ঢাকা ০৯:১৬ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬, ১৪ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বিক্রমপুরের বীর সেনানায়ক জামাল উদ্দিন চৌধুরী: যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সংসদ—এক অনন্য দেশপ্রেমের ইতিহাস

নিজস্ব সংবাদ :

মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখান উপজেলার মালখানগর ইউনিয়নের ঐতিহ্যবাহী কাজীরবাগ গ্রামের সন্তান বীর মুক্তিযোদ্ধা ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট (অব.) জামাল উদ্দিন চৌধুরী (সাবেক এমপি) বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল নাম। তিনি ছিলেন একাধারে সামরিক কর্মকর্তা, মুক্তিযুদ্ধের সাহসী সাব-সেক্টর কমান্ডার, জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধি এবং দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব।

জন্ম পারিবারিক পরিচয়

১৯৩২ সালের ১১ অক্টোবর মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখানের কাজীরবাগ গ্রামে তাঁর জন্ম। পিতা কাজিম উদ্দিন চৌধুরী এবং মাতা আমিরন নেসা। তাঁর সহধর্মিণী ছিলেন জাহানারা চৌধুরী।

তিনি বাংলাদেশের বিশিষ্ট শিল্পোদ্যোক্তা আবদুর রউফ চৌধুরীর বড় ভাই। একজন দেশের স্বাধীনতার জন্য অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেছেন, আরেকজন শিল্প ও কর্মসংস্থানের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করেছেন। দুই ভাই-ই বিক্রমপুরের গর্ব।

সামরিক জীবন থেকে স্বাধীনতার সংগ্রামে

১৯৫২ সালে পাকিস্তান বিমান বাহিনীতে ক্যাডেট হিসেবে যোগ দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন। দক্ষতা ও নেতৃত্বের গুণে তিনি ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট পদে উন্নীত হন। কিন্তু দেশের স্বাধীনতার প্রশ্নে তিনি ব্যক্তিগত নিরাপত্তার চেয়ে মাতৃভূমির মুক্তিকেই বেশি গুরুত্ব দেন।

জনগণের রায়ে নির্বাচিত প্রতিনিধি

১৯৭০ সালের ঐতিহাসিক সাধারণ নির্বাচনে সিরাজদিখান, শ্রীনগর ও লৌহজং এলাকার জনগণের ভোটে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য (এমপি) নির্বাচিত হন। বাঙালির অধিকার ও স্বাধিকার আন্দোলনে তিনি ছিলেন দৃঢ় কণ্ঠের নেতা।

মহান মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য ভূমিকা

বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের পর তিনি নিজ এলাকায় ফিরে তরুণদের সংগঠিত করেন। লাঠি, বল্লম, কোঁচ, শিকারি বন্দুক এবং থানার অস্ত্র দিয়ে প্রাথমিক সামরিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল—সংগঠিত জনগণই স্বাধীনতার সবচেয়ে বড় শক্তি।

২৫ মার্চের গণহত্যার পর তিনি ভারতে গিয়ে মুজিবনগর সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং ৮ নম্বর সেক্টরে যোগ দেন। প্রথমে অ্যাডজুট্যান্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও পরে মেজর এম. এ. মঞ্জুরের নেতৃত্বে সাব-সেক্টর কমান্ডার হিসেবে ফরিদপুরের ভাটিয়াপাড়া, বোয়ালমারীসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় একাধিক সম্মুখযুদ্ধে নেতৃত্ব দেন।

১০ ডিসেম্বর মুক্তিবাহিনী নিয়ে বোয়ালমারীতে প্রবেশের পর ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত তীব্র যুদ্ধ চলে। মধুমতী নদীর দুই তীরে গোলাগুলির মধ্যেও তিনি সহযোদ্ধাদের মনোবল অটুট রাখেন এবং সামনে এগিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন।

১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের ঘোষণা এলেও তিনি একজন প্রকৃত সেনানায়কের মতো সবাইকে সতর্ক থাকার নির্দেশ দেন। পরদিন ফরিদপুর সার্কিট হাউস ময়দানে পাকিস্তানি সেনাদের আনুষ্ঠানিক আত্মসমর্পণের ঐতিহাসিক মুহূর্তেরও তিনি প্রত্যক্ষ সাক্ষী ছিলেন।

যে স্মৃতি তাঁকে আজীবন কাঁদিয়েছে

মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর ক্যাম্পে প্রশিক্ষণ নেওয়া মাত্র ১৩–১৪ বছরের কিশোর হেমায়েত যুদ্ধে এক পাকিস্তানি সেনাকে গুলি করে আনন্দে মাথা তুলতেই শত্রুপক্ষের গুলিতে শহীদ হয়। মায়ের একমাত্র সন্তান সেই কিশোরের মৃত্যু জামাল উদ্দিন চৌধুরীকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি এই স্মৃতি বয়ে বেড়িয়েছেন।

স্বাধীনতার পর দেশের জন্য কাজ

স্বাধীনতার পর তিনি ফরিদপুর অঞ্চলে প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করে আইন-শৃঙ্খলা ও স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনতে কাজ করেন। পরে নিজ এলাকায় ফিরে যুদ্ধবিধ্বস্ত মানুষের পুনর্বাসন ও সমাজ পুনর্গঠনে আত্মনিয়োগ করেন।

রাজনৈতিক সামাজিক ভূমিকা

১৯৭৯ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে অংশ নেন। পাশাপাশি মুক্তিযোদ্ধাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন এবং ‘মুক্তিযোদ্ধা সংহতি পরিষদ’-এর সহ-সভাপতি নির্বাচিত হন।

শেষ বিদায়

১৯৮২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি মুক্তিযোদ্ধা সংহতি পরিষদের একটি সভায় অংশ নিতে ময়মনসিংহ যান। সভা শেষে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ২২ ফেব্রুয়ারি তিনি ইন্তেকাল করেন। তাঁকে তাঁর প্রিয় বিক্রমপুরের মাটিতে দাফন করা হয়।

পরিবার

তাঁর সহধর্মিণী জাহানারা চৌধুরী। সন্তানদের মধ্যে রয়েছেন আসমা জাহান চৌধুরী, সালমা জাহান চৌধুরী, আজমা জাহান চৌধুরী, প্রয়াত সাইফুল্লাহ জামাল চৌধুরী এবং কাহফিল ওয়ারা চৌধুরী।

নতুন প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণা

বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট (অব.) জামাল উদ্দিন চৌধুরীর অবদান নিঃসন্দেহে অনন্য। তিনি শুধু যুদ্ধক্ষেত্রের সাহসী সেনানায়ক নন, ছিলেন জনগণের নেতা এবং দেশগঠনের এক নিবেদিতপ্রাণ মানুষ। তাঁর জীবন, নেতৃত্ব ও আত্মত্যাগ নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।

বিক্রমপুরের এই কৃতী সন্তানের প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা।

 

 

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

আপলোডকারীর তথ্য

বিক্রমপুরের বীর সেনানায়ক জামাল উদ্দিন চৌধুরী: যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সংসদ—এক অনন্য দেশপ্রেমের ইতিহাস

আপডেট সময় ১১:৫৩:২৯ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬

মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখান উপজেলার মালখানগর ইউনিয়নের ঐতিহ্যবাহী কাজীরবাগ গ্রামের সন্তান বীর মুক্তিযোদ্ধা ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট (অব.) জামাল উদ্দিন চৌধুরী (সাবেক এমপি) বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল নাম। তিনি ছিলেন একাধারে সামরিক কর্মকর্তা, মুক্তিযুদ্ধের সাহসী সাব-সেক্টর কমান্ডার, জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধি এবং দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব।

জন্ম পারিবারিক পরিচয়

১৯৩২ সালের ১১ অক্টোবর মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখানের কাজীরবাগ গ্রামে তাঁর জন্ম। পিতা কাজিম উদ্দিন চৌধুরী এবং মাতা আমিরন নেসা। তাঁর সহধর্মিণী ছিলেন জাহানারা চৌধুরী।

তিনি বাংলাদেশের বিশিষ্ট শিল্পোদ্যোক্তা আবদুর রউফ চৌধুরীর বড় ভাই। একজন দেশের স্বাধীনতার জন্য অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেছেন, আরেকজন শিল্প ও কর্মসংস্থানের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করেছেন। দুই ভাই-ই বিক্রমপুরের গর্ব।

সামরিক জীবন থেকে স্বাধীনতার সংগ্রামে

১৯৫২ সালে পাকিস্তান বিমান বাহিনীতে ক্যাডেট হিসেবে যোগ দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন। দক্ষতা ও নেতৃত্বের গুণে তিনি ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট পদে উন্নীত হন। কিন্তু দেশের স্বাধীনতার প্রশ্নে তিনি ব্যক্তিগত নিরাপত্তার চেয়ে মাতৃভূমির মুক্তিকেই বেশি গুরুত্ব দেন।

জনগণের রায়ে নির্বাচিত প্রতিনিধি

১৯৭০ সালের ঐতিহাসিক সাধারণ নির্বাচনে সিরাজদিখান, শ্রীনগর ও লৌহজং এলাকার জনগণের ভোটে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য (এমপি) নির্বাচিত হন। বাঙালির অধিকার ও স্বাধিকার আন্দোলনে তিনি ছিলেন দৃঢ় কণ্ঠের নেতা।

মহান মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য ভূমিকা

বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের পর তিনি নিজ এলাকায় ফিরে তরুণদের সংগঠিত করেন। লাঠি, বল্লম, কোঁচ, শিকারি বন্দুক এবং থানার অস্ত্র দিয়ে প্রাথমিক সামরিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল—সংগঠিত জনগণই স্বাধীনতার সবচেয়ে বড় শক্তি।

২৫ মার্চের গণহত্যার পর তিনি ভারতে গিয়ে মুজিবনগর সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং ৮ নম্বর সেক্টরে যোগ দেন। প্রথমে অ্যাডজুট্যান্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও পরে মেজর এম. এ. মঞ্জুরের নেতৃত্বে সাব-সেক্টর কমান্ডার হিসেবে ফরিদপুরের ভাটিয়াপাড়া, বোয়ালমারীসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় একাধিক সম্মুখযুদ্ধে নেতৃত্ব দেন।

১০ ডিসেম্বর মুক্তিবাহিনী নিয়ে বোয়ালমারীতে প্রবেশের পর ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত তীব্র যুদ্ধ চলে। মধুমতী নদীর দুই তীরে গোলাগুলির মধ্যেও তিনি সহযোদ্ধাদের মনোবল অটুট রাখেন এবং সামনে এগিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন।

১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের ঘোষণা এলেও তিনি একজন প্রকৃত সেনানায়কের মতো সবাইকে সতর্ক থাকার নির্দেশ দেন। পরদিন ফরিদপুর সার্কিট হাউস ময়দানে পাকিস্তানি সেনাদের আনুষ্ঠানিক আত্মসমর্পণের ঐতিহাসিক মুহূর্তেরও তিনি প্রত্যক্ষ সাক্ষী ছিলেন।

যে স্মৃতি তাঁকে আজীবন কাঁদিয়েছে

মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর ক্যাম্পে প্রশিক্ষণ নেওয়া মাত্র ১৩–১৪ বছরের কিশোর হেমায়েত যুদ্ধে এক পাকিস্তানি সেনাকে গুলি করে আনন্দে মাথা তুলতেই শত্রুপক্ষের গুলিতে শহীদ হয়। মায়ের একমাত্র সন্তান সেই কিশোরের মৃত্যু জামাল উদ্দিন চৌধুরীকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি এই স্মৃতি বয়ে বেড়িয়েছেন।

স্বাধীনতার পর দেশের জন্য কাজ

স্বাধীনতার পর তিনি ফরিদপুর অঞ্চলে প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করে আইন-শৃঙ্খলা ও স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনতে কাজ করেন। পরে নিজ এলাকায় ফিরে যুদ্ধবিধ্বস্ত মানুষের পুনর্বাসন ও সমাজ পুনর্গঠনে আত্মনিয়োগ করেন।

রাজনৈতিক সামাজিক ভূমিকা

১৯৭৯ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে অংশ নেন। পাশাপাশি মুক্তিযোদ্ধাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন এবং ‘মুক্তিযোদ্ধা সংহতি পরিষদ’-এর সহ-সভাপতি নির্বাচিত হন।

শেষ বিদায়

১৯৮২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি মুক্তিযোদ্ধা সংহতি পরিষদের একটি সভায় অংশ নিতে ময়মনসিংহ যান। সভা শেষে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ২২ ফেব্রুয়ারি তিনি ইন্তেকাল করেন। তাঁকে তাঁর প্রিয় বিক্রমপুরের মাটিতে দাফন করা হয়।

পরিবার

তাঁর সহধর্মিণী জাহানারা চৌধুরী। সন্তানদের মধ্যে রয়েছেন আসমা জাহান চৌধুরী, সালমা জাহান চৌধুরী, আজমা জাহান চৌধুরী, প্রয়াত সাইফুল্লাহ জামাল চৌধুরী এবং কাহফিল ওয়ারা চৌধুরী।

নতুন প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণা

বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট (অব.) জামাল উদ্দিন চৌধুরীর অবদান নিঃসন্দেহে অনন্য। তিনি শুধু যুদ্ধক্ষেত্রের সাহসী সেনানায়ক নন, ছিলেন জনগণের নেতা এবং দেশগঠনের এক নিবেদিতপ্রাণ মানুষ। তাঁর জীবন, নেতৃত্ব ও আত্মত্যাগ নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।

বিক্রমপুরের এই কৃতী সন্তানের প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা।