গণভবন এখন ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’: ৫ আগস্ট উদ্বোধন, শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি তুঙ্গে
দীর্ঘদিন দেশের প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন হিসেবে ব্যবহৃত গণভবন এবার নতুন পরিচয়ে আত্মপ্রকাশ করতে যাচ্ছে। ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’ নামে রূপান্তরিত এই স্থাপনাটি আগামী ৫ আগস্ট আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। উদ্বোধনের আগে শেষ মুহূর্তের সাজসজ্জা, নিরাপত্তা ও দর্শনার্থী ব্যবস্থাপনার কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে।
যদিও জাদুঘরের স্থায়ী জনবল এখনো নিয়োগ দেওয়া হয়নি, তবুও উদ্বোধন নির্ধারিত সময়েই হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। আপাতত জাতীয় জাদুঘরের অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কার্যক্রম পরিচালনা করবেন। পাশাপাশি আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগের প্রস্তুতিও চলছে।
শতকোটি টাকার প্রকল্প
জাদুঘর নির্মাণ ও সংস্কারে গণপূর্ত অধিদপ্তর এবং জাতীয় জাদুঘরের জন্য মোট ১২৩ কোটি ৪৫ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে ব্যয় হয়েছে ১১০ কোটি ৯২ লাখ টাকা এবং অব্যবহৃত ১২ কোটি ৫৩ লাখ টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়া হয়েছে। নতুন অর্থবছরে জাদুঘর পরিচালনার জন্য আরও ১৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
গণপূর্ত অধিদপ্তর মূল ভবনের সংস্কার, বৈদ্যুতিক অবকাঠামো ও নির্মাণকাজ সম্পন্ন করেছে। অন্যদিকে জাতীয় জাদুঘর গ্যালারি নির্মাণ, ভাস্কর্য, শিল্পকর্ম সংগ্রহ, তথ্যচিত্র নির্মাণ, প্রদর্শনী ও অভ্যন্তরীণ নকশার কাজ করেছে।
কী থাকছে জাদুঘরে?
জাদুঘরের বিভিন্ন গ্যালারিতে ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থান, গুম, নির্যাতন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের নানা তথ্য, ভুক্তভোগীদের স্মারক, শহীদদের ব্যবহৃত সামগ্রী এবং উদ্ধার হওয়া গুরুত্বপূর্ণ নথি সংরক্ষণ করা হয়েছে।
এ ছাড়া দর্শনার্থীদের জন্য নির্মাণ করা হয়েছে—
- পাঁচটি নতুন ওয়াকওয়ে
- সম্প্রসারিত লেক এলাকা
- ফুড কোর্ট
- টিকিট হাউস
- স্যুভেনির শপ
- প্রার্থনাকক্ষ
- প্রতীকী ‘আয়নাঘর’
- জুলাই মঞ্চ
জুলাই আন্দোলন, শাপলা ট্র্যাজেডি, বিডিআর বিদ্রোহসহ বিভিন্ন আলোচিত ঘটনার স্মৃতিচিহ্ন সংরক্ষণে বিশেষ মেমোরিয়ালও তৈরি করা হয়েছে। ইতোমধ্যে প্রায় আড়াই হাজার প্রতীকী কবর নির্মাণ করা হয়েছে এবং ১৯টি থিমে ৬২টি প্রামাণ্যচিত্র প্রস্তুত করা হয়েছে।
নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক
জাদুঘরের কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, লিখিত পরীক্ষা ছাড়াই শুধু মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। সমালোচনার মুখে সেই প্রক্রিয়া পরে স্থগিত করা হয়। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নতুন পরিচালনা পর্ষদ গঠনের পর স্বচ্ছ পদ্ধতিতে নিয়োগের বিষয়টি এগিয়ে নেওয়া হবে।
ব্যয় ও ক্রয়প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা
জাদুঘর নির্মাণে সরাসরি ক্রয়পদ্ধতি অনুসরণ, বিভিন্ন খাতে অতিরিক্ত ব্যয় এবং কিছু প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নিয়ে গণমাধ্যমে নানা প্রশ্ন উঠেছে। এ বিষয়ে জাদুঘর কর্তৃপক্ষের দাবি, সরকারি বিধি অনুসরণ করেই কাজ করা হয়েছে। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্প শেষ করার তাগিদে কিছু প্রক্রিয়া নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে বলে তারা স্বীকার করেছেন।
এদিকে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে সংশ্লিষ্ট মহল প্রকল্পটির পূর্ণাঙ্গ অডিটের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। এখনো গণপূর্ত অধিদপ্তরের কাছ থেকে জাদুঘরটি আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর এবং চূড়ান্ত অডিট সম্পন্ন হয়নি।
ইতিহাসের নতুন অধ্যায়
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর গণভবনকে স্মৃতি জাদুঘরে রূপান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে আইন প্রণয়ন, পরিচালনা পর্ষদ গঠন এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের মাধ্যমে এটি একটি পূর্ণাঙ্গ স্মৃতি জাদুঘরে পরিণত হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের আশা, এই জাদুঘর ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাস, গণ-আন্দোলন এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার দলিল হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।


























