সোশ্যাল মিডিয়ার লাগামহীন অপব্যবহার: জবাবদিহিতার বাইরে থাকায় বাড়ছে সাইবার ঝুঁকি
বাংলাদেশে মতপ্রকাশের অন্যতম বড় মাধ্যম এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। একই সঙ্গে এটি জনমত গঠন, তথ্য আদান-প্রদান এবং যোগাযোগের শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম হলেও নিয়ন্ত্রণহীন ব্যবহারের কারণে উদ্বেগও বাড়ছে। ভুয়া তথ্য, গুজব, চরিত্রহনন, ব্ল্যাকমেইল, কুরুচিপূর্ণ প্রচারণা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি বিভ্রান্তিকর কনটেন্টের বিস্তার সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম ও সমন্বিত ভুয়া অ্যাকাউন্ট বা বট নেটওয়ার্কের মাধ্যমে জনমত প্রভাবিত করার প্রবণতা বাড়ছে। এতে ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান এমনকি রাষ্ট্রীয় স্বার্থও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। মুহূর্তের মধ্যে গুজব ছড়িয়ে পড়ে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করার ঘটনাও এখন নিয়মিত।
বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১০ কোটির বেশি। এর মধ্যে কয়েক কোটি মানুষ নিয়মিত ফেসবুক ও ইউটিউব ব্যবহার করেন। বিপুল সংখ্যক ব্যবহারকারীর কারণে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ বাজারে পরিণত হয়েছে। তবে এত বড় বাজার হওয়া সত্ত্বেও এসব প্রতিষ্ঠানের দেশে কোনো স্থানীয় কার্যালয় না থাকায় অভিযোগ নিষ্পত্তি বা আইনগত জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
বর্তমানে কোনো আপত্তিকর বা ক্ষতিকর কনটেন্ট অপসারণের প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে প্ল্যাটফর্মগুলোর কাছে অনুরোধ পাঠাতে হয়। কিন্তু সব ক্ষেত্রে দ্রুত সাড়া পাওয়া যায় না। অনেক সময় কনটেন্ট সরানোর আগেই সেটি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে এবং ক্ষতি হয়ে যায়।
এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার সাইবার নিরাপত্তা–সংক্রান্ত আইনে পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, গুজব, মানহানিকর কনটেন্ট, এআই-নির্ভর ভুয়া ছবি, ভিডিও ও অডিও ছড়ানো ঠেকাতে আরও কার্যকর আইনি ব্যবস্থা প্রয়োজন। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ক্ষতিকর কনটেন্ট অপসারণে বাধ্য করার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে।
তবে প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু আইন কঠোর করলেই সমস্যার পূর্ণ সমাধান হবে না। কারণ বাংলাদেশের বাইরে থেকে পরিচালিত অ্যাকাউন্ট বা নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে স্থানীয় আইন প্রয়োগ করা অনেক ক্ষেত্রে সম্ভব হয় না। তাই মেটা, গুগলসহ বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর বাংলাদেশে স্থানীয় অফিস বা আইনগত প্রতিনিধিত্ব থাকা জরুরি বলে তারা মনে করেন।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে কঠোর নীতি গ্রহণ করেছে। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ক্ষতিকর কনটেন্ট অপসারণে ব্যর্থ হলে বড় অঙ্কের জরিমানার বিধান রয়েছে। ভারতেও তথ্যপ্রযুক্তি আইন ও ডিজিটাল মিডিয়া নীতিমালার মাধ্যমে প্ল্যাটফর্মগুলোর ওপর নির্দিষ্ট দায়িত্ব আরোপ করা হয়েছে। একইভাবে অস্ট্রেলিয়া, ফ্রান্সসহ আরও কয়েকটি দেশ ভুয়া তথ্য, ঘৃণামূলক বক্তব্য ও অনলাইন হয়রানি ঠেকাতে কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পরিচালনাকারী আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্থানীয় উপস্থিতি নিশ্চিত করা গেলে অভিযোগ নিষ্পত্তি, আইনের প্রয়োগ এবং ক্ষতিকর কনটেন্ট দ্রুত অপসারণের সুযোগ বাড়বে। একই সঙ্গে ব্যবহারকারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সাইবার অপরাধ নিয়ন্ত্রণেও তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন আধুনিক জীবনের অপরিহার্য অংশ। তবে এর সুফল ধরে রাখতে হলে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, সরকার এবং ব্যবহারকারী—সবার সমন্বিত দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রয়োজন। জবাবদিহিতা, কার্যকর আইন প্রয়োগ এবং সচেতন ব্যবহারই পারে নিরাপদ ডিজিটাল পরিবেশ গড়ে তুলতে।






















