ছয় মাসে অর্থনীতির মিশ্র চিত্র, বন্ধ ৯৫ কারখানা
বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম ছয় মাসে দেশের অর্থনীতিতে একদিকে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা গেলেও অন্যদিকে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সূচকে অবনতি হয়েছে। প্রবাসী আয় ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভসহ ৩১টি প্রধান অর্থনৈতিক সূচকের মধ্যে ১২টিতে উন্নতি হলেও মূল্যস্ফীতি, মাথাপিছু ঋণ, বিনিয়োগ ও শিল্প উৎপাদনসহ ১৯টি সূচকে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে বলে জানিয়েছে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি)।
সোমবার ধানমন্ডিতে সিপিডির কার্যালয়ে আয়োজিত ‘সরকারের ছয় মাস: একটি অর্থনৈতিক পর্যালোচনা’ শীর্ষক মিডিয়া সংলাপে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। অনুষ্ঠানে মূল পর্যালোচনা উপস্থাপন করেন সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। এ সময় সংস্থাটির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান ও অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান উপস্থিত ছিলেন।
ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের মতে, নতুন সরকারের কাছে মানুষের বড় প্রত্যাশা ছিল অর্থনীতিকে ঘুরে দাঁড় করানো এবং সুশাসন নিশ্চিত করা। কিন্তু ছয় মাসের কর্মকাণ্ড পর্যালোচনা করে এই দুই ক্ষেত্রেই প্রত্যাশিত অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। বরং অর্থনীতি ও প্রশাসন—দুই ক্ষেত্রেই এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, বর্তমান সরকার আগের সরকারের কাছ থেকে দুর্বল অর্থনীতি পেয়েছে। ব্যাংকিং খাতের সংকট, খেলাপি ঋণ, অর্থ পাচার, তারল্য সংকট ও রাজস্ব ঘাটতির মতো বড় চ্যালেঞ্জ ছিল শুরু থেকেই। পাশাপাশি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও অনুকূলে ছিল না। তবে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় অর্থনীতিকে দ্রুত পুনরুদ্ধারের যে প্রত্যাশা ছিল, তার প্রতিফলন এখনো স্পষ্ট নয়।
বিনিয়োগে ধীরগতি, বন্ধ ৯৫ কারখানা
সিপিডির পর্যালোচনায় বেসরকারি বিনিয়োগের পরিস্থিতিকে অন্যতম বড় উদ্বেগ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারি থেকে জুনের মধ্যে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশ থেকে কমে ৪ দশমিক ৫ শতাংশে নেমেছে। একই সময়ে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির জন্য ঋণপত্র খোলার প্রবৃদ্ধিও নেতিবাচক হয়েছে। কমেছে নিট বিদেশি বিনিয়োগও।
শিল্প খাতের পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক বলে মন্তব্য করেন দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তাঁর ভাষ্য, উৎপাদন খাত ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি থেকে নেতিবাচক ধারায় চলে গেছে। ফলে দ্রুত বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ার কোনো সুস্পষ্ট লক্ষণ এখনো দেখা যাচ্ছে না।
সিপিডির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত গাজীপুর, সাভার-আশুলিয়া এবং নারায়ণগঞ্জ-নরসিংদীর শিল্পাঞ্চলে ৯৫টি কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। এর ফলে কর্মসংস্থান হারিয়েছেন ৬১ হাজার ৮৮১ জন।
রিজার্ভ বৃদ্ধিকেও সরলভাবে অর্থনীতির সুস্বাস্থ্যের লক্ষণ হিসেবে দেখার বিষয়ে সতর্ক করেছেন দেবপ্রিয়। তাঁর মতে, বিনিয়োগ ও আমদানি কমে যাওয়ার কারণেও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়তে পারে। তাই রিজার্ভ বৃদ্ধির পাশাপাশি এর পেছনের অর্থনৈতিক বাস্তবতাও বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
রাজস্ব আদায় নিয়েও উদ্বেগ
২০২৬-২৭ অর্থবছরে সরকারের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এই লক্ষ্য অর্জনে প্রায় ৪২ শতাংশ রাজস্ব প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন হবে। বর্তমান বাস্তবতায় এত বড় প্রবৃদ্ধি অর্জন কঠিন হতে পারে বলে মনে করছে সিপিডি।
সুশাসন নিয়ে প্রশ্ন
অর্থনীতির পাশাপাশি সুশাসনের ক্ষেত্রেও সরকারের কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ড. দেবপ্রিয়। দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, দখলবাজি, সিন্ডিকেট এবং মব সহিংসতা বন্ধের প্রতিশ্রুতি থাকলেও বাস্তবে এসব বিষয়ে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে না বলে মন্তব্য করেন তিনি।
নারী, শিশু ও সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার ঘটনায় কার্যকর প্রতিরোধের ঘাটতি রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে গুম ও মানবাধিকার সুরক্ষায় প্রণীত আইনের কিছু সীমাবদ্ধতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি।
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য আরও বলেন, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ ও তথ্যভিত্তিক ‘বেসলাইন’ তৈরি করা প্রয়োজন ছিল। সেটি না থাকায় এখন সরকারের নেওয়া পদক্ষেপ ও অর্থনীতির পরিবর্তন তুলনা করে মূল্যায়ন করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
‘আড়াই-তলা সরকার’ নিয়ে মন্তব্য
সরকারের কাঠামো নিয়েও সমালোচনামূলক মন্তব্য করেন সিপিডির এই ফেলো। মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও বিভিন্ন পর্যায়ের বিশেষ সহকারীদের সমন্বয়ে বর্তমান প্রশাসনিক কাঠামোকে তিনি ‘আড়াই-তলা সরকার’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন।
তাঁর মতে, সরকারের চেয়ে প্রধানমন্ত্রী ব্যক্তিগতভাবে বেশি জনপ্রিয়। এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো এই জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও প্রশাসনকে কার্যকরভাবে পরিচালনা করা।
ছয় মাসের সরকারের সার্বিক মূল্যায়ন করতে গিয়ে তিনি বলেন, সরকারের প্রতি মানুষের প্রত্যাশা অনেক বেশি; কিন্তু বাস্তব কার্যক্রম সেই প্রত্যাশার সঙ্গে পুরোপুরি তাল মিলিয়ে এগোতে পারছে না।
নতুন পে-স্কেল নিয়ে দ্রুত সিদ্ধান্তের তাগিদ
সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতন কাঠামো নিয়েও দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তাঁর মতে, বিষয়টি দীর্ঘদিন ঝুলিয়ে রাখলে সমস্যা আরও জটিল হবে।
তিনি বলেন, নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে সরকারের আর্থিক সক্ষমতা অবশ্যই বিবেচনায় নিতে হবে। তবে শুরুতেই সীমিত পরিসরে মহার্ঘ ভাতা দেওয়ার মতো কোনো অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা নেওয়া যেত। এখন সিদ্ধান্ত নিতে যত বেশি দেরি হবে, পরিস্থিতি সামাল দেওয়া তত কঠিন হয়ে উঠবে।
সিপিডির এই মূল্যায়নে স্পষ্ট হয়েছে, সরকারের প্রথম ছয় মাসে অর্থনীতির কিছু সূচকে ইতিবাচক পরিবর্তন এলেও বিনিয়োগ, শিল্প, কর্মসংস্থান, রাজস্ব ও মূল্যস্ফীতির মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে চাপ রয়ে গেছে। ফলে অর্থনীতিকে টেকসইভাবে ঘুরে দাঁড় করাতে দ্রুত ও সমন্বিত পদক্ষেপের প্রয়োজন রয়েছে।

























