গ্যাসের সরবরাহ বাড়ায় কমছে বিদ্যুৎ সংকট, তবে গ্রামে লোডশেডিংয়ের ভোগান্তি অব্যাহত
গ্যাসের সরবরাহ কিছুটা বাড়ায় দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সাম্প্রতিক ‘অতি সংকট পরিস্থিতি’ থেকে ধীরে ধীরে স্বস্তি ফিরতে শুরু করেছে। গত দুই সপ্তাহের তুলনায় চলতি সপ্তাহে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সরবরাহ ঘাটতি কমেছে। তবে রাজধানী ও বড় শহরগুলোতে পরিস্থিতির উন্নতি হলেও গ্রামাঞ্চলে লোডশেডিংয়ের ভোগান্তি এখনো তীব্র।
পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশের তথ্য বলছে, রোববার রাত ১টায় জাতীয় পর্যায়ে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৫ হাজার ২৭৬ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে সরবরাহ হয়েছে ১৪ হাজার ৪৭৪ মেগাওয়াট। ফলে ওই সময়ে ঘাটতি ছিল ৮০২ মেগাওয়াট। পরদিন সোমবার দুপুর ১২টায় ১৪ হাজার ৮১০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ পাওয়া যায় ১৩ হাজার ৯১৭ মেগাওয়াট। এ সময় সর্বোচ্চ ঘাটতি ছিল ৮৯৩ মেগাওয়াট।
গত দুই সপ্তাহে একই সময়ে প্রায় ৩ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত লোডশেডিং হলেও বর্তমানে সেই ঘাটতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
পেট্রোবাংলার হিসাব অনুযায়ী, শনিবার সকাল থেকে রোববার সকাল পর্যন্ত দেশে প্রায় ২৪২ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়। তবে সোমবার বিকেল ৪টা পর্যন্ত সরবরাহ নেমে আসে প্রায় ২২২ কোটি ঘনফুটে। এর মধ্যে স্থানীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে পাওয়া যায় ১৬১ কোটি ৫০ লাখ ঘনফুট এবং এলএনজি থেকে রূপান্তরিত গ্যাস ছিল প্রায় ৬০ কোটি ৫০ লাখ ঘনফুট।
দেশে প্রতিদিন গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৪১০ কোটি ঘনফুট। সরবরাহ ৩১০ থেকে ৩২০ কোটি ঘনফুটের মধ্যে থাকলে শিল্পসহ গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলো কোনোভাবে সচল রাখা সম্ভব হয়। কিন্তু সরবরাহ এর নিচে নেমে গেলে সংকট দ্রুত তীব্র আকার ধারণ করে। সম্প্রতি সরবরাহ ২০০ কোটি ঘনফুটের নিচে নেমে যাওয়ায় পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে উঠেছিল। পরে সরবরাহ বাড়তে থাকায় সংকট কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এসেছে।
গ্যাস সংকটের সরাসরি প্রভাব বিদ্যুৎ উৎপাদনে
দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের বড় একটি অংশ গ্যাসভিত্তিক হওয়ায় গ্যাসের ঘাটতি দেখা দিলেই বিদ্যুৎ উৎপাদনে তার প্রভাব পড়ে। সাম্প্রতিক সময়ে মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনালগুলোতে সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়।
বৈরী আবহাওয়ার কারণে সামিটের ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল থেকেও কয়েক দিন গ্যাস সরবরাহ বন্ধ ছিল। এতে জাতীয় গ্রিডে গ্যাসের প্রবাহ কমে যায় এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন কমাতে হয়। এর প্রভাব পড়ে রাজধানীতেও। এর আগে গত ২১ জুলাই কারিগরি সমস্যার কারণে পেট্রোবাংলার এলএনজি টার্মিনাল থেকেও সরবরাহ ব্যাহত হয়েছিল।
সব মিলিয়ে প্রায় এক মাস ধরে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত নানা সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
শহরের তুলনায় গ্রামে বেশি লোডশেডিং
বিদ্যুৎ সরবরাহ কিছুটা বাড়লেও স্বস্তি পুরোপুরি ফিরেনি গ্রামাঞ্চলে। রাজধানী ও বড় শহরের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে গিয়ে জেলা ও পল্লী বিদ্যুতের আওতাধীন এলাকাগুলোতে তুলনামূলক বেশি লোডশেডিং করতে হচ্ছে।
সাম্প্রতিক সময়ে গ্রামে লোডশেডিং কিছুটা কমার পেছনে গ্যাস সরবরাহ বৃদ্ধির পাশাপাশি বৃষ্টির কারণে বিদ্যুতের চাহিদা কমে যাওয়াকেও কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে তাপমাত্রা আবার বাড়লে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে পরিস্থিতি ফের কঠিন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
৬১ হাজার টন এলএনজি কার্গো নিয়ে নতুন উদ্বেগ
চলমান সংকটের মধ্যেই নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে সৌদি আরামকোর একটি এলএনজি কার্গো। প্রায় ৬১ হাজার টন এলএনজি নিয়ে ‘আল হামরা’ নামের একটি জাহাজ মহেশখালীতে পৌঁছালেও সেটি গ্রহণ করেনি পেট্রোবাংলা।
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ২৯ বছর পুরোনো জাহাজটি প্রয়োজনীয় কারিগরি ও নিরাপত্তা মানদণ্ড পূরণ না করায় সামিটের ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে কার্গো খালাসের অনুমতি দেওয়া হয়নি। পরে শনিবার জাহাজটি ফিরে যায়।
তবে এ ঘটনায় তাৎক্ষণিকভাবে দেশে এলএনজি সরবরাহ বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা নেই বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। বাতিল হওয়া কার্গোর পরিবর্তে নতুন একটি কার্গো সরবরাহের জন্য সংশ্লিষ্ট সরবরাহকারীকে বলা হয়েছে। পাশাপাশি অন্যান্য এলএনজি কার্গোও নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী আসার কথা রয়েছে।
তবু ঘটনাটি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ দুর্বলতা সামনে এনেছে। কারণ টার্মিনাল সচল থাকলেও সময়মতো পর্যাপ্ত এলএনজি কার্গো না এলে এর পূর্ণ সক্ষমতা কাজে লাগানো সম্ভব হবে না।
এদিকে দেশে এলএনজির সরবরাহ আরও বাড়াতে কাতারের সঙ্গে আলোচনায় বসার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি হলে বিদ্যুৎ ও শিল্প খাতে চাপ আরও কমবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে গ্যাসের সরবরাহ স্থিতিশীল না হওয়া পর্যন্ত বিদ্যুৎ সংকট পুরোপুরি কাটছে না—এটাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।


























