ইয়াসমিন হত্যা দিবসে প্রশ্ন: ৩১ বছর পরও কেন থামছে না ধর্ষণের পর হত্যা?
১৯৯৫ সালের ২৪ আগস্ট দিনাজপুরে কিশোরী ইয়াসমিন ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হওয়ার পর যে প্রতিবাদ-আন্দোলন গড়ে উঠেছিল, তার ৩১ বছর পরও নারী ও শিশুর প্রতি যৌন সহিংসতার ভয়াবহতা কমেনি। বরং ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য বলছে, ২০২৫ সালে ধর্ষণের পর হত্যার শিকার হন ৫৫ জন। অথচ চলতি বছরের প্রথম সাত মাসেই এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৮ জনে। মাসিক গড় হিসাবেও পরিস্থিতির অবনতি স্পষ্ট।
আজ ২৪ আগস্ট পালিত হচ্ছে ইয়াসমিন হত্যা দিবস, যা নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস হিসেবেও পরিচিত। ১৯৯৫ সালের এই দিনে দিনাজপুরে পুলিশ সদস্যদের হাতে কিশোরী ইয়াসমিন গণধর্ষণ ও হত্যার শিকার হন। ওই ঘটনার প্রতিবাদে দিনাজপুরে ব্যাপক আন্দোলন গড়ে উঠলে পুলিশের গুলিতে কয়েকজন নিহত হন। পরে সেই আন্দোলন দেশব্যাপী নারী অধিকার ও নারী নির্যাতনবিরোধী আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে পরিণত হয়।
তবে তিন দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও ধর্ষণের পর হত্যার মতো নৃশংস অপরাধ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।
বাড়ছে উদ্বেগজনক প্রবণতা
আসকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে মোট ৭৪৯টি ধর্ষণের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ৫৬৯টি ছিল একক ধর্ষণ এবং ১৮০টি সংঘবদ্ধ ধর্ষণ। গত পাঁচ বছরে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা ঘটেছে ২০২টি।
বিশেষ উদ্বেগের বিষয় হলো, এসব ঘটনার শিকারদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ শিশু। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে ধর্ষণের পর ১০ নারী ও ২১ শিশুকে হত্যা করা হয়েছে।
সম্প্রতি মাদারীপুরের শিবচরে এক নারীকে ধর্ষণের পর হত্যার অভিযোগে ফারুক নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পুলিশের কাছে দেওয়া জবানবন্দিতে তিনি ওই নারীকে হত্যার পর মরদেহ ঝোপের পাশে ফেলে রাখার কথা স্বীকার করেছেন বলে জানানো হয়। একই ঘটনায় নারীর এক বছর বয়সী শিশুপুত্রকে আড়িয়াল খাঁ নদে ফেলে হত্যার কথাও তিনি স্বীকার করেন।
মানবাধিকারকর্মীদের মতে, ধর্ষণের প্রমাণ মুছে ফেলা, ভুক্তভোগীকে চুপ করিয়ে দেওয়া কিংবা অপরাধ প্রকাশ্যে আসার আশঙ্কা থেকেই অনেক ক্ষেত্রে ধর্ষণের পর হত্যার মতো ঘটনা ঘটে।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম বলেন, এ ধরনের নৃশংসতা সমাজের ওপর গভীর প্রভাব ফেলছে। তার মতে, সামাজিক অস্থিরতা, মাদকের বিস্তার এবং অপরাধীদের বিচার না হওয়া পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলছে।
আলোচিত কয়েকটি ঘটনা
চলতি বছরের মার্চে মিরপুরে এক শিশুকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা দেশজুড়ে ব্যাপক ক্ষোভ তৈরি করে। এর আগে গত বছর মাগুরায় আট বছর বয়সী এক শিশুকে তার বোনের শ্বশুর ধর্ষণ ও হত্যা করেন বলে অভিযোগ ওঠে। দুটি ঘটনাই নারী ও শিশুর নিরাপত্তা এবং বিচারব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তোলে।
‘আমরাই পারি পারিবারিক নির্যাতন প্রতিরোধ জোট’-এর প্রধান নির্বাহী জিনাত আরা হক মনে করেন, বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা দূর করা জরুরি। তার মতে, নারী ও শিশু নির্যাতনের প্রতিটি অভিযোগকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করতে হবে এবং দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের কার্যকারিতা বাড়িয়ে অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির পাশাপাশি ভুক্তভোগী ও তার পরিবারের নিরাপত্তা, চিকিৎসা এবং মানসিক সহায়তাও নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে আলামত সংগ্রহ, সাক্ষীর নিরাপত্তা এবং নিরপেক্ষ তদন্তের ওপর জোর দিতে হবে।
অ্যাডভোকেট সুলতানা কামালের মতে, ধর্ষণবিরোধী আইন শক্তিশালী হলেও বাস্তবে বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে নানা প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। পুলিশ, চিকিৎসক ও তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের যথাযথ সহযোগিতা না পেলে ভুক্তভোগীর জন্য ন্যায়বিচার পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। পাশাপাশি সমাজে নারীর প্রতি বিদ্যমান বৈষম্যমূলক দৃষ্টিভঙ্গিও বিচারপ্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলতে পারে।
প্রতিরোধে প্রয়োজন কার্যকর ব্যবস্থা
অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ এবং আইন কমিশনের মুখ্য গবেষণা কর্মকর্তা ফউজুল আজিমের মতে, অভিযোগ পাওয়ার পর দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া, সময়মতো মেডিক্যাল পরীক্ষা, ডিএনএসহ প্রয়োজনীয় ফরেনসিক আলামত সংরক্ষণ এবং ভুক্তভোগী ও সাক্ষীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
শিশু ভুক্তভোগীদের ক্ষেত্রে বয়স ও মানসিক অবস্থার উপযোগী জিজ্ঞাসাবাদ পদ্ধতি চালু করার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু আইন কঠোর করলেই ধর্ষণ ও ধর্ষণের পর হত্যা বন্ধ করা সম্ভব নয়। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজে যৌন সহিংসতা সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে হবে। শিশুদের বয়সোপযোগীভাবে নিরাপদ ও অনিরাপদ আচরণ সম্পর্কে ধারণা দিতে হবে।
কোনো যৌন হয়রানি বা নির্যাতনের অভিযোগ উঠলে সামাজিক বা পারিবারিক সম্মানের অজুহাতে বিষয়টি গোপন না করে দ্রুত আইনগত পদক্ষেপ নেওয়াও জরুরি।
ইয়াসমিন হত্যার ৩১ বছর পর আজকের বাস্তবতা তাই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনে দাঁড়িয়েছে—শুধু একটি দিবস পালন নয়, নারী ও শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র, বিচারব্যবস্থা এবং সমাজ কি সত্যিই প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনতে পেরেছে?
























