ঢাকা ১০:১৫ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬, ১৪ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

১৮ লাখ টাকায় ইতালির স্বপ্ন, শেষ ঠিকানা হাঙ্গেরির হাসপাতাল—ফেনীর বুলবুলের করুণ মৃত্যু

নিজস্ব সংবাদ :

উন্নত ভবিষ্যতের আশায় ইতালি যাওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন ফেনীর দাগনভূঞা উপজেলার বাসিন্দা ফরিদুর রহমান বুলবুল (৩২)। দালালের আশ্বাসে ১৮ লাখ টাকা খরচ করে সরাসরি বিমানে ইতালি পৌঁছানোর কথা থাকলেও সেই স্বপ্ন ভেঙে যায় ইউরোপের দুর্গম পথে। দীর্ঘ ও ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রার একপর্যায়ে অসুস্থ হয়ে হাঙ্গেরির একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়েছে।

রোববার (২০ জুলাই) পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্যের ভিত্তিতে দাগনভূঞা থানা পুলিশ বুলবুলের পরিবারকে মৃত্যুর বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়।

ফরিদুর রহমান বুলবুল দাগনভূঞা উপজেলার জায়লস্কর ইউনিয়নের পূর্ব বারাহীগুনী এলাকার বাসিন্দা। সাত বছর আগে চাচাতো বোন কহিনুর আক্তার পলিকে বিয়ে করেন তিনি। তাদের পাঁচ বছর বয়সী একটি কন্যাসন্তান রয়েছে। আরও হৃদয়বিদারক বিষয় হলো, মৃত্যুর সময় তার স্ত্রী ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। স্বামীর মৃত্যুসংবাদে শোকের ছায়া নেমে এসেছে পুরো পরিবার ও এলাকায়।

পরিবারের সদস্যরা জানান, কয়েক বছর সৌদি আরবে একটি আবাসিক হোটেলে চাকরি করার পর দেশে ফিরে ইতালিতে যাওয়ার পরিকল্পনা করেন বুলবুল। এ সময় ফেনী শহরের বিরিঞ্চি এলাকার এক ব্যক্তির সঙ্গে তার পরিচয় হয়, যিনি ইউরোপে লোক পাঠানোর ব্যবস্থা করে দেওয়ার আশ্বাস দেন। অভিযোগ রয়েছে, ওই ব্যক্তির সঙ্গে ১৮ লাখ টাকার চুক্তি করে বিভিন্ন সময়ে নগদ অর্থ ও চেকের মাধ্যমে পুরো টাকা পরিশোধ করেন বুলবুল।

স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ১৬ জুন তিনি ইতালির উদ্দেশ্যে দেশ ছাড়েন। কিন্তু প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সরাসরি ইতালি নেওয়ার পরিবর্তে প্রথমে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই, পরে সার্বিয়া ও নর্থ মেসিডোনিয়া হয়ে স্থলপথে হাঙ্গেরিতে নেওয়া হয়। দীর্ঘ ও কষ্টকর যাত্রার সময় জঙ্গলের মধ্যে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে স্থানীয় একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হলে কয়েক দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর তার মৃত্যু হয়।

বুলবুলের ছোট ভাই কাজী নজরুল ইসলাম জানান, ২৪ জুন ভাইয়ের সঙ্গে তাদের শেষবার কথা হয়েছিল। তখন বুলবুল জানিয়েছিলেন, দালাল দেওয়া প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছেন এবং তাকে বাস ও ট্রেনে করে বিভিন্ন দেশ ঘুরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এরপর ২৬ জুন একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করলেও আর তার সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি।

নজরুল আরও জানান, ভাইয়ের খোঁজে তিনি দালালের বাড়িতেও গিয়েছিলেন। কিন্তু প্রথমে কোনো স্পষ্ট তথ্য দেওয়া হয়নি। পরে জানানো হয়, বুলবুল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। পরিবারের পক্ষ থেকে কথা বলিয়ে দেওয়ার অনুরোধ করা হলেও নানা অজুহাতে তা এড়িয়ে যাওয়া হয়। এরপর থেকে ওই ব্যক্তির সঙ্গেও আর যোগাযোগ করা যায়নি।

রোববার সকালে প্রথমে পুলিশের পক্ষ থেকে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে বুলবুলের পরিচয় সংক্রান্ত কিছু তথ্য চাওয়া হয়। পরে দাগনভূঞা থানা পুলিশের একটি দল বাড়িতে গিয়ে পরিচয় নিশ্চিত করে এবং পরিবারের সদস্যদের তার মৃত্যুর খবর জানায়।

দাগনভূঞা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. শাহীদুল ইসলাম জানিয়েছেন, বিষয়টি জানার পর প্রশাসনের পক্ষ থেকে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা হবে।

দাগনভূঞা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুহাম্মদ ফয়জুল আজীম বলেন, ফরিদুর রহমান বুলবুলের মরদেহ বর্তমানে হাঙ্গেরিতে রয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তরের নির্দেশনা অনুযায়ী তার পরিচয় ও ঠিকানা যাচাই করে পরিবারের কাছে বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।

এদিকে পরিবারের দাবি, দ্রুত যেন বুলবুলের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা হয়। একই সঙ্গে প্রতারণার মাধ্যমে বিদেশে পাঠানোর সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানিয়েছেন তারা।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

আপলোডকারীর তথ্য

১৮ লাখ টাকায় ইতালির স্বপ্ন, শেষ ঠিকানা হাঙ্গেরির হাসপাতাল—ফেনীর বুলবুলের করুণ মৃত্যু

আপডেট সময় ০৩:০১:৫৪ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬

উন্নত ভবিষ্যতের আশায় ইতালি যাওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন ফেনীর দাগনভূঞা উপজেলার বাসিন্দা ফরিদুর রহমান বুলবুল (৩২)। দালালের আশ্বাসে ১৮ লাখ টাকা খরচ করে সরাসরি বিমানে ইতালি পৌঁছানোর কথা থাকলেও সেই স্বপ্ন ভেঙে যায় ইউরোপের দুর্গম পথে। দীর্ঘ ও ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রার একপর্যায়ে অসুস্থ হয়ে হাঙ্গেরির একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়েছে।

রোববার (২০ জুলাই) পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্যের ভিত্তিতে দাগনভূঞা থানা পুলিশ বুলবুলের পরিবারকে মৃত্যুর বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়।

ফরিদুর রহমান বুলবুল দাগনভূঞা উপজেলার জায়লস্কর ইউনিয়নের পূর্ব বারাহীগুনী এলাকার বাসিন্দা। সাত বছর আগে চাচাতো বোন কহিনুর আক্তার পলিকে বিয়ে করেন তিনি। তাদের পাঁচ বছর বয়সী একটি কন্যাসন্তান রয়েছে। আরও হৃদয়বিদারক বিষয় হলো, মৃত্যুর সময় তার স্ত্রী ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। স্বামীর মৃত্যুসংবাদে শোকের ছায়া নেমে এসেছে পুরো পরিবার ও এলাকায়।

পরিবারের সদস্যরা জানান, কয়েক বছর সৌদি আরবে একটি আবাসিক হোটেলে চাকরি করার পর দেশে ফিরে ইতালিতে যাওয়ার পরিকল্পনা করেন বুলবুল। এ সময় ফেনী শহরের বিরিঞ্চি এলাকার এক ব্যক্তির সঙ্গে তার পরিচয় হয়, যিনি ইউরোপে লোক পাঠানোর ব্যবস্থা করে দেওয়ার আশ্বাস দেন। অভিযোগ রয়েছে, ওই ব্যক্তির সঙ্গে ১৮ লাখ টাকার চুক্তি করে বিভিন্ন সময়ে নগদ অর্থ ও চেকের মাধ্যমে পুরো টাকা পরিশোধ করেন বুলবুল।

স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ১৬ জুন তিনি ইতালির উদ্দেশ্যে দেশ ছাড়েন। কিন্তু প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সরাসরি ইতালি নেওয়ার পরিবর্তে প্রথমে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই, পরে সার্বিয়া ও নর্থ মেসিডোনিয়া হয়ে স্থলপথে হাঙ্গেরিতে নেওয়া হয়। দীর্ঘ ও কষ্টকর যাত্রার সময় জঙ্গলের মধ্যে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে স্থানীয় একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হলে কয়েক দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর তার মৃত্যু হয়।

বুলবুলের ছোট ভাই কাজী নজরুল ইসলাম জানান, ২৪ জুন ভাইয়ের সঙ্গে তাদের শেষবার কথা হয়েছিল। তখন বুলবুল জানিয়েছিলেন, দালাল দেওয়া প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছেন এবং তাকে বাস ও ট্রেনে করে বিভিন্ন দেশ ঘুরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এরপর ২৬ জুন একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করলেও আর তার সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি।

নজরুল আরও জানান, ভাইয়ের খোঁজে তিনি দালালের বাড়িতেও গিয়েছিলেন। কিন্তু প্রথমে কোনো স্পষ্ট তথ্য দেওয়া হয়নি। পরে জানানো হয়, বুলবুল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। পরিবারের পক্ষ থেকে কথা বলিয়ে দেওয়ার অনুরোধ করা হলেও নানা অজুহাতে তা এড়িয়ে যাওয়া হয়। এরপর থেকে ওই ব্যক্তির সঙ্গেও আর যোগাযোগ করা যায়নি।

রোববার সকালে প্রথমে পুলিশের পক্ষ থেকে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে বুলবুলের পরিচয় সংক্রান্ত কিছু তথ্য চাওয়া হয়। পরে দাগনভূঞা থানা পুলিশের একটি দল বাড়িতে গিয়ে পরিচয় নিশ্চিত করে এবং পরিবারের সদস্যদের তার মৃত্যুর খবর জানায়।

দাগনভূঞা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. শাহীদুল ইসলাম জানিয়েছেন, বিষয়টি জানার পর প্রশাসনের পক্ষ থেকে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা হবে।

দাগনভূঞা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুহাম্মদ ফয়জুল আজীম বলেন, ফরিদুর রহমান বুলবুলের মরদেহ বর্তমানে হাঙ্গেরিতে রয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তরের নির্দেশনা অনুযায়ী তার পরিচয় ও ঠিকানা যাচাই করে পরিবারের কাছে বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।

এদিকে পরিবারের দাবি, দ্রুত যেন বুলবুলের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা হয়। একই সঙ্গে প্রতারণার মাধ্যমে বিদেশে পাঠানোর সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানিয়েছেন তারা।