এলএনজি টার্মিনাল এখনো সচল নয়, রাজধানীজুড়ে তীব্র গ্যাস সংকট; বাড়তে পারে ভোগান্তি
দেশে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহে দেখা দেওয়া জটিলতার কারণে গ্যাস সংকট আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ক্ষতিগ্রস্ত ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল এখনো চালু করা সম্ভব হয়নি। ফলে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় গ্যাসের স্বল্পচাপ ও সরবরাহ সংকট আরও কয়েক দিন অব্যাহত থাকতে পারে।
ঢাকার কলাবাগান, মোহাম্মদপুর, কাফরুল, কাজীপাড়া, পশ্চিম তেজতুরী বাজার, বাড্ডাসহ বিভিন্ন এলাকায় বাসাবাড়ির চুলায় পর্যাপ্ত গ্যাস মিলছে না। কোথাও খুব কম চাপ, আবার কোথাও পুরোপুরি গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকায় রান্নাবান্নায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন বাসিন্দারা।
বাংলাদেশে আমদানি করা এলএনজি গ্যাস পাইপলাইনে সরবরাহের জন্য কক্সবাজারের মহেশখালীতে দুটি ভাসমান টার্মিনাল রয়েছে। এর একটি পরিচালনা করে এক্সিলারেট এনার্জি এবং অন্যটি সামিট। সম্প্রতি এক্সিলারেট পরিচালিত টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটায় সেখান থেকে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। এরপর থেকেই সারাদেশে গ্যাসের ঘাটতি আরও প্রকট হয়ে ওঠে।
পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা গেছে, ক্ষতিগ্রস্ত টার্মিনালের একটি বয়লার আগুনে নষ্ট হয়েছে। অন্য বয়লারটি চালু করার চেষ্টা চলছে। এটি সচল করা গেলে প্রতিদিন অতিরিক্ত প্রায় ৩০ কোটি ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যোগ করা সম্ভব হবে। যুক্তরাজ্য ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে আসা বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে কারিগরি দল মেরামতের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন ও মাইনস) মো. রফিকুল ইসলাম জানান, টার্মিনাল চালুর জন্য কাজ অব্যাহত রয়েছে। তবে ঠিক কবে এটি পুরোপুরি চালু হবে, সে বিষয়ে এখনই নিশ্চিত সময় বলা যাচ্ছে না।
দেশের গ্যাস খাতে দীর্ঘদিন ধরেই চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে বড় ব্যবধান রয়েছে। দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে উৎপাদন কমে যাওয়ায় এলএনজির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। বর্তমানে দৈনিক সরবরাহকৃত গ্যাসের প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ আসে আমদানি করা এলএনজি থেকে। ফলে একটি টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পুরো ব্যবস্থার ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে।
বর্তমানে দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট হলেও স্বাভাবিক সময়ে সরবরাহ করা হয় গড়ে ২৭০ কোটি ঘনফুট। টার্মিনাল বন্ধ থাকায় এই সরবরাহ কমে ২১৫ কোটি ঘনফুটেরও নিচে নেমে এসেছে।
এর প্রভাব পড়েছে বিদ্যুৎ উৎপাদনেও। গ্যাসের অভাবে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে, যার ফলে প্রায় দেড় হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুতের ঘাটতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি শিল্পকারখানা, সিএনজি স্টেশন এবং আবাসিক গ্রাহকরাও ভোগান্তির মুখে পড়েছেন। অনেক পরিবার বিকল্প হিসেবে বৈদ্যুতিক চুলা ব্যবহার শুরু করেছেন, আবার নিম্নআয়ের মানুষ কাঠের চুলায় রান্না করতে বাধ্য হচ্ছেন। অন্যদিকে সিএনজি স্টেশনগুলোতেও দীর্ঘ লাইনের সৃষ্টি হয়েছে।
পরিস্থিতির জন্য গ্রাহকদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেছে পেট্রোবাংলা। সংস্থাটি জানিয়েছে, দেশি-বিদেশি প্রকৌশলীরা দ্রুত টার্মিনাল সচল করতে নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করছেন। একই সঙ্গে তিতাস গ্যাস জানিয়েছে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত তাদের আওতাধীন এলাকায় সব ধরনের গ্রাহককে গ্যাসের স্বল্পচাপের সমস্যার মুখোমুখি হতে হবে।
এদিকে দীর্ঘদিনের এই সংকটে ক্ষোভ বাড়ছে সাধারণ মানুষের মধ্যে। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ইতোমধ্যে প্রতিবাদ কর্মসূচিও হয়েছে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থায় বিকল্প অবকাঠামোর অভাবই বর্তমান সংকটকে আরও গভীর করেছে। ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি এড়াতে অতিরিক্ত স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণসহ দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন তারা।


























