ঝিনাইদহে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের ভাঙা ভাস্কর্য ঘিরে ক্ষোভ
ঝিনাইদহ শহরের প্রবেশমুখে অবস্থিত বীরশ্রেষ্ঠ সিপাহী হামিদুর রহমানের ক্ষতিগ্রস্ত ভাস্কর্য পরিদর্শন করেছে ঢাকা থেকে আগত নাগরিক সমাজের একটি প্রতিনিধি দল। বৃহস্পতিবার দুপুরে তারা ঘটনাস্থলে পৌঁছে ভাস্কর্যের বর্তমান অবস্থা পর্যবেক্ষণ করেন এবং বীরশ্রেষ্ঠের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
প্রতিনিধি দলের সদস্যরা জানান, শুধু একটি ভাস্কর্য নয়, এটি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও জাতীয় আত্মপরিচয়ের প্রতীক। তাই এর ভাঙচুরের ঘটনা দেশজুড়ে মানুষের মধ্যে উদ্বেগ ও ক্ষোভ সৃষ্টি করেছে।
ভাস্কর্য ভাঙাকে ঘিরে বিতর্ক
গত জুলাই মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে চত্বরে থাকা ভাস্কর্যটি অপসারণ বা ভাঙার কাজ শুরু হলে স্থানীয় পর্যায়ে নানা প্রশ্নের জন্ম দেয়। শুরুতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্পষ্ট ব্যাখ্যা না আসায় মুক্তিযোদ্ধা, বীরশ্রেষ্ঠের স্বজন এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে। পরে জেলা প্রশাসন জানায়, বীরশ্রেষ্ঠের প্রকৃত অবয়বের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নতুন ভাস্কর্য নির্মাণ করা হবে। তবে বিদ্যমান ভাস্কর্য যেভাবে অপসারণ করা হয়েছে, তা নিয়ে সমালোচনা থামেনি।
প্রতিনিধি দলে যারা ছিলেন
সফরে অংশ নেন মুক্তিযোদ্ধা ও সাংবাদিক-লেখক আবু সাইদ খান, মানবাধিকার কমিশনের সাবেক কমিশনার নূর খান লিটন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস, নাগরিক উদ্যোগের প্রধান নির্বাহী জাকির হোসেন এবং ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ফারহা তানজীম তিতিল। এ সময় উপস্থিত ছিলেন বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের বোন রিজিয়া বেগমসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা।
‘মুক্তিযুদ্ধের প্রতীক ধ্বংস মেনে নেওয়া যায় না’
আবু সাইদ খান বলেন, মুক্তিযুদ্ধের স্মারক ও বীরশ্রেষ্ঠদের স্মৃতি জাতির গৌরবের অংশ। এগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া অত্যন্ত বেদনাদায়ক এবং দ্রুত যথাযথ মর্যাদায় পুনঃস্থাপন করা প্রয়োজন।
নূর খান লিটন বলেন, একটি বীরশ্রেষ্ঠের ভাস্কর্য উপড়ে ফেলার ঘটনা শুধু একটি স্থাপনার ক্ষতি নয়, এটি জাতির চেতনাকে আঘাত করার শামিল। তিনি জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানান।
অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস বলেন, বাংলাদেশের রাষ্ট্রচেতনার মূল ভিত্তি মুক্তিযুদ্ধ। একাত্তরের ইতিহাস ও ত্যাগকে অস্বীকার করে কোনো সাম্প্রদায়িক বা উগ্র শক্তির কর্মকাণ্ড গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
জাকির হোসেন প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, এমন গুরুত্বপূর্ণ একটি স্থাপনা অপসারণের ক্ষেত্রে জনগণকে অবহিত করা উচিত ছিল। তিনি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানান।
ফারহা তানজীম তিতিল বলেন, মুক্তিযুদ্ধের স্থাপনা সংরক্ষণ বা স্থানান্তরের মতো সিদ্ধান্ত জনগণের অংশগ্রহণ ও নাগরিক মতামতের ভিত্তিতে হওয়া উচিত। তিনি অপরাধীদের চিহ্নিত করে শাস্তির আওতায় আনার আহ্বান জানান।
রিজিয়া বেগমের আবেগঘন বক্তব্য
অনুষ্ঠানে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের বোন রিজিয়া বেগম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, তার ভাই দেশের জন্য জীবন দিয়েছেন। তার স্মৃতিচিহ্নের প্রতি অসম্মান জাতির জন্য লজ্জাজনক। তিনি দ্রুত মর্যাদাপূর্ণভাবে ভাস্কর্য পুনর্নির্মাণের দাবি জানান।
দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান
অনুষ্ঠান শেষে প্রতিনিধি দলের সদস্যরা এক যৌথ আহ্বানে বলেন, বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের ভাস্কর্য পুনর্নির্মাণ, ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত এবং দায়ীদের বিচারের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও জাতীয় ঐতিহ্যের প্রতি রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে তারা মুক্তিযুদ্ধের স্মারক ও স্থাপনাগুলো রক্ষায় দেশবাসীকে সচেতন ও ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান।

























