ঢাকা ০৫:১৭ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬, ১৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

প্রাইমারি ইনকাম খাতে বাড়ছে ঘাটতি, বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যে নতুন চাপ

নিজস্ব সংবাদ :

দেশের বৈদেশিক খাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূচক ব্যালান্স অব পেমেন্টস (বিওপি)-এ নতুন করে চাপ তৈরি করছে প্রাইমারি ইনকাম (প্রাথমিক আয়) খাতের ক্রমবর্ধমান ঘাটতি। প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্সে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি থাকলেও বিদেশে বিভিন্ন ধরনের অর্থ পরিশোধের পরিমাণ দ্রুত বাড়ায় চলতি হিসাবের ভারসাম্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে প্রাইমারি ইনকাম খাতে নিট ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩ দশমিক ৯৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। অর্থনীতিবিদদের মতে, এ প্রবণতা অব্যাহত থাকলে রেমিট্যান্সের ইতিবাচক প্রভাবের একটি বড় অংশ এই খাতের ঘাটতিতে হারিয়ে যেতে পারে।

কোথা থেকে আসে প্রাইমারি ইনকামের আয়

অর্থনীতিতে প্রাইমারি ইনকাম বলতে মূলত তিনটি উৎস থেকে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকে বোঝানো হয়। এর মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বিদেশে বিনিয়োগ করে অর্জিত সুদ, বিদেশে স্বল্পমেয়াদি কর্মসংস্থান বা বিভিন্ন সেবা থেকে পাওয়া আয় এবং বিদেশে বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ থেকে প্রাপ্ত লভ্যাংশ।

তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমানে এই তিনটি উৎস থেকেই প্রত্যাশিত পরিমাণ আয় আসছে না। কারণ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের বড় অংশ জরুরি আমদানি ব্যয় নির্বাহের জন্য নগদ বা তরল অবস্থায় সংরক্ষণ করতে হচ্ছে। ফলে অধিক মুনাফা পাওয়া যায়—এমন দীর্ঘমেয়াদি আন্তর্জাতিক বন্ড বা ট্রেজারিতে বিনিয়োগের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, অর্থবছরের জুলাই থেকে এপ্রিল পর্যন্ত সময়ে প্রাইমারি ইনকাম খাতে মোট বৈদেশিক আয় হয়েছে মাত্র ২ দশমিক ৩০ বিলিয়ন ডলার

কেন বাড়ছে অর্থের বহিঃপ্রবাহ

একই সময়ে প্রাইমারি ইনকাম খাতে দেশের বাইরে অর্থ পরিশোধ বা ডেবিটের পরিমাণ বেড়ে হয়েছে প্রায় ৬ দশমিক ২৪ বিলিয়ন ডলার, যা ক্রেডিটের প্রায় তিন গুণ।

এর মধ্যে সবচেয়ে বড় ব্যয় হয়েছে সরকারের বৈদেশিক ঋণের সুদ পরিশোধে। আলোচ্য সময়ে এ খাতে প্রায় ১ দশমিক ৯৪ বিলিয়ন ডলার পরিশোধ করা হয়েছে। ব্যাংক খাতের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অতীতে নেওয়া স্বল্পমেয়াদি ও বাণিজ্যিক ঋণের গ্রেস পিরিয়ড শেষ হওয়ায় এখন সুদ পরিশোধের চাপ দ্রুত বাড়ছে।

শুধু সরকারি ঋণই নয়, বেসরকারি খাতের বিদেশি ঋণের সুদ, দেশে কর্মরত বিদেশি বিশেষজ্ঞ ও কর্মকর্তাদের বেতন-ভাতা, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশ এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন সেবা বাবদ অর্থও নিয়মিত বিদেশে যাচ্ছে।

বিদেশি কর্মী ও বিনিয়োগকারীদের অর্থপ্রবাহও প্রভাব ফেলছে

বিশেষজ্ঞদের মতে, তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল, অবকাঠামো প্রকল্প এবং বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে কর্মরত বিদেশি বিশেষজ্ঞদের বেতনও এই খাতের ডেবিট বাড়াচ্ছে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, স্বল্পমেয়াদি চুক্তিতে কর্মরত বিদেশিদের পুরো পারিশ্রমিক প্রাইমারি ইনকাম খাতেই গণনা করা হয়। আর দীর্ঘমেয়াদি কর্মীদের ক্ষেত্রেও দেশে অর্জিত আয়ের যে অংশ তাঁরা বৈধ পথে নিজ দেশে পাঠান, সেটিও বৈদেশিক অর্থপ্রবাহের ওপর চাপ সৃষ্টি করে।

অন্যদিকে দেশের শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারী বিদেশিরা লভ্যাংশ বা শেয়ার বিক্রির মুনাফা নিজ দেশে নিয়ে গেলে সেটিও একই খাতের ব্যয় হিসেবে যুক্ত হয়। পাশাপাশি বাংলাদেশে কার্যরত বিদেশি ব্যাংক ও বীমা কোম্পানিগুলো তাদের নিট মুনাফা মূল প্রতিষ্ঠানে পাঠানোর কারণে বৈদেশিক মুদ্রার বহিঃপ্রবাহ আরও বাড়ছে।

দীর্ঘমেয়াদি ঋণের ওপর জোর দেওয়ার পরামর্শ

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সরকারি প্রকল্পের ঋণের সুদের পাশাপাশি বেসরকারি খাতের বৈদেশিক ঋণ এবং বিদেশি কর্মীদের পারিশ্রমিক—সব মিলিয়ে প্রাইমারি ইনকাম খাতে অর্থের বহিঃপ্রবাহ ক্রমাগত বাড়ছে। তাঁর মতে, প্রবাসী আয় শক্ত অবস্থানে না থাকলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও চলতি হিসাবের ভারসাম্য আরও বড় চাপে পড়তে পারত।

অর্থনীতিবিদদের পরামর্শ, ভবিষ্যতে উচ্চ সুদের বাণিজ্যিক ঋণের পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি ও সহজ শর্তের বৈদেশিক অর্থায়নের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের নতুন উৎস বাড়ানো এবং বিদেশি ঋণের ব্যয় ব্যবস্থাপনায় আরও সতর্ক নীতি গ্রহণ করা প্রয়োজন। অন্যথায় রেমিট্যান্সে অর্জিত ইতিবাচক অগ্রগতিও প্রাইমারি ইনকাম খাতের বাড়তে থাকা ঘাটতি সামাল দিতে যথেষ্ট নাও হতে পারে।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

আপলোডকারীর তথ্য

প্রাইমারি ইনকাম খাতে বাড়ছে ঘাটতি, বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যে নতুন চাপ

আপডেট সময় ০২:৩৮:৫১ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬

দেশের বৈদেশিক খাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূচক ব্যালান্স অব পেমেন্টস (বিওপি)-এ নতুন করে চাপ তৈরি করছে প্রাইমারি ইনকাম (প্রাথমিক আয়) খাতের ক্রমবর্ধমান ঘাটতি। প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্সে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি থাকলেও বিদেশে বিভিন্ন ধরনের অর্থ পরিশোধের পরিমাণ দ্রুত বাড়ায় চলতি হিসাবের ভারসাম্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে প্রাইমারি ইনকাম খাতে নিট ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩ দশমিক ৯৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। অর্থনীতিবিদদের মতে, এ প্রবণতা অব্যাহত থাকলে রেমিট্যান্সের ইতিবাচক প্রভাবের একটি বড় অংশ এই খাতের ঘাটতিতে হারিয়ে যেতে পারে।

কোথা থেকে আসে প্রাইমারি ইনকামের আয়

অর্থনীতিতে প্রাইমারি ইনকাম বলতে মূলত তিনটি উৎস থেকে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকে বোঝানো হয়। এর মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বিদেশে বিনিয়োগ করে অর্জিত সুদ, বিদেশে স্বল্পমেয়াদি কর্মসংস্থান বা বিভিন্ন সেবা থেকে পাওয়া আয় এবং বিদেশে বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ থেকে প্রাপ্ত লভ্যাংশ।

তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমানে এই তিনটি উৎস থেকেই প্রত্যাশিত পরিমাণ আয় আসছে না। কারণ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের বড় অংশ জরুরি আমদানি ব্যয় নির্বাহের জন্য নগদ বা তরল অবস্থায় সংরক্ষণ করতে হচ্ছে। ফলে অধিক মুনাফা পাওয়া যায়—এমন দীর্ঘমেয়াদি আন্তর্জাতিক বন্ড বা ট্রেজারিতে বিনিয়োগের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, অর্থবছরের জুলাই থেকে এপ্রিল পর্যন্ত সময়ে প্রাইমারি ইনকাম খাতে মোট বৈদেশিক আয় হয়েছে মাত্র ২ দশমিক ৩০ বিলিয়ন ডলার

কেন বাড়ছে অর্থের বহিঃপ্রবাহ

একই সময়ে প্রাইমারি ইনকাম খাতে দেশের বাইরে অর্থ পরিশোধ বা ডেবিটের পরিমাণ বেড়ে হয়েছে প্রায় ৬ দশমিক ২৪ বিলিয়ন ডলার, যা ক্রেডিটের প্রায় তিন গুণ।

এর মধ্যে সবচেয়ে বড় ব্যয় হয়েছে সরকারের বৈদেশিক ঋণের সুদ পরিশোধে। আলোচ্য সময়ে এ খাতে প্রায় ১ দশমিক ৯৪ বিলিয়ন ডলার পরিশোধ করা হয়েছে। ব্যাংক খাতের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অতীতে নেওয়া স্বল্পমেয়াদি ও বাণিজ্যিক ঋণের গ্রেস পিরিয়ড শেষ হওয়ায় এখন সুদ পরিশোধের চাপ দ্রুত বাড়ছে।

শুধু সরকারি ঋণই নয়, বেসরকারি খাতের বিদেশি ঋণের সুদ, দেশে কর্মরত বিদেশি বিশেষজ্ঞ ও কর্মকর্তাদের বেতন-ভাতা, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশ এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন সেবা বাবদ অর্থও নিয়মিত বিদেশে যাচ্ছে।

বিদেশি কর্মী ও বিনিয়োগকারীদের অর্থপ্রবাহও প্রভাব ফেলছে

বিশেষজ্ঞদের মতে, তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল, অবকাঠামো প্রকল্প এবং বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে কর্মরত বিদেশি বিশেষজ্ঞদের বেতনও এই খাতের ডেবিট বাড়াচ্ছে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, স্বল্পমেয়াদি চুক্তিতে কর্মরত বিদেশিদের পুরো পারিশ্রমিক প্রাইমারি ইনকাম খাতেই গণনা করা হয়। আর দীর্ঘমেয়াদি কর্মীদের ক্ষেত্রেও দেশে অর্জিত আয়ের যে অংশ তাঁরা বৈধ পথে নিজ দেশে পাঠান, সেটিও বৈদেশিক অর্থপ্রবাহের ওপর চাপ সৃষ্টি করে।

অন্যদিকে দেশের শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারী বিদেশিরা লভ্যাংশ বা শেয়ার বিক্রির মুনাফা নিজ দেশে নিয়ে গেলে সেটিও একই খাতের ব্যয় হিসেবে যুক্ত হয়। পাশাপাশি বাংলাদেশে কার্যরত বিদেশি ব্যাংক ও বীমা কোম্পানিগুলো তাদের নিট মুনাফা মূল প্রতিষ্ঠানে পাঠানোর কারণে বৈদেশিক মুদ্রার বহিঃপ্রবাহ আরও বাড়ছে।

দীর্ঘমেয়াদি ঋণের ওপর জোর দেওয়ার পরামর্শ

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সরকারি প্রকল্পের ঋণের সুদের পাশাপাশি বেসরকারি খাতের বৈদেশিক ঋণ এবং বিদেশি কর্মীদের পারিশ্রমিক—সব মিলিয়ে প্রাইমারি ইনকাম খাতে অর্থের বহিঃপ্রবাহ ক্রমাগত বাড়ছে। তাঁর মতে, প্রবাসী আয় শক্ত অবস্থানে না থাকলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও চলতি হিসাবের ভারসাম্য আরও বড় চাপে পড়তে পারত।

অর্থনীতিবিদদের পরামর্শ, ভবিষ্যতে উচ্চ সুদের বাণিজ্যিক ঋণের পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি ও সহজ শর্তের বৈদেশিক অর্থায়নের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের নতুন উৎস বাড়ানো এবং বিদেশি ঋণের ব্যয় ব্যবস্থাপনায় আরও সতর্ক নীতি গ্রহণ করা প্রয়োজন। অন্যথায় রেমিট্যান্সে অর্জিত ইতিবাচক অগ্রগতিও প্রাইমারি ইনকাম খাতের বাড়তে থাকা ঘাটতি সামাল দিতে যথেষ্ট নাও হতে পারে।