ঢাকা ১১:১১ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ব্যাটারিচালিত রিকশায় লাগাম: ঢাকায় ৮ জোনে নতুন ব্যবস্থাপনার পরিকল্পনা

নিজস্ব সংবাদ :

রাজধানীর সড়কে ব্যাটারিচালিত রিকশার বেপরোয়া চলাচল নিয়ন্ত্রণে নতুন পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার। প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় পুরো ঢাকা শহরকে আটটি পৃথক জোনে ভাগ করে রিকশা পরিচালনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। প্রতিটি জোনের রিকশায় থাকবে আলাদা রং এবং ডিজিটাল নিবন্ধনের জন্য যুক্ত করা হবে কিউআর কোড।

নতুন নিয়ম কার্যকর হলে একটি জোনে নিবন্ধিত রিকশা অন্য জোনে গিয়ে চলাচল করতে পারবে না। ফলে নির্ধারিত এলাকার বাইরে চলাচলকারী রিকশা শনাক্ত করা যেমন সহজ হবে, তেমনি অবৈধ যানবাহনের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে।

সরকারের পরিকল্পনায় শুধু রিকশার চলাচল নিয়ন্ত্রণ নয়, চার্জিং ব্যবস্থায়ও পরিবর্তন আনার কথা রয়েছে। জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুতের ওপর চাপ কমাতে বিভিন্ন স্থানে সৌরবিদ্যুৎনির্ভর চার্জিং স্টেশন বা চার্জিং হাব গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বাসাবাড়ি কিংবা বাণিজ্যিক সংযোগ থেকে অবৈধভাবে রিকশার ব্যাটারি চার্জ দেওয়ার প্রবণতাও বন্ধ করার পরিকল্পনা রয়েছে।

দীর্ঘদিন ধরে রাজধানীর প্রধান সড়ক থেকে আবাসিক এলাকার অলিগলি—সবখানেই ব্যাটারিচালিত রিকশার সংখ্যা ও চলাচল নিয়ে নানা অভিযোগ রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে চালকদের যথাযথ প্রশিক্ষণ ও বৈধ লাইসেন্স না থাকায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে। পাশাপাশি এসব যানকে যানজটের অন্যতম কারণ হিসেবেও দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় এবং ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন যৌথভাবে এই জোনভিত্তিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে কাজ করছে।

স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম জানিয়েছেন, ব্যাটারিচালিত রিকশা পুরোপুরি বন্ধ করার পরিকল্পনা সরকারের নেই। বরং চালকদের জীবিকা বিবেচনায় রেখে এসব যানকে একটি নির্দিষ্ট নিয়মের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, ঢাকা আটটি জোনে ভাগ হলে প্রতিটি এলাকায় নির্দিষ্ট সংখ্যার বেশি রিকশা চলাচলের সুযোগ থাকবে না। একই সঙ্গে অনুমোদিত রিকশা চিহ্নিত করতে আলাদা রং ও কিউআরভিত্তিক নিবন্ধন চালু করা হবে। এতে অবৈধ ও অন্য জোন থেকে আসা রিকশা শনাক্ত করা সহজ হবে।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুস সালাম জানান, দক্ষিণ সিটির বিভিন্ন এলাকায় জরিপের কাজ শুরু হয়েছে। দুই সিটি করপোরেশনের সমন্বয়ে আটটি জোন নির্ধারণের প্রক্রিয়াও এগিয়ে চলছে।

তিনি জানান, প্রতিটি রিকশার জন্য স্থায়ী কিউআর কোড রাখা হবে। সেটি স্ক্যান করলে সংশ্লিষ্ট রিকশার মালিক ও চালকের তথ্য জানা যাবে। এর ফলে রিকশা চুরি এবং অপরাধমূলক কাজে যান ব্যবহারের ঘটনাও নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হতে পারে।

এদিকে সৌরবিদ্যুৎনির্ভর চার্জিং হাব তৈরির বিষয়েও বেসরকারি উদ্যোক্তাদের সঙ্গে আলোচনা চলছে বলে জানিয়েছেন তিনি।

নগর বিশেষজ্ঞদের মতে, উদ্যোগটি বাস্তবায়ন করতে হলে শুধু রিকশায় রং বা কিউআর কোড যুক্ত করলেই হবে না। জোনের সীমানায় কার্যকর নজরদারি, চালকদের প্রশিক্ষণ, লাইসেন্স ব্যবস্থা এবং মূল সড়কে রিকশার চলাচল নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি পর্যাপ্ত চার্জিং স্টেশন দ্রুত স্থাপন করাও জরুরি।

যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরীর মতে, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও ছোট যানবাহনের জন্য দ্রুত একটি কার্যকর নীতিমালা প্রয়োজন। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে নিবন্ধন ও লাইসেন্সিং ব্যবস্থা চালু করা হলে একদিকে যেমন সড়কে শৃঙ্খলা ফিরতে পারে, অন্যদিকে সরকারও রাজস্ব আয়ের নতুন সুযোগ পাবে।

সরকারের নতুন পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে রাজধানীর ব্যাটারিচালিত রিকশা ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। তবে জোনভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ, ডিজিটাল নিবন্ধন এবং পরিবেশবান্ধব চার্জিং ব্যবস্থা কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা যায়—সেটিই এখন মূল চ্যালেঞ্জ।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

আপলোডকারীর তথ্য

ব্যাটারিচালিত রিকশায় লাগাম: ঢাকায় ৮ জোনে নতুন ব্যবস্থাপনার পরিকল্পনা

আপডেট সময় ০৩:০৯:১৮ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৯ অগাস্ট ২০২৬

রাজধানীর সড়কে ব্যাটারিচালিত রিকশার বেপরোয়া চলাচল নিয়ন্ত্রণে নতুন পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার। প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় পুরো ঢাকা শহরকে আটটি পৃথক জোনে ভাগ করে রিকশা পরিচালনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। প্রতিটি জোনের রিকশায় থাকবে আলাদা রং এবং ডিজিটাল নিবন্ধনের জন্য যুক্ত করা হবে কিউআর কোড।

নতুন নিয়ম কার্যকর হলে একটি জোনে নিবন্ধিত রিকশা অন্য জোনে গিয়ে চলাচল করতে পারবে না। ফলে নির্ধারিত এলাকার বাইরে চলাচলকারী রিকশা শনাক্ত করা যেমন সহজ হবে, তেমনি অবৈধ যানবাহনের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে।

সরকারের পরিকল্পনায় শুধু রিকশার চলাচল নিয়ন্ত্রণ নয়, চার্জিং ব্যবস্থায়ও পরিবর্তন আনার কথা রয়েছে। জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুতের ওপর চাপ কমাতে বিভিন্ন স্থানে সৌরবিদ্যুৎনির্ভর চার্জিং স্টেশন বা চার্জিং হাব গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বাসাবাড়ি কিংবা বাণিজ্যিক সংযোগ থেকে অবৈধভাবে রিকশার ব্যাটারি চার্জ দেওয়ার প্রবণতাও বন্ধ করার পরিকল্পনা রয়েছে।

দীর্ঘদিন ধরে রাজধানীর প্রধান সড়ক থেকে আবাসিক এলাকার অলিগলি—সবখানেই ব্যাটারিচালিত রিকশার সংখ্যা ও চলাচল নিয়ে নানা অভিযোগ রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে চালকদের যথাযথ প্রশিক্ষণ ও বৈধ লাইসেন্স না থাকায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে। পাশাপাশি এসব যানকে যানজটের অন্যতম কারণ হিসেবেও দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় এবং ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন যৌথভাবে এই জোনভিত্তিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে কাজ করছে।

স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম জানিয়েছেন, ব্যাটারিচালিত রিকশা পুরোপুরি বন্ধ করার পরিকল্পনা সরকারের নেই। বরং চালকদের জীবিকা বিবেচনায় রেখে এসব যানকে একটি নির্দিষ্ট নিয়মের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, ঢাকা আটটি জোনে ভাগ হলে প্রতিটি এলাকায় নির্দিষ্ট সংখ্যার বেশি রিকশা চলাচলের সুযোগ থাকবে না। একই সঙ্গে অনুমোদিত রিকশা চিহ্নিত করতে আলাদা রং ও কিউআরভিত্তিক নিবন্ধন চালু করা হবে। এতে অবৈধ ও অন্য জোন থেকে আসা রিকশা শনাক্ত করা সহজ হবে।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুস সালাম জানান, দক্ষিণ সিটির বিভিন্ন এলাকায় জরিপের কাজ শুরু হয়েছে। দুই সিটি করপোরেশনের সমন্বয়ে আটটি জোন নির্ধারণের প্রক্রিয়াও এগিয়ে চলছে।

তিনি জানান, প্রতিটি রিকশার জন্য স্থায়ী কিউআর কোড রাখা হবে। সেটি স্ক্যান করলে সংশ্লিষ্ট রিকশার মালিক ও চালকের তথ্য জানা যাবে। এর ফলে রিকশা চুরি এবং অপরাধমূলক কাজে যান ব্যবহারের ঘটনাও নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হতে পারে।

এদিকে সৌরবিদ্যুৎনির্ভর চার্জিং হাব তৈরির বিষয়েও বেসরকারি উদ্যোক্তাদের সঙ্গে আলোচনা চলছে বলে জানিয়েছেন তিনি।

নগর বিশেষজ্ঞদের মতে, উদ্যোগটি বাস্তবায়ন করতে হলে শুধু রিকশায় রং বা কিউআর কোড যুক্ত করলেই হবে না। জোনের সীমানায় কার্যকর নজরদারি, চালকদের প্রশিক্ষণ, লাইসেন্স ব্যবস্থা এবং মূল সড়কে রিকশার চলাচল নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি পর্যাপ্ত চার্জিং স্টেশন দ্রুত স্থাপন করাও জরুরি।

যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরীর মতে, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও ছোট যানবাহনের জন্য দ্রুত একটি কার্যকর নীতিমালা প্রয়োজন। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে নিবন্ধন ও লাইসেন্সিং ব্যবস্থা চালু করা হলে একদিকে যেমন সড়কে শৃঙ্খলা ফিরতে পারে, অন্যদিকে সরকারও রাজস্ব আয়ের নতুন সুযোগ পাবে।

সরকারের নতুন পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে রাজধানীর ব্যাটারিচালিত রিকশা ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। তবে জোনভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ, ডিজিটাল নিবন্ধন এবং পরিবেশবান্ধব চার্জিং ব্যবস্থা কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা যায়—সেটিই এখন মূল চ্যালেঞ্জ।