গ্যাসের চাপে থমকে শিল্পের চাকা, ঝুঁকিতে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান
দেশের শিল্পাঞ্চলগুলোতে গ্যাসের তীব্র সংকট এখন আর সাময়িক ভোগান্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। নরসিংদী, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর ও সাভার-আশুলিয়াসহ বিভিন্ন শিল্প এলাকায় গ্যাসের চাপ এতটাই কমে গেছে যে, অনেক কারখানায় উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে। কোথাও উৎপাদন নেমে এসেছে স্বাভাবিক সক্ষমতার এক-চতুর্থাংশে, আবার কোথাও মেশিন চালানোর মতো পর্যাপ্ত গ্যাসই মিলছে না।
গ্যাসনির্ভর কারখানাগুলোর এমন পরিস্থিতিতে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি শ্রমিকদের কর্মসংস্থান, রপ্তানি এবং পুরো সরবরাহব্যবস্থা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। উৎপাদন না থাকলেও শ্রমিকের বেতন, ব্যাংকঋণের কিস্তি, বিদ্যুৎ ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় চালিয়ে যেতে হচ্ছে উদ্যোক্তাদের।
নরসিংদীতে উৎপাদনে বড় ধস
নরসিংদীর মাধবদী, চৌয়ালা ও আশপাশের শিল্প এলাকায় সংকটের প্রভাব সবচেয়ে স্পষ্ট। স্থানীয় শিল্পোদ্যোক্তাদের হিসাবে, ছোট-বড় মিলিয়ে এখানে চার হাজারের বেশি কারখানা রয়েছে। এর মধ্যে বিপুলসংখ্যক কারখানা টেক্সটাইল, ডাইং, স্পিনিং ও পোশাক উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত। সাম্প্রতিক সংকটে অনেক কারখানার উৎপাদন ৭০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে উৎপাদন নেমে এসেছে স্বাভাবিক সক্ষমতার মাত্র ১০ শতাংশে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে কিছু কারখানা কাঠ ব্যবহার করে বয়লার চালানোর চেষ্টা করছে। তবে এতে উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাচ্ছে। ফলে গ্যাসের বিকল্প হিসেবে অন্য জ্বালানি ব্যবহার করেও দীর্ঘমেয়াদে ব্যবসা টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।
চৌয়ালার একটি টেক্সটাইল মিলে ১০টি ইউনিটের মধ্যে সাতটিই গ্যাসের অভাবে বন্ধ রয়েছে। কারখানাটির স্বাভাবিক উৎপাদন সক্ষমতা অনেক বেশি হলেও গ্যাসের ঘাটতিতে উৎপাদন ব্যাপকভাবে কমেছে। এর প্রভাব পড়েছে শ্রমিকদের ওপরও; বিপুলসংখ্যক কর্মী কার্যত কাজের বাইরে রয়েছেন।
আশুলিয়ায় ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে উৎপাদন
সাভার-আশুলিয়ার শিল্পাঞ্চলেও একই চিত্র। কাঠগড়া-আমতলা এলাকার একটি পোশাক কারখানা কয়েক সপ্তাহ সীমিত সক্ষমতায় চলার পর শেষ পর্যন্ত বন্ধ হয়ে গেছে। স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিন ৫০ হাজার পিস উৎপাদনের সক্ষমতা থাকলেও গ্যাস সংকটে সর্বোচ্চ ২০ হাজার পিস পর্যন্ত উৎপাদন করা সম্ভব হয়েছে। অনেক মেশিনও বন্ধ রাখতে হয়েছে।
একই এলাকার একটি ডাইং কারখানার দৈনিক উৎপাদন সক্ষমতা ৯০ টন হলেও বর্তমানে দুই টনও উৎপাদন করা যাচ্ছে না। অথচ উৎপাদন বন্ধ থাকলেও শ্রমিকদের বেতনসহ অন্যান্য নিয়মিত ব্যয় চালিয়ে যেতে হচ্ছে।
নারায়ণগঞ্জে অচল ডাইং-ফিনিশিং
নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা ও বিসিক শিল্প এলাকার পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় ডাইং, ফিনিশিং ও টেক্সটাইল কারখানার বড় অংশ স্বাভাবিক উৎপাদনে ফিরতে পারছে না। কোথাও শ্রমিকেরা কারখানায় এসে কাজ না করে ফিরে যাচ্ছেন, আবার কোথাও উৎপাদন বন্ধ রেখে বিকল্প কাজে শ্রমিকদের ব্যস্ত রাখার চেষ্টা চলছে।
এ সংকটের প্রভাব পোশাক খাতেও পড়ছে। কারণ ডাইং ও ফিনিশিং ইউনিটে উৎপাদন ব্যাহত হলে পোশাক কারখানাগুলো প্রয়োজনীয় কাপড় সময়মতো না পাওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে।
গাজীপুরে উৎপাদন নেমেছে ২৫ শতাংশে
গাজীপুরের মাওনা এলাকার একটি সিরামিক কারখানায় গ্যাস সংকটে উৎপাদন স্বাভাবিক সক্ষমতার প্রায় এক-চতুর্থাংশে নেমে এসেছে। দৈনিক ২২ হাজার পিস উৎপাদনের সক্ষমতা থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে উৎপাদন হয়েছে মাত্র প্রায় ছয় হাজার পিস। উচ্চ তাপমাত্রায় উৎপাদন প্রয়োজন এমন পণ্যও তৈরি করা যাচ্ছে না। ফলে কিছু ক্রয়াদেশ স্থগিত হওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
রপ্তানি নিয়েও বাড়ছে শঙ্কা
গ্যাস সংকটের প্রভাব এখন শুধু কারখানার উৎপাদনেই আটকে নেই। সুতা, কাপড়, ডাইং ও ফিনিশিংয়ের মতো সরবরাহব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ ধাপগুলো বাধাগ্রস্ত হওয়ায় তৈরি পোশাক শিল্পও চাপের মুখে পড়ছে। সময়মতো পণ্য প্রস্তুত করা না গেলে রপ্তানি আদেশ পূরণে বিলম্ব হতে পারে। এতে ক্রেতাদের আস্থা কমার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ অর্ডার অন্য দেশে চলে যাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
ইতোমধ্যে কিছু উদ্যোক্তা অতিরিক্ত ব্যয় করে বিকল্প উপায়ে পণ্য সরবরাহের চেষ্টা করছেন। কেউ কেউ আকাশপথে পণ্য পাঠানোর মতো ব্যয়বহুল সিদ্ধান্তও নিতে বাধ্য হচ্ছেন।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগ কর্মসংস্থান
উৎপাদন দীর্ঘ সময় ব্যাহত হলে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়তে পারে শ্রমিকদের কর্মসংস্থান। প্রথমে শিফট কমানো, এরপর ছুটিতে পাঠানো এবং পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে জনবল কমানোর মতো সিদ্ধান্ত নিতে পারেন উদ্যোক্তারা।
এর প্রভাব শুধু কারখানার শ্রমিকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। পরিবহন, স্থানীয় বাজার, খাবারের দোকান, বাসাভাড়া ও ছোট ব্যবসার ওপরও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
বিকল্প জ্বালানিতে বাড়ছে খরচ
গ্যাস না থাকায় অনেক প্রতিষ্ঠান কাঠ, ডিজেল কিংবা বাইরে থেকে সংগ্রহ করা গ্যাস ব্যবহার করে উৎপাদন চালানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু এসব বিকল্পের কারণে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম সহজে বাড়ানো সম্ভব না হওয়ায় অতিরিক্ত ব্যয়ের বড় অংশ উদ্যোক্তাদেরই বহন করতে হচ্ছে।
এর সঙ্গে যোগ হয়েছে বিদ্যুৎ সংকটের চাপ। গ্যাস সরবরাহ কমলে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনও বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে কারখানাগুলোকে জেনারেটর চালাতে অতিরিক্ত ডিজেল ব্যবহার করতে হচ্ছে, যা উৎপাদন খরচ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
সংকটের পেছনে দীর্ঘমেয়াদি কারণও আছে
সাম্প্রতিক গ্যাস সংকটের তাৎক্ষণিক কারণ হিসেবে এলএনজি টার্মিনালের সমস্যা সামনে এলেও দেশের গ্যাস সরবরাহব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদি দুর্বলতাও এতে স্পষ্ট হয়েছে। পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন কমছে, নতুন উৎস থেকে পর্যাপ্ত গ্যাস যুক্ত হচ্ছে না। ফলে আমদানি করা এলএনজির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে।
শিল্পোদ্যোক্তাদের মতে, গ্যাস সরবরাহ ২৪ ঘণ্টা নিশ্চিত করা সম্ভব না হলেও অন্তত কখন এবং কতক্ষণ গ্যাস পাওয়া যাবে—তার একটি নির্ভরযোগ্য পূর্বঘোষিত পরিকল্পনা থাকা দরকার। এতে কারখানাগুলো উৎপাদন ও শ্রমিক ব্যবস্থাপনা আগেভাগে ঠিক করতে পারবে।
গ্যাস সংকট দ্রুত সমাধান না হলে এর প্রভাব উৎপাদন কমে যাওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। শিল্প, রপ্তানি, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান—সব ক্ষেত্রেই বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে। তাই এখন সবচেয়ে জরুরি হয়ে উঠেছে শিল্পাঞ্চলে নির্ভরযোগ্য গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তার কার্যকর পরিকল্পনা নেওয়া।

























