বর্ষা এলেই জমে ওঠে মুন্সিগঞ্জে টেটা-বল্লম শিল্প, ব্যস্ত সময় পার করছেন কারিগররা
অধীর রাজবংশী,স্টাফ রিপোর্ট
বর্ষা মৌসুমের আগমনী বার্তা মিলতেই মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগর উপজেলার দেলভোগ এলাকায় বেড়ে গেছে ঐতিহ্যবাহী টেটা ও বল্লম তৈরির ব্যস্ততা। বছরের অন্য সময় তুলনামূলক নিরিবিলি থাকলেও বর্ষা ঘনিয়ে এলে কর্মচাঞ্চল্যে মুখর হয়ে ওঠে এলাকার কারখানাগুলো। মাছ শিকারের প্রধান মৌসুমকে সামনে রেখে স্থানীয় কারিগররা এখন সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত কাজ করে চলেছেন। খাল-বিল, নদ-নদী ও জলাশয়ে মাছ ধরার জন্য ব্যবহৃত এসব সরঞ্জামের চাহিদা বাড়ায় নতুন প্রাণ ফিরে পেয়েছে দেলভোগের পুরোনো এই কুটিরশিল্প।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, দেলভোগ এলাকায় ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় সাতটি টেটা ও বল্লম তৈরির কারখানা রয়েছে। বর্ষা মৌসুম শুরুর কয়েক সপ্তাহ আগে থেকেই বিভিন্ন এলাকার ক্রেতা ও পাইকারদের অর্ডার আসতে শুরু করে। ফলে প্রতিটি কারখানায় এখন কর্মব্যস্ততা তুঙ্গে। লোহা কাটা, আগুনে পুড়িয়ে ধারালো করা, হাতুড়ি দিয়ে আকার দেওয়া এবং পরে বাঁশের হাতল সংযোজন, সব মিলিয়ে প্রতিটি টেটা বা বল্লম তৈরি করতে কয়েকটি ধাপ অতিক্রম করতে হয়।

সরেজমিনে দেখা যায়, কারখানার ভেতরে জ্বলছে আগুনের ভাঁটি। উত্তপ্ত লোহা হাতুড়ির আঘাতে ধীরে ধীরে রূপ নিচ্ছে টেটা ও বল্লমে। অভিজ্ঞ কারিগরদের দক্ষ হাতে তৈরি হচ্ছে বিভিন্ন আকার ও নকশার সরঞ্জাম। কেউ লোহা গরম করছেন, কেউ ধার দিচ্ছেন, আবার কেউ বাঁশের হাতল প্রস্তুত করছেন। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা ও দক্ষতার কারণে স্থানীয়ভাবে তৈরি এসব টেটা ও বল্লমের সুনাম ছড়িয়ে পড়েছে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে।
কারিগর মোঃ সালাম মিয়া বলেন, বর্ষা মৌসুমে আমাদের সবচেয়ে বেশি কাজ থাকে। পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মাছ শিকারও বেড়ে যায়। তখন টেটা-বল্লমের চাহিদা কয়েকগুণ বৃদ্ধি পায়। অনেক সময় এত বেশি অর্ডার আসে যে সময়মতো সরবরাহ করতে হিমশিম খেতে হয়।
দেলভোগ এলাকার আরেক কারখানা মালিক মোহাম্মদ ইদ্রিস আলী বলেন, আমরা স্থানীয় বিভিন্ন হাটে নিজেরা বিক্রি করি। পাশাপাশি ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে পাইকাররা এসে মাল নিয়ে যান। বিক্রমপুরের টেটা ও বল্লম টেকসই ও ধারালো হওয়ায় এর আলাদা কদর রয়েছে। অনেক ক্রেতা নির্দিষ্টভাবে এখানকার তৈরি সরঞ্জামই খোঁজেন।
স্থানীয় কারিগরদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, একটি ছোট আকারের টেটা ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকায় বিক্রি হয়। অন্যদিকে বড় আকারের ও বিশেষভাবে তৈরি বল্লমের দাম ২ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে। লোহার মান, আকার, ওজন এবং কারিগরি কাজের ওপর ভিত্তি করে দাম নির্ধারণ করা হয়। বর্ষা মৌসুমে বিক্রি কয়েকগুণ বেড়ে যাওয়ায় এ সময়টিকে ঘিরেই তাদের বছরের বড় অংশের আয় আসে।
এলাকার বাসিন্দারা জানান, একসময় দেলভোগে আরও বেশি পরিবার এই পেশার সঙ্গে জড়িত ছিল। আধুনিক মাছ ধরার বিভিন্ন সরঞ্জামের ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়ায় কিছু পরিবার অন্য পেশায় চলে গেলেও বর্ষা মৌসুম এলে আবারও প্রাণ ফিরে পায় এই শিল্প। এখনো অনেক পরিবার টেটা ও বল্লম তৈরি ও বিক্রির ওপর নির্ভর করে জীবিকা নির্বাহ করছে।

স্থানীয়দের মতে, টেটা ও বল্লম কেবল মাছ শিকারের সরঞ্জাম নয়, এটি বিক্রমপুর অঞ্চলের শতবর্ষী ঐতিহ্যের অংশ। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা এই পেশা স্থানীয় সংস্কৃতি ও গ্রামীণ জীবনযাত্রার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। তাই আধুনিকতার ভিড়ে হারিয়ে যেতে বসা এ ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখতে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা এবং সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
বর্ষা মৌসুমকে ঘিরে দেলভোগের টেটা-বল্লম শিল্পে যে কর্মচাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে, তা শুধু স্থানীয় অর্থনীতিতেই গতি আনছে না, একই সঙ্গে বিক্রমপুরের ঐতিহ্যবাহী একটি শিল্পকেও নতুন করে বাঁচিয়ে রাখছে। ফলে বর্ষার পানির সঙ্গে সঙ্গে আশার জোয়ার বইছে এ অঞ্চলের কারিগর পরিবারগুলোর।


























