প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সে সচল হচ্ছে বৈদেশিক খাত
রেমিট্যান্স ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে শক্তিশালী অবস্থানের মধ্য দিয়ে ২০২৫-২৬ অর্থবছর শেষ করেছে বাংলাদেশ। তবে পণ্য রপ্তানি স্থবির থাকা, আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়া এবং সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ কমে যাওয়ায় বৈদেশিক খাতে নতুন চাপও তৈরি হয়েছে।
অর্থবছর শেষে দেশের বাণিজ্য ঘাটতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৭ দশমিক ২৯ বিলিয়ন ডলার। এমন পরিস্থিতিতে শক্তিশালী রেমিট্যান্স ও রিজার্ভ অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা আনতে সহায়তা করলেও উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল বেসরকারি বিনিয়োগ ও ঋণপ্রবাহ, রপ্তানির স্থবিরতা, আর্থিক খাতের দুর্বলতা এবং রাজস্ব ও সরকারি ব্যয়ের সীমাবদ্ধতা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।
এমসিসিআইয়ের ‘বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি: এপ্রিল-জুন ২০২৬’ শীর্ষক প্রতিবেদনে দেশের অর্থনীতির এই চিত্র উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সদ্য শেষ হওয়া ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি সাময়িক হিসাবে ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ হয়েছে। আগের অর্থবছরে যা ছিল ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশ। তবে এই প্রবৃদ্ধি দেশের দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাবনার তুলনায় এখনো কম।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরে দেশের সামগ্রিক ব্যালান্স অব পেমেন্টসে ৬ দশমিক ৬১ বিলিয়ন ডলারের উদ্বৃত্ত হয়েছে। আগের অর্থবছরে এ উদ্বৃত্ত ছিল ৩ দশমিক ৩৯ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক বছরে সামগ্রিক উদ্বৃত্ত বেড়েছে ৯৪ দশমিক ৬৯ শতাংশ।
এর পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে রেমিট্যান্স। গত অর্থবছরে এ প্রবাসী বাংলাদেশিরা দেশে মোট ৩৫ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন, যা ২০২৪-২৫-এর ৩০ দশমিক ৩৩ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় ১৭ দশমিক ৩৪ শতাংশ বেশি। এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে রেমিট্যান্স এসেছে ৯ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন ডলার।
রেমিট্যান্সের পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও বেড়েছে। জুন শেষে মোট রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩৭ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন ডলার, যা এক বছর আগে ছিল ৩১ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন ডলার। আন্তর্জাতিক হিসাবপদ্ধতি BPM6 অনুযায়ী রিজার্ভ ছিল ৩২ দশমিক ৯৩ বিলিয়ন ডলার।
তবে এই ইতিবাচক অবস্থানের বিপরীতে বাণিজ্য ঘাটতি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। গত অর্থবছর ‘এ বাণিজ্য ঘাটতি ৩৩ দশমিক ৭৬ শতাংশ বেড়ে ২৭ দশমিক ২৯ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। এ সময়ে রপ্তানি আয় ৪৩ দশমিক ৮৬ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় দশমিক ২৫ শতাংশ কম। বিপরীতে আমদানি ব্যয় বেড়ে হয়েছে ৭১ দশমিক ১৪ বিলিয়ন ডলার—প্রবৃদ্ধি ১০ দশমিক ৫৩ শতাংশ।
সামগ্রিকভাবে এপ্রিল–জুন প্রান্তিকে অর্থনীতির পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছে সংগঠনটি। তাদের পর্যবেক্ষণ, অর্থনীতির এই পুনরুদ্ধারকে টেকসই করতে মূল্যস্ফীতি কমানোর পাশাপাশি ব্যাংক খাতের দুর্বলতা কাটাতে হবে, বাড়াতে হবে বেসরকারি বিনিয়োগ ও ঋণপ্রবাহ। সেই সঙ্গে বৈদেশিক খাতের স্থিতিশীলতা ধরে রাখায় অগ্রাধিকার দিতে হবে।
তারা বলছে, মূল্যস্ফীতির চাপ কিছুটা কমলেও তা এখনো বড় উদ্বেগের বিষয়। জুনে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ১৬ শতাংশে নেমেছে, মে মাসে যা ছিল ৯ দশমিক ৪২ শতাংশ। একই সময়ে খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমে ৮ দশমিক ৬০ শতাংশ হয়েছে। তবে খাদ্যবহির্ভূত পণ্য ও জ্বালানির দামের চাপ এখনো মানুষের ক্রয়ক্ষমতায় প্রভাব ফেলছে।
পণ্য রপ্তানির সামগ্রিক হিসাবেও খুব বেশি অগ্রগতি হয়নি। গত অর্থবছরে-এ মোট রপ্তানি আয় হয়েছে ৪৮ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন ডলার, যা ২০২৪-২৫-এর ৪৮ দশমিক ৩০ বিলিয়ন ডলারের চেয়ে মাত্র দশমিক ১৭ শতাংশ বেশি। অথচ সরকারের নির্ধারিত লক্ষ্য ছিল ৫৫ বিলিয়ন ডলার। লক্ষ্য থেকে রপ্তানি কম হয়েছে ১২ দশমিক ০৪ শতাংশ।
তবে অর্থবছরের শেষ মাস জুনে রপ্তানিতে বড় ধরনের প্রত্যাবর্তন হয়েছে। এ মাসে রপ্তানি আয় ২৪ দশমিক ৯৩ শতাংশ বেড়ে ৪ দশমিক ১৯ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু পুরো বছরের দুর্বল পারফরম্যান্স কাটিয়ে ওঠার জন্য এই প্রবৃদ্ধি যথেষ্ট হয়নি।
অন্যদিকে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ আমদানির মোট মূল্য ১০ দশমিক ০৭ শতাংশ বেড়ে ৭৫ দশমিক ২৪ বিলিয়ন ডলারে উঠেছে। খাদ্যশস্য, মধ্যবর্তী পণ্য ও মূলধনী পণ্যের আমদানি বেড়েছে যথাক্রমে ১৮ দশমিক ০৪ শতাংশ, ৯ দশমিক ৭৭ শতাংশ ও ৪ দশমিক ১০ শতাংশ।
এতে বলা হয়,বৈদেশিক খাতে আরেকটি উদ্বেগের জায়গা হলো এফডিআই। গত অর্থবছরে-এ দেশে নিট সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ কমে ১ দশমিক ৪৬৫ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে, যা আগের অর্থবছরের ১ দশমিক ৭২৪ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় ১৫ দশমিক ০২ শতাংশ কম।

























