শ্রীনগর ভাগ্যকুলে পচা পানির দুর্গন্ধে অতিষ্ঠ জনজীবন, পানি নিষ্কাশনে দ্রুত ব্যবস্থা চায় এলাকাবাসী
নিজস্ব প্রতিবেদকঃ
মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগর উপজেলার ভাগ্যকুল ইউনিয়নের বালাসুর চৌরাস্তার নিকটবর্তী পূর্ব কামারগাও এলাকায় দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য নিত্যদিনের দুর্ভোগে পরিণত হয়েছে। সামান্য বৃষ্টিতেই এলাকার প্রায় তিন হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়ছেন। বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা পচা ও দূষিত পানির দুর্গন্ধে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে জনজীবন। পরিবেশ দূষণের পাশাপাশি বিভিন্ন রোগবালাই ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, ঢাকা-দোহার শাখা সড়কের বালাসুর দক্ষিণ অংশে জলাবদ্ধতার পানি প্রায়ই সড়কের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। সড়কের পাশে ও আশপাশের বসতবাড়িতে জমে থাকা পচা পানি থেকে তীব্র দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। অনেক পথচারীকে নাকে কাপড় চেপে চলাচল করতে দেখা যায়। স্থানীয়দের ভাষ্য, বৃষ্টি হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। তখন অনেক বাড়ির আঙিনা ও চলাচলের পথ পানির নিচে তলিয়ে যায়।
স্থানীয় বাসিন্দা ইউসুফ শেখ (৬৫) কালের কন্ঠ কে বলেন, আমি ২২ বছর ধরে এখানে বসবাস করছি। আগে এই এলাকায় ছয়টি কালভার্ট ছিল, যার মাধ্যমে পানি সহজে চলাচল করত। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন স্থানে মাটি ভরাট করে নতুন ভবন ও মার্কেট নির্মাণ করায় সেই কালভার্টগুলো প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে পানি বের হওয়ার পথ না থাকায় সামান্য বৃষ্টিতেই আমরা পানিবন্দী হয়ে পড়ি। গত ১০ বছর ধরে চেয়ারম্যান-মেম্বারসহ বিভিন্ন জনপ্রতিনিধিকে বিষয়টি জানিয়েছি। নির্বাচন এলে সবাই আশ্বাস দেন, কিন্তু পরে আর কোনো খোঁজ রাখেন না।

আরেক বাসিন্দা মোঃ সিয়াম শেখ কালের কন্ঠের প্রতিনিধি কে বলেন, জমে থাকা পানিতে মশা, পোকামাকড় ও সাপের উপদ্রব অনেক বেড়েছে। রাত হলেই ভয় লাগে। শিশু ও বৃদ্ধদের নিয়ে আমরা সবসময় আতঙ্কে থাকি।
ফাতেমা বেগম বলেন, নিজেদের ঘরবাড়ি থাকার পরও অনেক সময় অন্যত্র বাসা ভাড়া করে থাকতে হয়। পানি আর দুর্গন্ধের কারণে স্বাভাবিকভাবে জীবনযাপন করা যায় না। আমরা সরকারের কাছে একটি স্থায়ী ড্রেনেজ ব্যবস্থার দাবি জানাই।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে জলাবদ্ধতার কারণে এলাকায় জনস্বাস্থ্য সংকট তৈরি হয়েছে। শিশুদের চর্মরোগ, জ্বরসহ বিভিন্ন রোগের প্রকোপ বাড়ছে। একই সঙ্গে দুর্গন্ধ ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বসবাস করাও কষ্টকর হয়ে উঠেছে।
নিউ অক্সফোর্ড স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা রফিকুল ইসলাম কালের কন্ঠ কে বলেন, স্কুলগামী শিক্ষার্থীদের অনেক সময় পানি ভেঙে বিদ্যালয়ে যেতে হয়। দীর্ঘদিন নোংরা পানির সংস্পর্শে থাকার কারণে তাদের মধ্যে চর্মরোগসহ নানা স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দিচ্ছে। শিক্ষার পরিবেশও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

ভাগ্যকুল ইউনিয়ন পরিষদের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য শাহ আলম সারেং বলেন, বিষয়টি নিয়ে বহুবার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে। সাবেক সংসদ সদস্য মাহি বদরুদ্দোজা চৌধুরী ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাও কয়েক বছর আগে এলাকা পরিদর্শন করেছিলেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। ফলে অসহায় মানুষগুলো বছরের পর বছর দুর্ভোগ পোহাচ্ছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও আলম মার্কেটের স্বত্বঅধিকারী সামসু আলম বলেন, সমস্যা সমাধানে সরকারি কোনো প্রকল্প বা অনুদান এলে আমরা মালিকপক্ষ থেকেও সহযোগিতা করতে প্রস্তুত আছি। এলাকার স্বার্থে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।
স্থানীয়দের দাবি, অবৈধভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়া পানি চলাচলের পথ ও ১৪ ইঞ্চি পাইপলাইন পুনরুদ্ধার করা এখন সম্ভব না তাই একটি আধুনিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা নির্মাণ করা হলে জলাবদ্ধতার সমস্যা অনেকাংশে সমাধান হবে। অন্যথায় বর্ষা মৌসুমে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে।
দীর্ঘদিনের জনদুর্ভোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও শ্রীনগর সড়ক ও জনপথ বিভাগের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের কাছ থেকে কোনো সুস্পষ্ট বক্তব্য পাওয়া যায়নি। অফিসের করণিক শফিউল্লাহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার অনুপস্থিতির কথা জানান। পরে উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী এম.এম. হানিফের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি সভায় থাকার অজুহাত দেখিয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। বিষয়টি তারা এরিয়ে যাওয়া চেষ্টা করছে।
শ্রীনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হাছিবুর রহমান কালের কন্ঠ কে বলেন, সমস্যাটি সম্পর্কে জেনেছি। উপজেলা প্রকৌশলীসহ সংশ্লিষ্টদের নিয়ে দ্রুত সরেজমিন পরিদর্শন করা হবে। বিষয়টি যে দপ্তরের এক্তিয়ারভুক্ত, তাদের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি দ্রুত সমাধানের জন্য জেলা উন্নয়ন সমন্বয় সভায় বিষয়টি উত্থাপন করা হবে এবং নিয়মিত ফলোআপ করা হবে।


























