এইচএসসিতে বড় ধাক্কা: নিয়মিত শিক্ষার্থীর ৩৬ শতাংশই পরীক্ষার হলে নেই
আজ (বৃহস্পতিবার) সারাদেশে শুরু হয়েছে ২০২৬ সালের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা। তবে পরীক্ষা শুরুর আগেই সামনে এসেছে উদ্বেগজনক এক চিত্র। দুই বছর আগে একাদশ শ্রেণিতে নিবন্ধিত নিয়মিত শিক্ষার্থীদের প্রায় ৩৬ শতাংশ এবার পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন না। অর্থাৎ নিবন্ধন করেও প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ শিক্ষার্থী শেষ পর্যন্ত ফরম পূরণ করেননি কিংবা পরীক্ষার হলে বসছেন না।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও বিভিন্ন শিক্ষা বোর্ডের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে এসএসসি ও সমমান পাস করে প্রায় ১৫ লাখ শিক্ষার্থী একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হয়ে নিবন্ধন করেছিলেন। কিন্তু এবার এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার জন্য ফরম পূরণ করেছেন প্রায় সাড়ে ৯ লাখ শিক্ষার্থী। ফলে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী মাঝপথেই পরীক্ষা থেকে ছিটকে পড়েছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রতি বছরই কিছু শিক্ষার্থী বিভিন্ন কারণে পাবলিক পরীক্ষায় অংশ নিতে পারে না। তবে চলতি বছরে অনুপস্থিতির হার অতীতের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ায় বিষয়টি শিক্ষাব্যবস্থার জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
গত বছরের তুলনায়ও পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। ২০২৫ সালে নিয়মিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে পরীক্ষায় অংশ না নেওয়ার হার ছিল প্রায় ২৯ শতাংশ। এক বছরের ব্যবধানে সেটি বেড়ে প্রায় ৩৬ শতাংশে পৌঁছেছে।
কারিগরি বোর্ডে সবচেয়ে বেশি ঝরে পড়া
তিনটি শিক্ষা ধারার মধ্যে সবচেয়ে বেশি অনুপস্থিতি দেখা গেছে বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে। এ বোর্ডে নিয়মিত শিক্ষার্থীদের অর্ধেকেরও বেশি, অর্থাৎ প্রায় ৫৫ শতাংশ পরীক্ষার জন্য ফরম পূরণ করেননি।
অন্যদিকে, নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে নিবন্ধিত শিক্ষার্থীদের প্রায় ৩৩ শতাংশ এবং মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের আলিম পর্যায়ে প্রায় ৪৪ শতাংশ শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন না।
কেন বাড়ছে পরীক্ষা থেকে ছিটকে পড়ার হার?
শিক্ষা বিভাগ এখনো এ বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ কোনো গবেষণা প্রকাশ করতে পারেনি। তবে সংশ্লিষ্টদের ধারণা, দারিদ্র্য, বাল্যবিবাহ, পর্যাপ্ত প্রস্তুতির অভাব, এসএসসি পাসের পর কর্মজীবনে যুক্ত হয়ে পড়া এবং বিভিন্ন সামাজিক-অর্থনৈতিক কারণে অনেক শিক্ষার্থী পড়াশোনা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে।
আগের একটি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, অনুপস্থিত শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশের ক্ষেত্রে বাল্যবিবাহ অন্যতম কারণ ছিল। এছাড়া অর্থনৈতিক সংকট ও পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ হারানোর বিষয়ও উঠে এসেছে।
ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের কর্মকর্তাদের মতে, অনেক শিক্ষার্থী প্রস্তুতি সম্পূর্ণ না হওয়ায় নির্ধারিত বছরে পরীক্ষা না দিয়ে পরবর্তী বছর অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। তবে সামগ্রিকভাবে ঝরে পড়ার প্রকৃত কারণ জানতে আরও বিস্তৃত গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।
এবার পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন কতজন?
নিয়মিত ও অনিয়মিত মিলিয়ে এবার ১২ লাখ ৭০ হাজার ৫৮৩ জন পরীক্ষার্থী এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন। সারাদেশের ২ হাজার ৬৯৭টি কেন্দ্রে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। পরীক্ষার্থীদের সকাল সাড়ে ৮টার মধ্যে কেন্দ্রে প্রবেশের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
পরীক্ষাকেন্দ্রে নিরাপত্তা জোরদারে দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ সদস্যদের বডি-ওর্ন ক্যামেরা ব্যবহারের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। লিখিত পরীক্ষা ২১ কার্যদিবসে শেষ হবে। পরীক্ষা না থাকা দিনগুলোতে কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে স্বাভাবিক শ্রেণি কার্যক্রম চলবে।
সরকারের অবস্থান
এইচএসসি পরীক্ষা উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন, পরীক্ষায় অংশ না নেওয়া শিক্ষার্থীদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। কারণগুলো শনাক্ত করে ভবিষ্যতে ঝরে পড়া কমাতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
তিনি আরও জানান, এবার নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে অভিন্ন প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। আগামী বছর থেকে মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের সাধারণ বিষয়গুলোর পরীক্ষাও একই ধরনের প্রশ্নপত্রে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরীক্ষা নিয়ে গুজব বা বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ালে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


























