অনলাইন ব্যবসার স্বপ্ন ভেঙে দিল গ্যাস বিস্ফোরণ, স্বামী-ভাগনিকে নিয়ে একই পরিবারের তিন প্রাণ ঝরল
ঢাকায় নতুন জীবন গড়তে এসেছিলেন ফাহিমা; কয়েক দিনের ব্যবধানে নিভে গেল পুরো পরিবারের হাসি, স্বজনদের অভিযোগ—অবহেলাই কেড়ে নিল তিনটি জীবন।
দীর্ঘদিনের স্বপ্ন ছিল নিজের হাতে তৈরি কেক, পোশাক ও বিভিন্ন পণ্যের অনলাইন ব্যবসাকে বড় পরিসরে নিয়ে যাওয়ার। সেই স্বপ্ন পূরণের আশায় স্বামীকে নিয়ে রাজধানীতে নতুন সংসারও শুরু করেছিলেন কুমিল্লার দেবীদ্বারের তরুণী ফাহিমা আক্তার। কিন্তু নতুন জীবনের সেই পথচলা মাত্র দেড় মাসেই থেমে গেল ভয়াবহ এক গ্যাস বিস্ফোরণের ঘটনায়। কয়েক দিনের ব্যবধানে মারা গেলেন ফাহিমা, তার স্বামী আনোয়ার হোসেন এবং আট বছরের ভাগনি হাফসা।
পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, গত বছরের ৯ সেপ্টেম্বর ফাহিমা আক্তারের সঙ্গে আনোয়ার হোসেনের বিয়ে হয়। বিয়ের পর নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে তারা সম্প্রতি রাজধানীর উত্তর বাড্ডার নতুন বাজার এলাকার ১০০ ফিট সড়কের একটি ভবনের নিচতলায় ভাড়া বাসায় ওঠেন। সঙ্গে নিয়ে আসেন ফাহিমার বড় বোনের মেয়ে হাফসাকে। উদ্দেশ্য ছিল ঢাকার একটি ভালো স্কুলে তাকে ভর্তি করানো।
কিন্তু গত ২১ জুলাই ভোরে বাসার নিচতলায় জমে থাকা গ্যাস থেকে বিকট বিস্ফোরণ ঘটে। মুহূর্তেই আগুন ছড়িয়ে পড়ে ঘরের বিভিন্ন স্থানে। গুরুতর দগ্ধ হন আনোয়ার, ফাহিমা ও শিশু হাফসা। পরে তাদের জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়।
চিকিৎসাধীন অবস্থায় প্রথমে বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে মারা যায় শিশু হাফসা। পরদিন শুক্রবার সকালে মৃত্যুবরণ করেন আনোয়ার হোসেন। সর্বশেষ শনিবার সন্ধ্যায় জীবনযুদ্ধ হেরে যান ফাহিমা আক্তার। চিকিৎসকদের তথ্যমতে, ফাহিমার শরীরের প্রায় ৪৫ শতাংশ, আনোয়ারের ৫০ শতাংশ এবং হাফসার প্রায় ৪০ শতাংশ দগ্ধ হয়েছিল।
ফাহিমা কুমিল্লার দেবীদ্বার উপজেলার গোমতী আবাসিক এলাকার বাসিন্দা গোলাম হোসেনের ছোট মেয়ে। স্থানীয় একটি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করার পর তিনি স্নাতক পর্যায়ে ভর্তি হন। পড়াশোনার পাশাপাশি কেক তৈরি, পোশাক বিক্রি ও অনলাইন উদ্যোক্তা হিসেবে নিজের পরিচয় গড়ে তুলতে নিরলস চেষ্টা করছিলেন।
রোববার সকালে দেবীদ্বার সদরের গোমতী আবাসিক এলাকার একটি মাঠে ফাহিমার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে তাকে স্বামী আনোয়ার হোসেনের কবরের পাশে দাফন করা হয়। এর আগে শিশু হাফসাকে তার নিজ গ্রামের পারিবারিক কবরস্থানে সমাহিত করা হয়েছে।
মেয়েকে হারিয়ে বারবার ভেঙে পড়ছেন বাবা গোলাম হোসেন। তার অভিযোগ, ভাড়া বাসায় ওঠার পর থেকেই গ্যাসের লিকেজের বিষয়টি বাড়ির মালিককে জানানো হয়েছিল। সময়মতো প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হলে হয়তো এমন মর্মান্তিক পরিণতি এড়ানো সম্ভব হতো।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও ঘটনাটিকে অত্যন্ত বেদনাদায়ক উল্লেখ করে বলেন, নতুন সংসার আর সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্ন নিয়ে রাজধানীতে যাওয়া এই দম্পতির সঙ্গে একটি নিষ্পাপ শিশুর মৃত্যু পুরো এলাকাকে শোকস্তব্ধ করে দিয়েছে। তারা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং অবহেলার প্রমাণ মিললে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
এই মর্মান্তিক ঘটনায় শুধু একটি পরিবারই নয়, স্বপ্ন, আশা আর ভবিষ্যতের সম্ভাবনাও একসঙ্গে নিভে গেছে। রাজধানীতে নতুন জীবন শুরু করতে আসা তিনটি প্রাণ আজ কেবল স্মৃতি হয়ে রয়ে গেল।


























