পাহাড় ছাড়তে নারাজ হাজারো মানুষ, মৃত্যুঝুঁকির মাঝেও চট্টগ্রামে অব্যাহত বসবাস
টানা ভারী বর্ষণে আবারও পাহাড়ধসের শঙ্কায় রয়েছে চট্টগ্রাম। প্রশাসনের পক্ষ থেকে বারবার সতর্কবার্তা, মাইকিং এবং আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুতের ব্যবস্থা করা হলেও ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি বসতি ছাড়তে রাজি হচ্ছেন না অনেক বাসিন্দা। মৃত্যুর আশঙ্কা সম্পর্কে সচেতন থাকলেও জীবিকার তাগিদ ও মাথা গোঁজার বিকল্প জায়গা না থাকায় তারা পরিবার-পরিজন নিয়ে আগের মতোই বসবাস করছেন।
জেলা প্রশাসন জানায়, সোমবার থেকেই ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে প্রচারণা চালানো হচ্ছে এবং নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। ইতোমধ্যে নগরীর চারটি আশ্রয়কেন্দ্রে ২৭০ জন নারী, পুরুষ ও শিশু আশ্রয় নিয়েছেন। সেখানে তাদের জন্য খাবারসহ প্রয়োজনীয় সহায়তার ব্যবস্থাও করা হয়েছে।
তবে বাস্তবতা হলো, পাহাড়ি বসতি উচ্ছেদ করা হলেও তা স্থায়ী হয় না। দিনের বেলায় উচ্ছেদ অভিযান চালানোর পর অনেক ক্ষেত্রে রাতেই আবার নতুন করে ঘর তুলে বসবাস শুরু করেন ভূমিহীন মানুষরা। বছরের পর বছর ধরে এভাবেই চলছে উচ্ছেদ ও পুনর্বাসনের অভাবে এক ধরনের লুকোচুরি।
প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মতে, শুধুমাত্র উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে এ সংকটের সমাধান সম্ভব নয়। নদীভাঙন, দারিদ্র্য ও ভূমিহীনতার কারণে প্রতি বছর নতুন নতুন মানুষ শহরের পাহাড়ি এলাকায় আশ্রয় নিচ্ছেন। তাদের জন্য স্থায়ী পুনর্বাসন এবং সরকারি খাস জমি বরাদ্দের উদ্যোগ না নিলে অবৈধ পাহাড়ি বসতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে।
এদিকে অভিযোগ রয়েছে, কিছু প্রভাবশালী ভূমিদস্যু ভূমিহীন মানুষদের ব্যবহার করে সরকারি পাহাড় দখল করে রেখেছে। ফলে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসতি গড়ে ওঠা বন্ধ করা আরও কঠিন হয়ে পড়ছে।
চট্টগ্রামের পাহাড়ধসের ইতিহাসও অত্যন্ত ভয়াবহ। ২০০৭ সালের ১১ জুন ভয়াবহ পাহাড়ধসে ১২৭ জন প্রাণ হারান। এরপরও বিভিন্ন সময়ে একাধিক দুর্ঘটনায় নারী, পুরুষ ও শিশুসহ বহু মানুষের মৃত্যু হয়েছে। সেই অভিজ্ঞতা থেকে পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠন এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় পানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার উদ্যোগ নেওয়া হলেও পুরোপুরি সফলতা আসেনি।
জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম মহানগরীর ১৭টি পাহাড়ের মধ্যে ১০টি ব্যক্তিমালিকানাধীন এবং ৭টি সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। আগে ৮৩৫টি ঝুঁকিপূর্ণ বসতি চিহ্নিত করা হলেও বাস্তবে এই সংখ্যা আরও অনেক বেশি বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বর্তমানে লালখান বাজার, খুলশী, পাহাড়তলী, আকবর শাহ, বায়েজিদ এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন পাহাড়ি এলাকাগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। বর্ষা এলেই এসব এলাকায় পাহাড়ধসের আশঙ্কা বেড়ে যায়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রাণহানি এড়াতে শুধু সাময়িক সতর্কতা নয়, ভূমিহীন মানুষের জন্য টেকসই পুনর্বাসন এবং পাহাড় দখল রোধে কঠোর পদক্ষেপই হতে পারে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান।


























