ঢাকা ১২:৪৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩১ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

তিন মাসে কোটি টাকার হিসাব বেড়েছে ৫ হাজার, বাড়ছে অর্থনৈতিক বৈষম্য

নিজস্ব সংবাদ :

দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধিতে যখন সাধারণ মানুষের বড় একটি অংশ সংসারের খরচ মেটাতে সঞ্চয় ভাঙতে বাধ্য হচ্ছে, তখন ব্যাংকিং খাতে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন চিত্র। দেশে এক কোটি টাকার বেশি আমানত রয়েছে—এমন ব্যাংক হিসাবের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। মাত্র তিন মাসে এ ধরনের হিসাব বেড়েছে পাঁচ হাজারেরও বেশি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরের জুন শেষে দেশের ব্যাংকগুলোতে এক কোটি টাকার বেশি আমানত থাকা হিসাবের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪১ হাজার ৫৬২টি। মার্চ শেষে এ সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৩৬ হাজার ৪৮৫টি। অর্থাৎ তিন মাসে এমন হিসাব বেড়েছে ৫ হাজার ৭৭টি।

বাড়ছে ব্যাংক আমানতও

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, জুন শেষে দেশের ব্যাংকিং খাতে মোট আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২২ লাখ ১০ হাজার ৪৪৪ কোটি টাকা। মার্চ শেষে এ পরিমাণ ছিল ২১ লাখ ৫৮ হাজার ২ কোটি টাকা। ফলে তিন মাসে ব্যাংকগুলোতে মোট আমানত বেড়েছে প্রায় ৫২ হাজার ৪১৯ কোটি টাকা।

একই সময়ে ব্যাংক হিসাবের মোট সংখ্যাও বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৮ কোটি ৬৩ লাখ ৮৪ হাজার ৫৮৮টিতে।

সাধারণ মানুষের চাপ, বিপরীতে বড় আমানতকারীদের উত্থান

অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকিং খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, আমানতের এই প্রবৃদ্ধির পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের প্রকৃত আয় ও সঞ্চয়ের সক্ষমতা কমে গেলেও বড় ব্যবসায়ী, করপোরেট প্রতিষ্ঠান এবং উচ্চ আয়ের মানুষের হাতে থাকা অর্থের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে বাড়ছে।

এ ছাড়া ব্যাংকের বাইরে থাকা অর্থের একটি অংশও সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ফিরছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। অর্থনীতিতে আস্থার পরিবেশ তৈরি হওয়া এবং প্রাতিষ্ঠানিক লেনদেন বাড়ার কারণেও ব্যাংক আমানত বৃদ্ধিতে ভূমিকা থাকতে পারে।

তবে এক কোটি টাকার বেশি আমানত থাকা হিসাবের সংখ্যা দিয়ে দেশে প্রকৃত কোটিপতির সংখ্যা নির্ধারণ করা যায় না। কারণ এই হিসাবের মধ্যে ব্যক্তির পাশাপাশি বিভিন্ন কোম্পানি, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ও সরকারি সংস্থার হিসাবও রয়েছে। একই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান একাধিক ব্যাংকে একাধিক হিসাব পরিচালনা করতে পারে।

কয়েক দশকে বহুগুণ বেড়েছে কোটি টাকার হিসাব

স্বাধীনতার পরের বছর ১৯৭২ সালে দেশে এক কোটি টাকার আমানত থাকা হিসাবের সংখ্যা ছিল মাত্র ৫টি। এরপর সময়ের সঙ্গে এই সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে।

১৯৯০ সালে কোটি টাকার হিসাব ছিল ৯৪৩টি। ২০০৮ সালে তা বেড়ে ১৯ হাজার ১৬৩টিতে পৌঁছায়। ২০২০ সালের ডিসেম্বর শেষে এ সংখ্যা দাঁড়ায় ৯৩ হাজার ৮৯০টিতে।

পরবর্তী সময়েও এই প্রবৃদ্ধি অব্যাহত থাকে। ২০২৩ সালের ডিসেম্বর শেষে কোটি টাকার বেশি আমানত থাকা হিসাবের সংখ্যা ছিল ১ লাখ ১৬ হাজার ৯০৮টি। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১ লাখ ৩৪ হাজার ৪৪টিতে।

সর্বশেষ চলতি বছরের জুনে সেই সংখ্যা ছাড়িয়েছে ১ লাখ ৪১ হাজার। অর্থাৎ একদিকে মূল্যস্ফীতির চাপে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ছে, অন্যদিকে বড় অঙ্কের আমানত থাকা হিসাবের সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে।

অর্থনীতির এই বিপরীতমুখী চিত্র দেশে সম্পদ ও আয় বণ্টনের বৈষম্য নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল সমাজের সব শ্রেণির মানুষের কাছে সমানভাবে পৌঁছাচ্ছে কি না, কোটি টাকার আমানত হিসাব বৃদ্ধির এই পরিসংখ্যান সেই আলোচনাকেই সামনে নিয়ে এসেছে।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

আপলোডকারীর তথ্য

তিন মাসে কোটি টাকার হিসাব বেড়েছে ৫ হাজার, বাড়ছে অর্থনৈতিক বৈষম্য

আপডেট সময় ০২:৫৭:৫১ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধিতে যখন সাধারণ মানুষের বড় একটি অংশ সংসারের খরচ মেটাতে সঞ্চয় ভাঙতে বাধ্য হচ্ছে, তখন ব্যাংকিং খাতে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন চিত্র। দেশে এক কোটি টাকার বেশি আমানত রয়েছে—এমন ব্যাংক হিসাবের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। মাত্র তিন মাসে এ ধরনের হিসাব বেড়েছে পাঁচ হাজারেরও বেশি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরের জুন শেষে দেশের ব্যাংকগুলোতে এক কোটি টাকার বেশি আমানত থাকা হিসাবের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪১ হাজার ৫৬২টি। মার্চ শেষে এ সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৩৬ হাজার ৪৮৫টি। অর্থাৎ তিন মাসে এমন হিসাব বেড়েছে ৫ হাজার ৭৭টি।

বাড়ছে ব্যাংক আমানতও

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, জুন শেষে দেশের ব্যাংকিং খাতে মোট আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২২ লাখ ১০ হাজার ৪৪৪ কোটি টাকা। মার্চ শেষে এ পরিমাণ ছিল ২১ লাখ ৫৮ হাজার ২ কোটি টাকা। ফলে তিন মাসে ব্যাংকগুলোতে মোট আমানত বেড়েছে প্রায় ৫২ হাজার ৪১৯ কোটি টাকা।

একই সময়ে ব্যাংক হিসাবের মোট সংখ্যাও বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৮ কোটি ৬৩ লাখ ৮৪ হাজার ৫৮৮টিতে।

সাধারণ মানুষের চাপ, বিপরীতে বড় আমানতকারীদের উত্থান

অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকিং খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, আমানতের এই প্রবৃদ্ধির পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের প্রকৃত আয় ও সঞ্চয়ের সক্ষমতা কমে গেলেও বড় ব্যবসায়ী, করপোরেট প্রতিষ্ঠান এবং উচ্চ আয়ের মানুষের হাতে থাকা অর্থের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে বাড়ছে।

এ ছাড়া ব্যাংকের বাইরে থাকা অর্থের একটি অংশও সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ফিরছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। অর্থনীতিতে আস্থার পরিবেশ তৈরি হওয়া এবং প্রাতিষ্ঠানিক লেনদেন বাড়ার কারণেও ব্যাংক আমানত বৃদ্ধিতে ভূমিকা থাকতে পারে।

তবে এক কোটি টাকার বেশি আমানত থাকা হিসাবের সংখ্যা দিয়ে দেশে প্রকৃত কোটিপতির সংখ্যা নির্ধারণ করা যায় না। কারণ এই হিসাবের মধ্যে ব্যক্তির পাশাপাশি বিভিন্ন কোম্পানি, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ও সরকারি সংস্থার হিসাবও রয়েছে। একই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান একাধিক ব্যাংকে একাধিক হিসাব পরিচালনা করতে পারে।

কয়েক দশকে বহুগুণ বেড়েছে কোটি টাকার হিসাব

স্বাধীনতার পরের বছর ১৯৭২ সালে দেশে এক কোটি টাকার আমানত থাকা হিসাবের সংখ্যা ছিল মাত্র ৫টি। এরপর সময়ের সঙ্গে এই সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে।

১৯৯০ সালে কোটি টাকার হিসাব ছিল ৯৪৩টি। ২০০৮ সালে তা বেড়ে ১৯ হাজার ১৬৩টিতে পৌঁছায়। ২০২০ সালের ডিসেম্বর শেষে এ সংখ্যা দাঁড়ায় ৯৩ হাজার ৮৯০টিতে।

পরবর্তী সময়েও এই প্রবৃদ্ধি অব্যাহত থাকে। ২০২৩ সালের ডিসেম্বর শেষে কোটি টাকার বেশি আমানত থাকা হিসাবের সংখ্যা ছিল ১ লাখ ১৬ হাজার ৯০৮টি। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১ লাখ ৩৪ হাজার ৪৪টিতে।

সর্বশেষ চলতি বছরের জুনে সেই সংখ্যা ছাড়িয়েছে ১ লাখ ৪১ হাজার। অর্থাৎ একদিকে মূল্যস্ফীতির চাপে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ছে, অন্যদিকে বড় অঙ্কের আমানত থাকা হিসাবের সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে।

অর্থনীতির এই বিপরীতমুখী চিত্র দেশে সম্পদ ও আয় বণ্টনের বৈষম্য নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল সমাজের সব শ্রেণির মানুষের কাছে সমানভাবে পৌঁছাচ্ছে কি না, কোটি টাকার আমানত হিসাব বৃদ্ধির এই পরিসংখ্যান সেই আলোচনাকেই সামনে নিয়ে এসেছে।