ঢাকা ০৪:২৫ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬, ১৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

নবম পে-স্কেলে নিম্ন গ্রেডে সর্বোচ্চ ১৩৫% বেতন বৃদ্ধির পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন হতে পারে ধাপে ধাপে

নিজস্ব সংবাদ :

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য প্রস্তাবিত নবম জাতীয় বেতন কাঠামোতে নিম্ন গ্রেডের কর্মীদের বেতন উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে সরকার। প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, ১১তম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীরা সর্বোচ্চ ১৩৫ শতাংশ পর্যন্ত বেতন বৃদ্ধি পেতে পারেন। অন্যদিকে ১ম থেকে ১০ম গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ক্ষেত্রে বেতন বৃদ্ধির হার সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত নির্ধারণের বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে।

এর আগে নবম জাতীয় বেতন কমিশন বিভিন্ন গ্রেডে ১০০ থেকে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বেতন বৃদ্ধির সুপারিশ করেছিল। সেই সুপারিশ পর্যালোচনা করে সরকারের আর্থিক সক্ষমতা ও বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় নতুন কাঠামো চূড়ান্ত করার কাজ চলছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের জন্য দুই ধাপের একটি পরিকল্পনা গুরুত্ব পাচ্ছে। এতে প্রথম ধাপে নতুন মূল বেতন কার্যকর করা এবং পরবর্তী ধাপে বিভিন্ন ধরনের ভাতা পুনর্বিন্যাস ও সমন্বয়ের চিন্তা করা হচ্ছে। পাশাপাশি বিকল্প হিসেবে তিন ধাপে বাস্তবায়নের একটি প্রস্তাবও আলোচনায় রয়েছে। সেই প্রস্তাব অনুযায়ী প্রথম বছরে মূল বেতনের অর্ধেক, দ্বিতীয় বছরে অবশিষ্ট অর্ধেক এবং তৃতীয় বছরে ভাতাগুলো কার্যকর হতে পারে।

মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির নেতৃত্বে পুনর্গঠিত সচিব কমিটি ইতোমধ্যে একাধিক বৈঠক করেছে। বেসামরিক প্রশাসন, বিচার বিভাগ ও সশস্ত্র বাহিনীর জন্য গঠিত পৃথক পে-কমিশনের সুপারিশ পর্যালোচনা শেষে কমিটি তাদের চূড়ান্ত মতামত অর্থ মন্ত্রণালয়ে জমা দেবে। এরপর বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের জন্য পাঠানো হবে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের পরই বাস্তবায়নের ধরন নির্ধারিত হবে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নতুন বেতন কাঠামো প্রণয়নের ক্ষেত্রে মূল্যস্ফীতির চাপ এবং সরকারের আর্থিক সামর্থ্যকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তাই ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে।

তবে কারিগরি পর্যায়ের কর্মকর্তাদের একটি অংশ মনে করছেন, মূল বেতন ধাপে ধাপে কার্যকর করলে সরকারের সমন্বিত বাজেট ও হিসাব ব্যবস্থাপনা সফটওয়্যার (আইবাস) পরিচালনায় জটিলতা দেখা দিতে পারে। তাদের মতে, একবারেই পুরো মূল বেতন কার্যকর করে পরবর্তীতে ভাতা সমন্বয় করা হলে বাস্তবায়ন সহজ হবে।

নতুন পে-স্কেলে বিভিন্ন ধরনের ভাতা পুনর্বিন্যাসের পরিকল্পনাও রয়েছে। কিছু ভাতা একীভূত করা কিংবা কমিয়ে আনার বিষয়েও আলোচনা চলছে। এ কারণে প্রয়োজনীয় প্রজ্ঞাপন, সফটওয়্যার হালনাগাদ এবং প্রশাসনিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে আরও সময় লাগতে পারে। ফলে ১ জুলাই থেকে নতুন পে-স্কেল কার্যকরের ঘোষণা থাকলেও সরকারি চাকরিজীবীদের হাতে বাড়তি বেতন পৌঁছাতে কয়েক মাস বিলম্ব হতে পারে।

এ বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বর্তমান মূল্যস্ফীতির প্রেক্ষাপটে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধি যৌক্তিক ও সময়োপযোগী। তবে তিনি মনে করেন, কেবল বেতন বাড়ালেই দুর্নীতি কমবে না। দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পাশাপাশি তাদের নির্ভরশীল পরিবারের সদস্যদের আয় ও সম্পদের বিবরণ নিয়মিত প্রকাশ বাধ্যতামূলক করার পরামর্শ দেন তিনি।

অন্যদিকে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে নতুন পে-স্কেলের আংশিক বাস্তবায়নের জন্য ৪৪ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী আগামী ১ জুলাই থেকে ধাপে ধাপে নতুন বেতন কাঠামো কার্যকরের ঘোষণা দিয়েছেন।

অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ মনে করেন, বর্তমান জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনায় বিশেষ করে নিম্ন গ্রেডের সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি প্রয়োজনীয়। এতে তাদের জীবনমান কিছুটা উন্নত হবে। তবে একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করে বলেন, অতীতে সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তাদের চিহ্নিত করে জবাবদিহির আওতায় আনাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

আপলোডকারীর তথ্য

নবম পে-স্কেলে নিম্ন গ্রেডে সর্বোচ্চ ১৩৫% বেতন বৃদ্ধির পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন হতে পারে ধাপে ধাপে

আপডেট সময় ০২:৫৬:০৮ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য প্রস্তাবিত নবম জাতীয় বেতন কাঠামোতে নিম্ন গ্রেডের কর্মীদের বেতন উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে সরকার। প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, ১১তম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীরা সর্বোচ্চ ১৩৫ শতাংশ পর্যন্ত বেতন বৃদ্ধি পেতে পারেন। অন্যদিকে ১ম থেকে ১০ম গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ক্ষেত্রে বেতন বৃদ্ধির হার সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত নির্ধারণের বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে।

এর আগে নবম জাতীয় বেতন কমিশন বিভিন্ন গ্রেডে ১০০ থেকে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বেতন বৃদ্ধির সুপারিশ করেছিল। সেই সুপারিশ পর্যালোচনা করে সরকারের আর্থিক সক্ষমতা ও বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় নতুন কাঠামো চূড়ান্ত করার কাজ চলছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের জন্য দুই ধাপের একটি পরিকল্পনা গুরুত্ব পাচ্ছে। এতে প্রথম ধাপে নতুন মূল বেতন কার্যকর করা এবং পরবর্তী ধাপে বিভিন্ন ধরনের ভাতা পুনর্বিন্যাস ও সমন্বয়ের চিন্তা করা হচ্ছে। পাশাপাশি বিকল্প হিসেবে তিন ধাপে বাস্তবায়নের একটি প্রস্তাবও আলোচনায় রয়েছে। সেই প্রস্তাব অনুযায়ী প্রথম বছরে মূল বেতনের অর্ধেক, দ্বিতীয় বছরে অবশিষ্ট অর্ধেক এবং তৃতীয় বছরে ভাতাগুলো কার্যকর হতে পারে।

মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির নেতৃত্বে পুনর্গঠিত সচিব কমিটি ইতোমধ্যে একাধিক বৈঠক করেছে। বেসামরিক প্রশাসন, বিচার বিভাগ ও সশস্ত্র বাহিনীর জন্য গঠিত পৃথক পে-কমিশনের সুপারিশ পর্যালোচনা শেষে কমিটি তাদের চূড়ান্ত মতামত অর্থ মন্ত্রণালয়ে জমা দেবে। এরপর বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের জন্য পাঠানো হবে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের পরই বাস্তবায়নের ধরন নির্ধারিত হবে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নতুন বেতন কাঠামো প্রণয়নের ক্ষেত্রে মূল্যস্ফীতির চাপ এবং সরকারের আর্থিক সামর্থ্যকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তাই ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে।

তবে কারিগরি পর্যায়ের কর্মকর্তাদের একটি অংশ মনে করছেন, মূল বেতন ধাপে ধাপে কার্যকর করলে সরকারের সমন্বিত বাজেট ও হিসাব ব্যবস্থাপনা সফটওয়্যার (আইবাস) পরিচালনায় জটিলতা দেখা দিতে পারে। তাদের মতে, একবারেই পুরো মূল বেতন কার্যকর করে পরবর্তীতে ভাতা সমন্বয় করা হলে বাস্তবায়ন সহজ হবে।

নতুন পে-স্কেলে বিভিন্ন ধরনের ভাতা পুনর্বিন্যাসের পরিকল্পনাও রয়েছে। কিছু ভাতা একীভূত করা কিংবা কমিয়ে আনার বিষয়েও আলোচনা চলছে। এ কারণে প্রয়োজনীয় প্রজ্ঞাপন, সফটওয়্যার হালনাগাদ এবং প্রশাসনিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে আরও সময় লাগতে পারে। ফলে ১ জুলাই থেকে নতুন পে-স্কেল কার্যকরের ঘোষণা থাকলেও সরকারি চাকরিজীবীদের হাতে বাড়তি বেতন পৌঁছাতে কয়েক মাস বিলম্ব হতে পারে।

এ বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বর্তমান মূল্যস্ফীতির প্রেক্ষাপটে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধি যৌক্তিক ও সময়োপযোগী। তবে তিনি মনে করেন, কেবল বেতন বাড়ালেই দুর্নীতি কমবে না। দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পাশাপাশি তাদের নির্ভরশীল পরিবারের সদস্যদের আয় ও সম্পদের বিবরণ নিয়মিত প্রকাশ বাধ্যতামূলক করার পরামর্শ দেন তিনি।

অন্যদিকে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে নতুন পে-স্কেলের আংশিক বাস্তবায়নের জন্য ৪৪ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী আগামী ১ জুলাই থেকে ধাপে ধাপে নতুন বেতন কাঠামো কার্যকরের ঘোষণা দিয়েছেন।

অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ মনে করেন, বর্তমান জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনায় বিশেষ করে নিম্ন গ্রেডের সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি প্রয়োজনীয়। এতে তাদের জীবনমান কিছুটা উন্নত হবে। তবে একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করে বলেন, অতীতে সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তাদের চিহ্নিত করে জবাবদিহির আওতায় আনাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।