ঢাকা ১২:৫৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৮ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ঢাকার যানজট সামলাতে এবার আকাশে ড্রোন, আসছে রিয়েল টাইম ট্রাফিক নজরদারি

নিজস্ব সংবাদ :

রাজধানীর যানজট নিয়ন্ত্রণ ও সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারের পথে হাঁটছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)। এআই ক্যামেরার পর এবার গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও যানজটপ্রবণ এলাকায় ড্রোন দিয়ে নজরদারি চালুর প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে চলতি সেপ্টেম্বরের শেষ দিকেই পরীক্ষামূলকভাবে মাঠে নামতে পারে ড্রোন।

ডিএমপি ট্রাফিক বিভাগ জানিয়েছে, ড্রোনের মাধ্যমে রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টের যান চলাচলের পরিস্থিতি আকাশ থেকে পর্যবেক্ষণ করা হবে। কোথায় যানজট তৈরি হচ্ছে, এর পেছনে কারণ কী—এসব তথ্য দ্রুত সংগ্রহ করে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।

শুধু যানজট পর্যবেক্ষণেই সীমাবদ্ধ থাকবে না এই প্রযুক্তি। ট্রাফিক আইন অমান্যকারী যানবাহন শনাক্ত, চালকদের সতর্ক করা এবং ভবিষ্যতে ড্রোনের সঙ্গে অটোমেটিক নম্বর প্লেট রিকগনিশন (এএনপিআর) প্রযুক্তি যুক্ত করে ভিডিও প্রমাণের ভিত্তিতে মামলা করার পরিকল্পনাও রয়েছে পুলিশের।

ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মো. আনিছুর রহমান জানান, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় ড্রোন ব্যবহৃত হলেও ঢাকায় এটি নতুন উদ্যোগ। বিশেষ করে সড়কের পাশাপাশি ফ্লাইওভার ও এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে হঠাৎ যানজট তৈরি হলে অনেক সময় তার প্রকৃত কারণ দ্রুত শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। ড্রোন সেই পরিস্থিতির তাৎক্ষণিক চিত্র তুলে ধরতে পারবে।

তার ভাষায়, আকাশ থেকে পাওয়া রিয়েল টাইম তথ্যের ভিত্তিতে ট্রাফিক পুলিশ দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। ফলে যানজট নিরসনে মাঠপর্যায়ে নির্দেশনা দেওয়াও সহজ হবে।

ড্রোন থেকেই দেওয়া যাবে সতর্কবার্তা

ডিএমপি বলছে, ড্রোনে শব্দ বা ভয়েস সিস্টেম যুক্ত থাকবে। ফলে কোনো গাড়ি সড়কে অযথা অবস্থান করে যান চলাচলে বাধা সৃষ্টি করলে আকাশ থেকেই চালককে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া যাবে।

এ ছাড়া ভবিষ্যতে এএনপিআর প্রযুক্তি যুক্ত হলে ড্রোনের ক্যামেরায় ধারণ করা ফুটেজ থেকে আইন লঙ্ঘনকারী গাড়ির নম্বর শনাক্ত করা সম্ভব হবে। এর ভিত্তিতে ভিডিও মামলা দেওয়ার ব্যবস্থাও চালু করা যেতে পারে।

তবে ডিএমপি এখনই পুরোপুরি স্বয়ংক্রিয়ভাবে মামলা দেওয়ার পরিকল্পনায় যাচ্ছে না। কর্মকর্তারা জানান, ফুটেজ প্রথমে পর্যালোচনা ও যাচাই করা হবে। অনিয়ম নিশ্চিত হওয়ার পরই আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বাসের প্রতিযোগিতাও যানজটের বড় কারণ

ঢাকার যানজটের অন্যতম বড় কারণ হিসেবে গণপরিবহনের বিশৃঙ্খল চলাচলকে দেখছে ট্রাফিক বিভাগ। বিশেষ করে অনেক বাস নির্ধারিত স্টপেজে না থেমে যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা করায় পেছনে যানবাহনের দীর্ঘ সারি তৈরি হয়।

ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগের মতে, অনেক বাস চুক্তিভিত্তিক ব্যবস্থায় পরিচালিত হওয়ায় চালকদের মধ্যে প্রতিদিনের আয় নিশ্চিত করার প্রতিযোগিতা থাকে। ফলে যাত্রী ধরতে একটি বাস আরেকটির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলতে থাকে এবং নির্ধারিত স্টপেজের বাইরে দাঁড়িয়ে পড়ে।

উন্নত দেশগুলোতে নির্দিষ্ট সময়সূচি ও ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বাস পরিচালিত হলেও ঢাকায় এখনো সেই ধরনের সমন্বিত ব্যবস্থা পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। কর্মকর্তাদের মতে, ই-টিকিটিং এবং বাস রুট রেশনালাইজেশন কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন না হলে শুধু প্রযুক্তি ব্যবহার করে ঢাকার যানজট পুরোপুরি কমানো কঠিন।

প্রশিক্ষণ শুরু, একাধিক ট্রাফিক বিভাগ প্রস্তুত

ড্রোন পরিচালনা ও প্রযুক্তিগত ব্যবস্থাপনার জন্য ইতোমধ্যে ট্রাফিক পুলিশের সদস্যদের প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু হয়েছে। প্রথম পর্যায়ে তেজগাঁও বিভাগে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। এরপর উত্তরা বিভাগের সদস্যদেরও প্রশিক্ষণ সম্পন্ন হয়েছে। পর্যায়ক্রমে অন্যান্য ট্রাফিক জোনের সদস্যদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার কাজ চলছে।

ডিএমপি জানিয়েছে, একটি প্রতিষ্ঠান পরীক্ষামূলক ব্যবহারের জন্য একটি ড্রোন সরবরাহ করেছে। সেটি নিয়ে বর্তমানে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো প্রস্তুত করা গেলে চলতি মাসের শেষ দিকে মাঠপর্যায়ে ড্রোন ব্যবহার শুরু হতে পারে।

প্রযুক্তির পাশাপাশি লাগবে অবকাঠামো

ড্রোন থেকে পাওয়া তথ্য সরাসরি কাজে লাগাতে প্রয়োজন হবে নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট সংযোগ, সার্ভার ও অন্যান্য প্রযুক্তিগত অবকাঠামো। ফলে এই প্রকল্প বাস্তবায়নে শুধু ড্রোন কিনলেই হবে না, এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি ও পরিচালন ব্যয়ও বিবেচনায় নিতে হবে।

ডিএমপি কর্মকর্তারা বলছেন, ড্রোন ব্যবহারের মূল উদ্দেশ্য মামলা বাড়ানো নয়। বরং প্রযুক্তির মাধ্যমে মানুষকে ট্রাফিক আইন মানতে উৎসাহিত করা এবং রাজধানীর সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা।

এর আগে শাহবাগসহ রাজধানীর ১৫টি ট্রাফিক সিগন্যাল এআই প্রযুক্তির আওতায় আনা হয়েছে। সেই ব্যবস্থার কার্যকারিতা যাচাইয়ের পর এবার ড্রোন নজরদারি যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

ডিএমপির প্রত্যাশা, সড়ক ও আকাশ—দুই দিক থেকে সমন্বিত নজরদারি চালু হলে যানজটের কারণ দ্রুত শনাক্ত করা এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া আরও সহজ হবে।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

আপলোডকারীর তথ্য

ঢাকার যানজট সামলাতে এবার আকাশে ড্রোন, আসছে রিয়েল টাইম ট্রাফিক নজরদারি

আপডেট সময় ০২:৫৭:৩১ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

রাজধানীর যানজট নিয়ন্ত্রণ ও সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারের পথে হাঁটছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)। এআই ক্যামেরার পর এবার গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও যানজটপ্রবণ এলাকায় ড্রোন দিয়ে নজরদারি চালুর প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে চলতি সেপ্টেম্বরের শেষ দিকেই পরীক্ষামূলকভাবে মাঠে নামতে পারে ড্রোন।

ডিএমপি ট্রাফিক বিভাগ জানিয়েছে, ড্রোনের মাধ্যমে রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টের যান চলাচলের পরিস্থিতি আকাশ থেকে পর্যবেক্ষণ করা হবে। কোথায় যানজট তৈরি হচ্ছে, এর পেছনে কারণ কী—এসব তথ্য দ্রুত সংগ্রহ করে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।

শুধু যানজট পর্যবেক্ষণেই সীমাবদ্ধ থাকবে না এই প্রযুক্তি। ট্রাফিক আইন অমান্যকারী যানবাহন শনাক্ত, চালকদের সতর্ক করা এবং ভবিষ্যতে ড্রোনের সঙ্গে অটোমেটিক নম্বর প্লেট রিকগনিশন (এএনপিআর) প্রযুক্তি যুক্ত করে ভিডিও প্রমাণের ভিত্তিতে মামলা করার পরিকল্পনাও রয়েছে পুলিশের।

ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মো. আনিছুর রহমান জানান, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় ড্রোন ব্যবহৃত হলেও ঢাকায় এটি নতুন উদ্যোগ। বিশেষ করে সড়কের পাশাপাশি ফ্লাইওভার ও এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে হঠাৎ যানজট তৈরি হলে অনেক সময় তার প্রকৃত কারণ দ্রুত শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। ড্রোন সেই পরিস্থিতির তাৎক্ষণিক চিত্র তুলে ধরতে পারবে।

তার ভাষায়, আকাশ থেকে পাওয়া রিয়েল টাইম তথ্যের ভিত্তিতে ট্রাফিক পুলিশ দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। ফলে যানজট নিরসনে মাঠপর্যায়ে নির্দেশনা দেওয়াও সহজ হবে।

ড্রোন থেকেই দেওয়া যাবে সতর্কবার্তা

ডিএমপি বলছে, ড্রোনে শব্দ বা ভয়েস সিস্টেম যুক্ত থাকবে। ফলে কোনো গাড়ি সড়কে অযথা অবস্থান করে যান চলাচলে বাধা সৃষ্টি করলে আকাশ থেকেই চালককে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া যাবে।

এ ছাড়া ভবিষ্যতে এএনপিআর প্রযুক্তি যুক্ত হলে ড্রোনের ক্যামেরায় ধারণ করা ফুটেজ থেকে আইন লঙ্ঘনকারী গাড়ির নম্বর শনাক্ত করা সম্ভব হবে। এর ভিত্তিতে ভিডিও মামলা দেওয়ার ব্যবস্থাও চালু করা যেতে পারে।

তবে ডিএমপি এখনই পুরোপুরি স্বয়ংক্রিয়ভাবে মামলা দেওয়ার পরিকল্পনায় যাচ্ছে না। কর্মকর্তারা জানান, ফুটেজ প্রথমে পর্যালোচনা ও যাচাই করা হবে। অনিয়ম নিশ্চিত হওয়ার পরই আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বাসের প্রতিযোগিতাও যানজটের বড় কারণ

ঢাকার যানজটের অন্যতম বড় কারণ হিসেবে গণপরিবহনের বিশৃঙ্খল চলাচলকে দেখছে ট্রাফিক বিভাগ। বিশেষ করে অনেক বাস নির্ধারিত স্টপেজে না থেমে যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা করায় পেছনে যানবাহনের দীর্ঘ সারি তৈরি হয়।

ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগের মতে, অনেক বাস চুক্তিভিত্তিক ব্যবস্থায় পরিচালিত হওয়ায় চালকদের মধ্যে প্রতিদিনের আয় নিশ্চিত করার প্রতিযোগিতা থাকে। ফলে যাত্রী ধরতে একটি বাস আরেকটির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলতে থাকে এবং নির্ধারিত স্টপেজের বাইরে দাঁড়িয়ে পড়ে।

উন্নত দেশগুলোতে নির্দিষ্ট সময়সূচি ও ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বাস পরিচালিত হলেও ঢাকায় এখনো সেই ধরনের সমন্বিত ব্যবস্থা পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। কর্মকর্তাদের মতে, ই-টিকিটিং এবং বাস রুট রেশনালাইজেশন কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন না হলে শুধু প্রযুক্তি ব্যবহার করে ঢাকার যানজট পুরোপুরি কমানো কঠিন।

প্রশিক্ষণ শুরু, একাধিক ট্রাফিক বিভাগ প্রস্তুত

ড্রোন পরিচালনা ও প্রযুক্তিগত ব্যবস্থাপনার জন্য ইতোমধ্যে ট্রাফিক পুলিশের সদস্যদের প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু হয়েছে। প্রথম পর্যায়ে তেজগাঁও বিভাগে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। এরপর উত্তরা বিভাগের সদস্যদেরও প্রশিক্ষণ সম্পন্ন হয়েছে। পর্যায়ক্রমে অন্যান্য ট্রাফিক জোনের সদস্যদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার কাজ চলছে।

ডিএমপি জানিয়েছে, একটি প্রতিষ্ঠান পরীক্ষামূলক ব্যবহারের জন্য একটি ড্রোন সরবরাহ করেছে। সেটি নিয়ে বর্তমানে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো প্রস্তুত করা গেলে চলতি মাসের শেষ দিকে মাঠপর্যায়ে ড্রোন ব্যবহার শুরু হতে পারে।

প্রযুক্তির পাশাপাশি লাগবে অবকাঠামো

ড্রোন থেকে পাওয়া তথ্য সরাসরি কাজে লাগাতে প্রয়োজন হবে নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট সংযোগ, সার্ভার ও অন্যান্য প্রযুক্তিগত অবকাঠামো। ফলে এই প্রকল্প বাস্তবায়নে শুধু ড্রোন কিনলেই হবে না, এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি ও পরিচালন ব্যয়ও বিবেচনায় নিতে হবে।

ডিএমপি কর্মকর্তারা বলছেন, ড্রোন ব্যবহারের মূল উদ্দেশ্য মামলা বাড়ানো নয়। বরং প্রযুক্তির মাধ্যমে মানুষকে ট্রাফিক আইন মানতে উৎসাহিত করা এবং রাজধানীর সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা।

এর আগে শাহবাগসহ রাজধানীর ১৫টি ট্রাফিক সিগন্যাল এআই প্রযুক্তির আওতায় আনা হয়েছে। সেই ব্যবস্থার কার্যকারিতা যাচাইয়ের পর এবার ড্রোন নজরদারি যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

ডিএমপির প্রত্যাশা, সড়ক ও আকাশ—দুই দিক থেকে সমন্বিত নজরদারি চালু হলে যানজটের কারণ দ্রুত শনাক্ত করা এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া আরও সহজ হবে।