বিদেশমুখী চিকিৎসা কমাতে বসুন্ধরায় ‘মেডিকেল সিটি’, থাকছে ১ হাজার শয্যার হাসপাতাল
উন্নত ও বিশেষায়িত চিকিৎসার প্রয়োজনে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশিকে বিদেশে যেতে হয়। জটিল অস্ত্রোপচার থেকে শুরু করে বিশেষায়িত রোগ নির্ণয়—অনেক ক্ষেত্রেই দেশের বাইরে চিকিৎসার ওপর নির্ভর করতে হয় রোগীদের। এতে চিকিৎসাব্যয়ের পাশাপাশি বিপুল অর্থও দেশের বাইরে চলে যায়।
এমন বাস্তবতায় দেশে আন্তর্জাতিক মানের চিকিৎসাসেবা সম্প্রসারণের লক্ষ্য নিয়ে রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে ‘বসুন্ধরা মেডিকেল সিটি অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল হসপিটাল’।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, এটি শুধু একটি হাসপাতাল হবে না; বরং চিকিৎসা, রোগ নির্ণয়, গবেষণা, প্রশিক্ষণ ও বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবার সমন্বয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ মেডিকেল সিটি হিসেবে গড়ে তোলা হবে।
প্রকল্পে থাকছে ১ হাজার শয্যার হাসপাতাল, ২৫টি ক্লিনিক্যাল বিভাগ, ১১টি বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র এবং ২৬টি অপারেশন থিয়েটার। এর পাশাপাশি আধুনিক ডায়াগনস্টিক সুবিধা, জেনেটিক ও মলিকুলার ল্যাবরেটরি এবং ল্যাপারোস্কোপিক ও রোবোটিক সার্জারির মতো প্রযুক্তিনির্ভর চিকিৎসাব্যবস্থাও রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রকল্প ঘিরে শেয়ার বুকিং মেলা
বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর বসুন্ধরা ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সেন্টারে শুরু হয়েছে প্রকল্পটির ডকুমেন্টারি প্রদর্শনী, শেয়ার বুকিং মেলা ও বিভিন্ন আয়োজন। আগামী ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রতিদিন বিকেল ৩টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত চলবে বিশেষ শেয়ার বুকিং কার্যক্রম।
মেলার উদ্বোধন করেন তানভীর বসুন্ধরা গ্রুপের (টিবিজি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আহমেদ ইব্রাহিম সোবহান।
বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার মেলায় আসা দর্শনার্থীদের সঙ্গে কথা বলে দেখা গেছে, প্রকল্পটি নিয়ে আগ্রহের জায়গা একেকজনের একেক রকম। কেউ জানতে চাইছেন ভবিষ্যৎ চিকিৎসাসুবিধা সম্পর্কে, কেউ দেখছেন বিনিয়োগের সম্ভাবনা। আবার অনেকে ভবিষ্যতে নিজের ও পরিবারের জন্য কী ধরনের চিকিৎসাসেবা পাওয়া যেতে পারে, সে বিষয়েও খোঁজ নিচ্ছেন।
দর্শনার্থী রফিকুল ইসলাম বলেন, বড় হাসপাতালে অনেক সময় বিভিন্ন পরীক্ষা বা চিকিৎসার জন্য রোগীকে এক বিভাগ থেকে অন্য জায়গায় যেতে হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী যদি এখানে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা এক জায়গায় পাওয়া যায়, তাহলে রোগী ও স্বজনদের ভোগান্তি অনেকটাই কমতে পারে।
সাবিনা আক্তার জানান, পরিবারের চিকিৎসা ব্যয় নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই ভাবতে হয় তাকে। মেলায় এসে তিনি মূলত ভবিষ্যতে হাসপাতালটিতে কী ধরনের চিকিৎসাসেবা পাওয়া যাবে এবং শেয়ার বুকিংয়ের সুযোগ কীভাবে কাজ করবে, তা জানার চেষ্টা করেছেন।
অন্যদিকে ব্যবসায়ী আরিফ হোসেনের আগ্রহ মূলত বিনিয়োগ ঘিরে। তার ভাষ্য, স্বাস্থ্যসেবার চাহিদা কখনো শেষ হওয়ার নয়। তাই প্রকল্পটির দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও বিনিয়োগের সম্ভাবনা সম্পর্কে জানতে তিনি মেলায় এসেছেন।
প্রযুক্তিনির্ভর ‘স্মার্ট হাসপাতাল’ তৈরির পরিকল্পনা
বসুন্ধরা মেডিকেল সিটির পরিকল্পনায় চিকিৎসার পাশাপাশি প্রযুক্তির ব্যবহারকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থার সমন্বয়ে হাসপাতালটিকে একটি ‘স্মার্ট হাসপাতাল’ হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য রয়েছে।
রোগ শনাক্তকরণ, চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা এবং রোগীর বিভিন্ন সেবা—সব ক্ষেত্রেই প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে। পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো গড়ে হাসপাতালটিকে ‘গ্রিন হাসপাতাল’ হিসেবেও প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছে।
প্রকল্পের পরিকল্পনায় দক্ষ চিকিৎসক, প্রশিক্ষিত নার্স এবং ২৪ ঘণ্টার জরুরি চিকিৎসাসেবাকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
শুধু চিকিৎসাসেবা নয়, শিক্ষা ও গবেষণাকেও এই উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। চিকিৎসা শিক্ষা, পেশাগত প্রশিক্ষণ, গবেষণা এবং তথ্য বিনিময়ের মাধ্যমে দেশের স্বাস্থ্য খাতে দীর্ঘমেয়াদি অবদান রাখার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
মেলা আয়োজকদের একজন ওমর ফারুক শাওন বলেন, বসুন্ধরা মেডিকেল সিটির উদ্যোগ দেশের স্বাস্থ্যসেবার ভবিষ্যৎ নিয়ে একটি বড় পরিকল্পনার অংশ। আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর চিকিৎসার চাহিদা বাড়ছে। সেই চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে উন্নত চিকিৎসা, শিক্ষা, গবেষণা এবং রোগীসেবাকে একই কাঠামোর মধ্যে আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
তার দাবি, আন্তর্জাতিক মানের অবকাঠামো, আধুনিক রোগ নির্ণয় প্রযুক্তি এবং অভিজ্ঞ চিকিৎসকদের সমন্বয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগের নতুন সুযোগ তৈরির পাশাপাশি দেশের মানুষের চিকিৎসার প্রয়োজনও পূরণ করা সম্ভব হবে।
বিদেশে চিকিৎসা নেওয়ার প্রবণতা কমানোর লক্ষ্য
বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর অনেক রোগী জটিল চিকিৎসার জন্য ভারত, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন দেশে যান। এতে রোগীদের বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয়ের পাশাপাশি দেশের বৈদেশিক মুদ্রারও উল্লেখযোগ্য অংশ বাইরে চলে যায়।
এই পরিস্থিতিতে দেশের ভেতরেই আন্তর্জাতিক মানের চিকিৎসা অবকাঠামো গড়ে তোলাকে প্রকল্পটির অন্যতম লক্ষ্য হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে বিদেশি রোগীদের আকৃষ্ট করার মাধ্যমে বাংলাদেশে চিকিৎসা পর্যটনের সম্ভাবনাও তৈরি করতে চায় সংশ্লিষ্টরা।
ওমর ফারুক শাওন বলেন, ১ হাজার শয্যার এই হাসপাতালকে দেশের বেসরকারি খাতের অন্যতম বড় চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। বিশেষায়িত সেন্টার অব এক্সিলেন্স, আধুনিক অটোমেশন এবং মেডিকেল ট্যুরিজমের সুবিধাও এতে যুক্ত করার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
তিনি বলেন, এই প্রকল্পে বিনিয়োগকে কেবল আর্থিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে হবে না; দেশের স্বাস্থ্যসেবার ভবিষ্যৎ অবকাঠামো তৈরির ক্ষেত্রেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত শেয়ার বুকিং
বসুন্ধরা মেডিকেল সিটি অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল হসপিটালকে ঘিরে আয়োজিত শেয়ার বুকিং মেলা চলবে আগামী ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। প্রতিদিন বিকেল ৩টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত বসুন্ধরা ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সেন্টারে দর্শনার্থীরা প্রকল্প সম্পর্কে বিস্তারিত জানার সুযোগ পাচ্ছেন।
মেলায় প্রকল্পের ডকুমেন্টারি প্রদর্শনের পাশাপাশি বিশেষ ছাড়ে শেয়ার বিক্রি, র্যাফেল ড্র এবং পুরস্কারের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
তবে বড় পরিসরের অবকাঠামো ও অত্যাধুনিক প্রযুক্তির পরিকল্পনার পাশাপাশি প্রকল্পটির সফলতা শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে বাস্তবে কতটা মানসম্মত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা যায় তার ওপর। রোগীর নিরাপত্তা, চিকিৎসার মান, দক্ষ জনবল, সেবার স্বচ্ছতা, চিকিৎসাব্যয়ের সামর্থ্য এবং রোগী ও স্বজনদের সঙ্গে মানবিক আচরণ—এসব বিষয়ও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
সব পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে ১ হাজার শয্যার হাসপাতাল, ২৫টি ক্লিনিক্যাল বিভাগ, ১১টি বিশেষায়িত কেন্দ্র ও ২৬টি অপারেশন থিয়েটার নিয়ে বসুন্ধরা মেডিকেল সিটি দেশের বেসরকারি স্বাস্থ্য খাতে বড় একটি অবকাঠামোগত সংযোজন হতে পারে।
বিশেষ করে রোগ নির্ণয় থেকে জটিল অস্ত্রোপচার, চিকিৎসা-পরবর্তী সেবা, গবেষণা ও প্রশিক্ষণ—সবকিছুকে একই ব্যবস্থার আওতায় আনার যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, সেটিই প্রকল্পটির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক।

























