ঢাকা ১১:০৯ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

এশার পরও ছিল মসজিদ, ফজরে গিয়ে মিলল না চিহ্ন—পদ্মার ভাঙনে বিলীন ইমাম আবু হানিফা জামে মসজিদ

নিজস্ব সংবাদ :

মুন্সীগঞ্জের পদ্মায় ভয়াবহ নদীভাঙন দেখা দিয়েছে। প্রবল স্রোতের তোড়ে একের পর এক বসতবাড়ি, স্থাপনা ও গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান নদীগর্ভে চলে যাচ্ছে। এরই মধ্যে সদর উপজেলার রাকিরকান্দি এলাকায় রাতের ব্যবধানে পদ্মায় বিলীন হয়েছে মাদানী কমপ্লেক্স মাদ্রাসার ইমাম আবু হানিফা জামে মসজিদ।

রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) বিকেলে সদর উপজেলার দেওয়ানকান্দি, রাকিরকান্দি ও পূর্বরাখী এলাকা ঘুরে দেখা যায়, পদ্মার তীরে ব্যাপক ভাঙন চলছে। নদীর তীব্র স্রোতে ভেঙে পড়ছে অস্থায়ী প্রতিরক্ষা বাঁধের বিভিন্ন অংশ। ভাঙন ঠেকাতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষ থেকে বালুর বস্তা ফেলে জরুরি প্রতিরোধ ব্যবস্থা নেওয়া হলেও স্রোতের তীব্রতায় তা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।

স্থানীয়দের সবচেয়ে বেশি নাড়া দিয়েছে মসজিদটি নদীগর্ভে চলে যাওয়ার ঘটনা। মুসল্লিরা রাতে এশার নামাজ আদায় করে বাড়ি ফিরেছিলেন। কয়েক ঘণ্টা পর ফজরের নামাজ পড়তে এসে দেখেন, যে স্থানে মসজিদটি ছিল সেখানে এখন শুধু পদ্মার পানি।

মাদ্রাসার শিক্ষার্থী সোহেল জানান, শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) রাতে এশার নামাজ শেষে তারা মাদ্রাসায় ঘুমিয়ে পড়েন। ভোরে ফজরের নামাজের জন্য বের হয়ে দেখেন, মসজিদটি নদীতে ভেঙে পড়েছে। বর্তমানে মাদ্রাসার মাঠেই নামাজ আদায় করতে হচ্ছে তাদের।

স্থানীয় সাবেক ইউপি সদস্য মিজানুর রহমান দুদুর দাবি, কয়েক বছর আগেও ওই এলাকায় নদীর গতিপথ তুলনামূলক ছোট ছিল। ড্রেজার দিয়ে মাটি কাটার কারণে নদীর গভীরতা ও প্রশস্ততা বেড়েছে বলে তিনি মনে করেন। এতে ভাঙনের মাত্রাও বাড়ছে। তার ভাষ্য, মাদ্রাসা ও খানকার বড় একটি অংশ ইতোমধ্যে নদীগর্ভে চলে গেছে।

স্থানীয় বাসিন্দা মো. হোসেন লিটন খান বলেন, দীর্ঘদিন ধরে পদ্মার ভাঙনে তারা আতঙ্কের মধ্যে রয়েছেন। মাদানী কমপ্লেক্সের মসজিদের পাশাপাশি মাহফিলের মাঠও নদীতে বিলীন হয়েছে। এলাকার মানুষের দাবি, গুরুত্বপূর্ণ এই প্রতিষ্ঠান ও আশপাশের জনবসতি রক্ষায় দ্রুত স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করা হোক।

আরেক বাসিন্দা জামাল বলেন, কয়েক বছর ধরে ধীরে ধীরে নদী বড় হচ্ছে এবং আশপাশের বাড়িঘর ভেঙে যাচ্ছে। ভাঙনের কারণে অনেক পরিবার এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছে। এবার মাদ্রাসার মসজিদও রক্ষা পেল না।

মাদানী কমপ্লেক্স মাদ্রাসার সহকারী শিক্ষক মো. খালেক সাইফুল জানান, প্রায় পাঁচ বছর ধরে তাদের এলাকায় নিয়মিত নদীভাঙন হচ্ছে। ইতোমধ্যে মাদ্রাসার প্রায় ১০০ শতাংশ জমি নদীতে চলে গেছে। দীর্ঘদিন ধরে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের কথা শোনা গেলেও কার্যকর উদ্যোগের অপেক্ষায় রয়েছেন তারা।

এদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, মুন্সীগঞ্জের নদীগুলোতে পানির উচ্চতা বাড়ছে এবং স্রোতের গতিও বেড়েছে। তবে এখনো নদীর পানি বিপৎসীমার নিচে রয়েছে।

সদর ও টঙ্গিবাড়ী উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ঘুরেও নদীতে প্রবল স্রোত দেখা গেছে। স্রোতের কারণে ছোট নৌযান চলাচলেও সমস্যা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। টঙ্গিবাড়ী উপজেলার বানারী এলাকাতেও একইভাবে ভাঙন চলছে। সেখানে ঐতিহ্যবাহী মিয়া বাড়িও ভাঙনের হুমকিতে পড়েছে।

ভাঙন পরিস্থিতি দেখতে রোববার বিকেলে দেওয়ানকান্দি এলাকা পরিদর্শন করেন মুন্সীগঞ্জ-৩ আসনের এমপি কামরুজ্জামান রতন ও জেলা প্রশাসক নুর মহল আশরাফী। এ সময় ভাঙনপ্রবণ এলাকায় বালুর বস্তা ফেলে অস্থায়ী প্রতিরোধ ব্যবস্থা তৈরির কাজ শুরু করা হয়।

জেলা প্রশাসক নুর মহল আশরাফী জানান, ভাঙনরোধে মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকৌশলীদের সঙ্গে নিয়ে আপাতত প্রায় ৪০০ মিটার ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় কাজ করা হচ্ছে।

এমপি কামরুজ্জামান রতন বলেন, দীর্ঘদিন ধরে প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে লড়াই করছে এই এলাকার মানুষ। প্রবল স্রোতে একটি মসজিদ নদীতে বিলীন হওয়ার বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক। ভাঙন ঠেকাতে সামর্থ্য অনুযায়ী সর্বোচ্চ চেষ্টা চালানো হচ্ছে।

মুন্সীগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী শেখ এনামুল হক বলেন, পদ্মায় স্রোতের গতি বেড়ে যাওয়ায় বিভিন্ন স্থানে ভাঙন দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পানি উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় প্রতিরোধমূলক কাজ চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

আপলোডকারীর তথ্য

এশার পরও ছিল মসজিদ, ফজরে গিয়ে মিলল না চিহ্ন—পদ্মার ভাঙনে বিলীন ইমাম আবু হানিফা জামে মসজিদ

আপডেট সময় ০৩:৩৮:০৩ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মুন্সীগঞ্জের পদ্মায় ভয়াবহ নদীভাঙন দেখা দিয়েছে। প্রবল স্রোতের তোড়ে একের পর এক বসতবাড়ি, স্থাপনা ও গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান নদীগর্ভে চলে যাচ্ছে। এরই মধ্যে সদর উপজেলার রাকিরকান্দি এলাকায় রাতের ব্যবধানে পদ্মায় বিলীন হয়েছে মাদানী কমপ্লেক্স মাদ্রাসার ইমাম আবু হানিফা জামে মসজিদ।

রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) বিকেলে সদর উপজেলার দেওয়ানকান্দি, রাকিরকান্দি ও পূর্বরাখী এলাকা ঘুরে দেখা যায়, পদ্মার তীরে ব্যাপক ভাঙন চলছে। নদীর তীব্র স্রোতে ভেঙে পড়ছে অস্থায়ী প্রতিরক্ষা বাঁধের বিভিন্ন অংশ। ভাঙন ঠেকাতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষ থেকে বালুর বস্তা ফেলে জরুরি প্রতিরোধ ব্যবস্থা নেওয়া হলেও স্রোতের তীব্রতায় তা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।

স্থানীয়দের সবচেয়ে বেশি নাড়া দিয়েছে মসজিদটি নদীগর্ভে চলে যাওয়ার ঘটনা। মুসল্লিরা রাতে এশার নামাজ আদায় করে বাড়ি ফিরেছিলেন। কয়েক ঘণ্টা পর ফজরের নামাজ পড়তে এসে দেখেন, যে স্থানে মসজিদটি ছিল সেখানে এখন শুধু পদ্মার পানি।

মাদ্রাসার শিক্ষার্থী সোহেল জানান, শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) রাতে এশার নামাজ শেষে তারা মাদ্রাসায় ঘুমিয়ে পড়েন। ভোরে ফজরের নামাজের জন্য বের হয়ে দেখেন, মসজিদটি নদীতে ভেঙে পড়েছে। বর্তমানে মাদ্রাসার মাঠেই নামাজ আদায় করতে হচ্ছে তাদের।

স্থানীয় সাবেক ইউপি সদস্য মিজানুর রহমান দুদুর দাবি, কয়েক বছর আগেও ওই এলাকায় নদীর গতিপথ তুলনামূলক ছোট ছিল। ড্রেজার দিয়ে মাটি কাটার কারণে নদীর গভীরতা ও প্রশস্ততা বেড়েছে বলে তিনি মনে করেন। এতে ভাঙনের মাত্রাও বাড়ছে। তার ভাষ্য, মাদ্রাসা ও খানকার বড় একটি অংশ ইতোমধ্যে নদীগর্ভে চলে গেছে।

স্থানীয় বাসিন্দা মো. হোসেন লিটন খান বলেন, দীর্ঘদিন ধরে পদ্মার ভাঙনে তারা আতঙ্কের মধ্যে রয়েছেন। মাদানী কমপ্লেক্সের মসজিদের পাশাপাশি মাহফিলের মাঠও নদীতে বিলীন হয়েছে। এলাকার মানুষের দাবি, গুরুত্বপূর্ণ এই প্রতিষ্ঠান ও আশপাশের জনবসতি রক্ষায় দ্রুত স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করা হোক।

আরেক বাসিন্দা জামাল বলেন, কয়েক বছর ধরে ধীরে ধীরে নদী বড় হচ্ছে এবং আশপাশের বাড়িঘর ভেঙে যাচ্ছে। ভাঙনের কারণে অনেক পরিবার এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছে। এবার মাদ্রাসার মসজিদও রক্ষা পেল না।

মাদানী কমপ্লেক্স মাদ্রাসার সহকারী শিক্ষক মো. খালেক সাইফুল জানান, প্রায় পাঁচ বছর ধরে তাদের এলাকায় নিয়মিত নদীভাঙন হচ্ছে। ইতোমধ্যে মাদ্রাসার প্রায় ১০০ শতাংশ জমি নদীতে চলে গেছে। দীর্ঘদিন ধরে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের কথা শোনা গেলেও কার্যকর উদ্যোগের অপেক্ষায় রয়েছেন তারা।

এদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, মুন্সীগঞ্জের নদীগুলোতে পানির উচ্চতা বাড়ছে এবং স্রোতের গতিও বেড়েছে। তবে এখনো নদীর পানি বিপৎসীমার নিচে রয়েছে।

সদর ও টঙ্গিবাড়ী উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ঘুরেও নদীতে প্রবল স্রোত দেখা গেছে। স্রোতের কারণে ছোট নৌযান চলাচলেও সমস্যা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। টঙ্গিবাড়ী উপজেলার বানারী এলাকাতেও একইভাবে ভাঙন চলছে। সেখানে ঐতিহ্যবাহী মিয়া বাড়িও ভাঙনের হুমকিতে পড়েছে।

ভাঙন পরিস্থিতি দেখতে রোববার বিকেলে দেওয়ানকান্দি এলাকা পরিদর্শন করেন মুন্সীগঞ্জ-৩ আসনের এমপি কামরুজ্জামান রতন ও জেলা প্রশাসক নুর মহল আশরাফী। এ সময় ভাঙনপ্রবণ এলাকায় বালুর বস্তা ফেলে অস্থায়ী প্রতিরোধ ব্যবস্থা তৈরির কাজ শুরু করা হয়।

জেলা প্রশাসক নুর মহল আশরাফী জানান, ভাঙনরোধে মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকৌশলীদের সঙ্গে নিয়ে আপাতত প্রায় ৪০০ মিটার ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় কাজ করা হচ্ছে।

এমপি কামরুজ্জামান রতন বলেন, দীর্ঘদিন ধরে প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে লড়াই করছে এই এলাকার মানুষ। প্রবল স্রোতে একটি মসজিদ নদীতে বিলীন হওয়ার বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক। ভাঙন ঠেকাতে সামর্থ্য অনুযায়ী সর্বোচ্চ চেষ্টা চালানো হচ্ছে।

মুন্সীগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী শেখ এনামুল হক বলেন, পদ্মায় স্রোতের গতি বেড়ে যাওয়ায় বিভিন্ন স্থানে ভাঙন দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পানি উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় প্রতিরোধমূলক কাজ চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে।