থিতিতে পানিবাহিত ও সংক্রামক নানা রোগের ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় সতর্ক থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বন্যা ও জলাবদ্ধতার সময় সবচেয়ে বড় সংকট তৈরি হয় নিরাপদ খাবার, বিশুদ্ধ পানি এবং স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশনের অভাবে। দূষিত পানি ও খাবারের কারণে অল্প সময়েই ডায়রিয়া, কলেরা, টাইফয়েড, হেপাটাইটিস-এ ও ই, চর্মরোগ এবং ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশন (ইউটিআই) ছড়িয়ে পড়তে পারে।

ডায়রিয়া ও কলেরা সবচেয়ে বড় উদ্বেগ

ডায়রিয়া সাধারণত দূষিত পানি ও খাবার গ্রহণের ফলে হয়। এতে শরীর থেকে দ্রুত পানি ও প্রয়োজনীয় লবণ বের হয়ে যায়, যা বিশেষ করে শিশুদের জন্য প্রাণঘাতী হতে পারে।

অন্যদিকে কলেরা একটি ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রামক রোগ। এর প্রধান লক্ষণ তীব্র ডায়রিয়া ও বারবার বমি হওয়া। চিকিৎসা দেরি হলে শরীরে মারাত্মক পানিশূন্যতা, রক্তচাপ কমে যাওয়া, কিডনির জটিলতা এমনকি শকের মতো পরিস্থিতিও তৈরি হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, ডায়রিয়া বা কলেরার লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত ওরস্যালাইন খাওয়ানো, পর্যাপ্ত নিরাপদ পানি পান করানো এবং গুরুতর অবস্থা হলে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া জরুরি।

জলাবদ্ধতায় দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়ে

শুধু সংক্রামক রোগই নয়, জলাবদ্ধতার সময় নানা দুর্ঘটনার আশঙ্কাও বেড়ে যায়। পানিতে ডুবে শিশুদের মৃত্যু, সাপের কামড়, কিংবা কাচ, টিন বা ধারালো বস্তুর আঘাতে পায়ে ক্ষত হওয়ার ঘটনা বাড়তে পারে। এসব ক্ষত দ্রুত পরিষ্কার ও চিকিৎসা না করলে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে।

বন্যার পরেও থাকে স্বাস্থ্যঝুঁকি

বন্যার পানি নেমে গেলেও ঝুঁকি শেষ হয় না। পরবর্তী সময়ে টাইফয়েড এবং হেপাটাইটিস-এ ও ই-এর মতো পানিবাহিত রোগের প্রকোপ বাড়তে পারে।

টাইফয়েডের কারণে অন্ত্রে রক্তক্ষরণ, অন্ত্র ছিদ্র, মস্তিষ্কে প্রদাহসহ গুরুতর জটিলতা দেখা দিতে পারে। অন্যদিকে হেপাটাইটিস-ই বিশেষ করে গর্ভবতী নারীদের জন্য বেশি ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করেন চিকিৎসকরা।

স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে বাড়ছে চর্মরোগ

দীর্ঘদিন ভেজা ও স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে বসবাস এবং আশ্রয়কেন্দ্রে গাদাগাদি করে থাকার কারণে স্ক্যাবিসসহ বিভিন্ন চর্মরোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। সময়মতো চিকিৎসা না করলে এসব সংক্রমণ আরও জটিল আকার ধারণ করতে পারে।

এ ছাড়া শিশু ও বয়স্কদের মধ্যে নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি এবং অন্যান্য শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণের ঝুঁকিও বেড়ে যায়।

নারীদের মধ্যে ইউটিআইয়ের ঝুঁকি বেশি

দীর্ঘ সময় দূষিত পানির সংস্পর্শে থাকলে নারী-পুরুষ উভয়েরই ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশন (ইউটিআই) হতে পারে। তবে নারীরা তুলনামূলকভাবে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। পাশাপাশি আশ্রয়কেন্দ্রে মানুষ ও গবাদিপশু একসঙ্গে অবস্থান করলে কিছু প্রাণিবাহিত রোগের আশঙ্কাও তৈরি হতে পারে।

কারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে?

  • শিশু ও নবজাতক
  • বয়স্ক ব্যক্তি
  • গর্ভবতী নারী
  • ডায়াবেটিস, হৃদরোগ ও হাঁপানিতে আক্রান্ত ব্যক্তি
  • যাদের শরীরে কাটা বা ক্ষত রয়েছে এবং নিয়মিত জলাবদ্ধ পানিতে কাজ করতে হয়

যেভাবে নিরাপদ থাকবেন

  • শুধু বিশুদ্ধ ও ফুটানো পানি পান করুন।
  • খাবার সবসময় ঢেকে রাখুন এবং ভালোভাবে রান্না করুন।
  • ডায়রিয়া হলে দ্রুত ওরস্যালাইন খাওয়ান।
  • জলাবদ্ধ পানিতে অপ্রয়োজনে হাঁটা এড়িয়ে চলুন।
  • পানিতে নামলে পরে সাবান দিয়ে হাত-পা ও শরীর ভালোভাবে ধুয়ে ফেলুন।
  • শরীরে কোনো ক্ষত থাকলে পরিষ্কার ও শুকনো রাখুন।
  • শিশুদের সবসময় নজরদারিতে রাখুন।
  • জ্বর, বমি, তীব্র ডায়রিয়া বা শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্ষা ও বন্যার সময় রোগ প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো নিরাপদ পানি, স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন, ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা এবং দ্রুত চিকিৎসা গ্রহণ। সচেতনতা ও প্রয়োজনীয় সতর্কতা মেনে চললে এ সময়ের অধিকাংশ সংক্রামক রোগের ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।