দেশজুড়ে আসছে ১,৪০০ ইভি বাস, গড়ে উঠবে চার্জিং নেটওয়ার্ক; মনোরেলের সম্ভাবনাও যাচাই করছে সরকার
নিজস্ব প্রতিবেদক |
দেশের গণপরিবহন ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে ব্যাপক কর্মপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার। পরিবেশবান্ধব ও আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পর্যায়ক্রমে প্রায় ১ হাজার ৪০০টি বৈদ্যুতিক (ইভি) বাস চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে দেশের ৬৪ জেলায় চার্জিং স্টেশন স্থাপন এবং যেসব রুটে মেট্রোরেল বাস্তবসম্মত নয়, সেখানে মনোরেল চালুর সম্ভাবনাও যাচাই করা হচ্ছে।
সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব ড. মোহাম্মদ জিয়াউল হক বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থাকে (বাসস) দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এসব তথ্য জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে পরিবহন খাতকে আরও পরিচ্ছন্ন, নিরাপদ ও দক্ষ করে তোলাই সরকারের লক্ষ্য। সে উদ্দেশ্যে একাধিক প্রকল্পের মাধ্যমে দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বৈদ্যুতিক বাস বহর গড়ে তোলার কাজ এগিয়ে চলছে।
যেভাবে যুক্ত হবে ১,৪০০ ইভি বাস
সরকারি পরিকল্পনা অনুযায়ী, ৫০০টি বৈদ্যুতিক বাস কেনার একটি প্রকল্প বর্তমানে অর্থায়নের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। পাশাপাশি দক্ষিণ কোরিয়ার সহায়তায় বাস্তবায়নাধীন ৩০০টি ইভি বাস প্রকল্পের পরিধি বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এছাড়া বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় ৪০০টি বৈদ্যুতিক বাস কেনার আরেকটি প্রকল্প অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
বাস সংগ্রহের গতি বাড়াতে সরকার ৪০০ কোটি টাকা করে দুটি পৃথক ক্রয় প্যাকেজ যুক্ত করেছে। এর মধ্যে নারী যাত্রীদের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে বিশেষ নারী বাস সার্ভিস চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে। প্রাথমিকভাবে এ বহরে শতাধিক বাস অন্তর্ভুক্ত করার চিন্তা করা হচ্ছে।
ডিসেম্বরেই মিলতে পারে সুফল
সরকারের আশা, চলতি বছরের ডিসেম্বর অথবা আগামী বছরের শুরুতেই নির্বাচিত কয়েকটি রুটে বৈদ্যুতিক বাস চলাচলের দৃশ্যমান প্রভাব দেখা যাবে। প্রথম ধাপে কমপক্ষে ২০০টি ইভি বাস সড়কে নামানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
৬৪ জেলায় গড়ে উঠবে চার্জিং নেটওয়ার্ক
ইভি বাস পরিচালনা সহজ করতে সারাদেশে অভিন্ন প্রযুক্তিগত মানদণ্ডে সার্বজনীন চার্জিং অবকাঠামো নির্মাণ করা হচ্ছে। এসব চার্জিং স্টেশন সরকারি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বেসরকারি পরিবহন অপারেটররাও ব্যবহার করতে পারবেন।
এ লক্ষ্যে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন (বিআরটিসি) দেশের ৬৪টি জেলায় নিজস্ব জমিতে চার্জিং স্টেশন স্থাপনের পরিকল্পনা করেছে। অতিরিক্ত সক্ষমতা থাকলে সেগুলো বাণিজ্যিক ভিত্তিতেও ব্যবহার করা যাবে।
বুয়েট-এমআইএসটির বিশেষজ্ঞদের কারিগরি মানদণ্ড
বৈদ্যুতিক বাসের জন্য অভিন্ন প্রযুক্তিগত মান নির্ধারণে বুয়েট ও এমআইএসটির বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি কারিগরি কমিটি কাজ করছে। ব্যাটারি প্রযুক্তি, চার্জিং ব্যবস্থা এবং যান্ত্রিক সহায়তার বিষয়ে একটি জাতীয় মানদণ্ড তৈরি করা হবে, যাতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের যানবাহন একই অবকাঠামো ব্যবহার করতে পারে।
ভবিষ্যতে এই মানদণ্ড বৈদ্যুতিক মিনিবাস ও ট্রাকের ক্ষেত্রেও সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
মেট্রোরেলের বিকল্প হিসেবে মনোরেল
সরকার যেসব রুটে মেট্রোরেল বাস্তবসম্মত নয়, সেখানে মনোরেল চালুর সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখছে। সম্ভাব্য রুট ও কারিগরি সক্ষমতা যাচাইয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বুয়েটকে।
একই সঙ্গে পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে আলোচনা করে বাস র্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) ব্যবস্থা নিয়েও একটি সমন্বিত পরিকল্পনা প্রস্তুত করা হচ্ছে।
বেসরকারি বিনিয়োগে প্রণোদনার চিন্তা
বৈদ্যুতিক বাসে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে কর ছাড়সহ বিভিন্ন আর্থিক প্রণোদনা দেওয়ার পরিকল্পনা করছে সরকার। তবে অনেক বাস মালিক বিআরটিসির প্রাথমিক ইভি বাস পরিচালনার অভিজ্ঞতা দেখার পর বিনিয়োগে আগ্রহী হবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এদিকে, বৈদ্যুতিক বাস পরিচালনার ব্যয় এবং যাত্রীদের জন্য ভাড়া সাশ্রয়ী রাখার মধ্যে ভারসাম্য আনতে ভর্তুকি ও ভাড়া কাঠামো নিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা চলছে।
দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য
সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বৈদ্যুতিক গণপরিবহন সম্প্রসারণের পাশাপাশি ব্যাটারিচালিত থ্রি-হুইলার নিয়ন্ত্রণ, মহাসড়ক ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন এবং পরিবহন খাতের সামগ্রিক আধুনিকায়নের কাজও চলমান থাকবে।


























