ছিনতাইয়ের নগরী ঢাকা: হ্যাঁচকা টানে ঝরছে প্রাণ, আতঙ্কে নগরবাসী
ঢাকায় ছিনতাই নতুন কোনো ঘটনা নয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ছিনতাইয়ের ধরন, সময় ও সংঘবদ্ধতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে চলন্ত রিকশা, মোটরসাইকেল কিংবা গাড়ি থেকে হ্যাঁচকা টানে ব্যাগ-মোবাইল ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনায় একের পর এক মানুষ গুরুতর আহত হচ্ছেন, কেউ কেউ হারাচ্ছেন প্রাণ।
সবশেষ এমন নির্মমতার শিকার হয়েছেন বগুড়ার একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রনজিলা পারভিন। চোখের চিকিৎসা করাতে স্বামীর সঙ্গে ঢাকায় এসেছিলেন ৫৭ বছর বয়সী এই শিক্ষক। পরিকল্পনা ছিল চিকিৎসা শেষে পরদিনই কর্মস্থলে ফিরে যাবেন। কিন্তু ফিরেছেন ঠিকই—তবে জীবিত নয়, লাশ হয়ে।
শুক্রবার রাতে স্বামী আব্দুল মতিনকে সঙ্গে নিয়ে বগুড়া থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন রনজিলা। শনিবার ভোরে ঢাকায় পৌঁছে ফার্মগেটের ইস্পাহানি ইসলামীয়া চক্ষু হাসপাতালে যাওয়ার জন্য সংসদ ভবনসংলগ্ন সড়কে রিকশায় ওঠেন তারা।
হাসপাতালের কাছাকাছি পৌঁছানোর আগেই মোটরসাইকেলে আসা এক ছিনতাইকারী রনজিলার ব্যাগ ধরে জোরে টান দেয়। আচমকা টানে রিকশা থেকে ছিটকে সড়কে পড়ে মাথায় গুরুতর আঘাত পান তিনি। দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হলেও চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
রোববার স্কুলমাঠে অ্যাম্বুলেন্সে করে রনজিলার মরদেহ পৌঁছালে শোকের ছায়া নেমে আসে পুরো এলাকায়। প্রিয় শিক্ষক আর নেই—এ কথা যেন বিশ্বাসই করতে পারছিল না শিক্ষার্থীরা।
স্ত্রীর মৃত্যুর পর ভেঙে পড়েছেন আব্দুল মতিন। ময়নাতদন্ত শেষে শনিবার রাতেই মরদেহ নিয়ে বাড়ির উদ্দেশে রওনা দেন তিনি। রোববার আক্ষেপ করে বলেন, “চিকিৎসার জন্য স্ত্রীকে নিয়ে ঢাকায় গেলাম, ফিরলাম লাশ নিয়ে। আর কী বলার আছে!”
একই সময়ে আরেক ছিনতাইকারীর মৃত্যু
রনজিলার মৃত্যুর সময়ের কাছাকাছি শনিবার ভোরে রাজধানীর কদমতলী ভাঙা ব্রিজ এলাকায় ছিনতাইয়ের সময় ছুরিকাঘাতে জনি নামে এক ছিনতাইকারীর মৃত্যু হয়।
কদমতলী থানার পরিদর্শক সজীব কুমার বাড়ৈ জানান, তিন ছিনতাইকারী দুই পথচারীকে ঘিরে ধরে। একজনকে জাপটে ধরে টাকা-পয়সা ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছিল তারা।
পথচারীরা চিৎকার শুরু করলে একজন ছিনতাইকারী সুইচ গিয়ার দিয়ে হামলার চেষ্টা করে। এ সময় তাকে আটকাতে গেলে পেছনে থাকা জনির বুকের পাশে তার হাতের নিচ দিয়ে ছুরিকাঘাত লাগে। পরে দুই ছিনতাইকারী পালিয়ে গেলেও আহত জনির মৃত্যু হয়।
দিন-রাত বাড়ছে ছিনতাইয়ের আতঙ্ক
কর্মব্যস্ত রাজধানীতে এখন অনেকের কাছে রাস্তায় বের হওয়াই যেন ঝুঁকির বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কখনো অস্ত্র দেখিয়ে পথ আটকে ছিনিয়ে নেওয়া হচ্ছে টাকা-পয়সা, আবার কখনো চলন্ত মোটরসাইকেল থেকে পথচারীর হাতে থাকা মোবাইল কিংবা ব্যাগ টেনে নেওয়া হচ্ছে।
মিরপুরের বাসিন্দা রাইসুল ইসলাম বলেন, আগে রাতেও বন্ধুদের সঙ্গে বের হওয়া বা ঘোরাঘুরি নিয়ে তেমন চিন্তা করতেন না। এখন অফিসে যাওয়া-আসার সময়ও আতঙ্কে থাকতে হয়।
তার ভাষায়, “রিকশায় উঠলেও ভয়, বাসে উঠলেও ভয়। কখন কোথায় ছিনতাইকারীর সামনে পড়তে হয়, সেটাই এখন চিন্তার বিষয়।”
উত্তরায় কর্মরত এই বেসরকারি চাকরিজীবীর প্রশ্ন, “ছিনতাই আগে ছিল না, এমন নয়। কিন্তু এখন যেভাবে হচ্ছে, সেটা বাড়াবাড়ি। দিনের পর দিন একই অবস্থা—এভাবে আর কতদিন?”
ভোর ও গভীর রাতে বেশি ঝুঁকি
সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনা বিশ্লেষণে দেখা যায়, ভোর ৪টা থেকে সকাল ৭টা এবং রাত ১০টার পর রাজধানীতে ছিনতাইয়ের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি। বিশেষ করে দূরপাল্লার বাস, ট্রেন কিংবা লঞ্চ থেকে নেমে যারা রিকশা বা অন্য যানবাহনে গন্তব্যে যান, তাদের টার্গেট করছে অপরাধীরা।
আগের মতো শুধু নির্জন জায়গায় পথ আটকে ছিনতাইয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই অপরাধীরা। এখন দ্রুতগতির মোটরসাইকেল কিংবা গাড়ি ব্যবহার করে পথচারী বা রিকশাযাত্রীদের ব্যাগ ও মোবাইল ধরে টান দেওয়ার প্রবণতা বেড়েছে।
এই কৌশলে ভুক্তভোগী ভারসাম্য হারিয়ে সড়কে পড়ে যান। গুরুতর আহত হওয়ার পাশাপাশি প্রাণহানিও ঘটছে।
পুলিশের পরিসংখ্যানে ভিন্ন চিত্র
তবে ছিনতাই বেড়েছে—এমন ধারণার সঙ্গে পুরোপুরি একমত নয় পুলিশ। ঢাকা মহানগর পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ছয় মাসে রাজধানীর বিভিন্ন থানায় ছিনতাইয়ের ঘটনায় ১৭২টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে ৪০২ জনকে।
অন্যদিকে গত বছর একই ধরনের ঘটনায় ৫৩১টি মামলা এবং ১ হাজার ৪৩৫ জন গ্রেপ্তারের তথ্য রয়েছে।
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সাত মাসে ডিএমপির ৫০ থানায় ছিনতাইয়ের ঘটনায় ১৮৯টি মামলার তথ্য পাওয়া গেছে পুলিশ সদর দপ্তরের হিসাবে।
আইন অনুযায়ী, ছিনতাইয়ের ঘটনায় আসামির সংখ্যা অনুযায়ী দস্যুতা বা ডাকাতির ধারায় মামলা করা হয়। সাধারণত এক থেকে চারজন জড়িত থাকলে দস্যুতা এবং চারজনের বেশি হলে ডাকাতির ধারা প্রযোজ্য হয়।
এক কোটি ২১ লাখ টাকা লুট
ছিনতাইকারীদের দৌরাত্ম্যের বড় উদাহরণ দেখা গেছে গত ১০ আগস্ট উত্তরায়। ব্যাংকে টাকা জমা দেওয়ার জন্য একটি পেট্রোল পাম্পের কর্মীদের বহনকারী গাড়ি থামিয়ে মোটরসাইকেল আরোহী ছিনতাইকারীরা ১ কোটি ২১ লাখ ২৫ হাজার টাকা নিয়ে যায়।
পরে ডিবি ও র্যাবের অভিযানে আটজনকে গ্রেপ্তারের কথা জানানো হয়।
ডিএমপির গণমাধ্যম ও জনসংযোগ বিভাগের উপকমিশনার মো. আকতার হোসেন বলেন, ছিনতাই প্রতিরোধকে পুলিশ সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। টহল, ফুট পেট্রোল এবং গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালানো হচ্ছে।
তার দাবি, যেসব ঘটনা পুলিশের কাছে আসে, সেগুলোতে নিয়মিত মামলা হচ্ছে এবং আসামিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
পুলিশের তালিকায় ১ হাজার ৩৮৭ ছিনতাইকারী
ডিএমপির আটটি বিভাগে বর্তমানে তালিকাভুক্ত ছিনতাইকারীর সংখ্যা ১ হাজার ৩৮৭ জন।
এর মধ্যে রমনা বিভাগে ১৫২, লালবাগে ১৫৯, ওয়ারীতে ৩০৮, মতিঝিলে ১৬৮, তেজগাঁওয়ে ২৪০, মিরপুরে ৫৩, গুলশানে ৬৭ এবং উত্তরায় ২৪০ জনের নাম রয়েছে।
পুলিশ কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, তালিকাভুক্ত এসব ছিনতাইকারীর প্রায় ৮০ শতাংশের বিরুদ্ধেই একাধিক মামলা রয়েছে। অনেকেই একাধিকবার গ্রেপ্তার হওয়ার পর জামিনে বেরিয়ে আবার অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।
তবে পুলিশের তালিকার বাইরেও বিপুলসংখ্যক ভাসমান ছিনতাইকারী সক্রিয় রয়েছে বলে মনে করছেন কর্মকর্তারা। একই ব্যক্তি একাধিক এলাকায় অপরাধে জড়িত থাকায় নির্দিষ্ট এলাকার ছিনতাইকারীর সংখ্যা নির্ধারণ করাও কঠিন।
পুলিশের হিসাবে রাজধানীতে অন্তত ৩০০ ছিনতাইপ্রবণ স্থান রয়েছে। এর মধ্যে শতাধিক এলাকাকে হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
ওয়ারীতে মামলা বেশি
চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ডিএমপির ওয়ারী বিভাগে সবচেয়ে বেশি ৩৮টি ছিনতাই মামলা হয়েছে। এসব মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছেন ৯৮ জন।
তেজগাঁও বিভাগে ৩৪টি মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছেন সর্বোচ্চ ১৩৮ জন।
অন্যদিকে লালবাগ বিভাগে ছয় মাসে সবচেয়ে কম পাঁচটি মামলা হয়েছে এবং গ্রেপ্তার হয়েছেন সাতজন।
ঢাকার বাইরে থেকেও এসে ছিনতাই
রাজধানীর ছিনতাইচিত্রে আরেকটি বিষয় সামনে এসেছে—শুধু স্থানীয় অপরাধীরাই নয়, ঢাকার বাইরে থাকা অপরাধীরাও রাজধানীতে এসে ছিনতাই করছে।
গত ৩০ মে ঈদের ছুটি শেষে ঠাকুরগাঁও থেকে ঢাকার মোহাম্মদপুরের বাসায় ফিরছিলেন দুই বোন। নূরজাহান রোডে রিকশা থেকে নামার সময় তাদের ঘিরে ধরে দুই ছিনতাইকারী।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, চাপাতি হাতে এক যুবক তাদের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। পরে ভয় দেখিয়ে ব্যাগ, লাগেজ ও মোবাইল ফোন নিয়ে যায় তারা।
ঘটনার পর ২ জুন নারায়ণগঞ্জের বন্দর এলাকা থেকে জুয়েল ওরফে আরিফ এবং আনোয়ার হোসেন নামে দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশ জানায়, তারা পেশাদার ছিনতাইকারী এবং আগে মোহাম্মদপুর এলাকায় থাকলেও পরে নারায়ণগঞ্জে আস্তানা গড়ে সেখান থেকে ঢাকায় এসে ছিনতাই করত।
এবার ছিনতাইকারীর হামলার শিকার পুলিশও
ছিনতাইকারীদের বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে গিয়ে পুলিশের সদস্যরাও হামলার শিকার হচ্ছেন।
গত ১১ জুন রাতে জিয়া উদ্যানের সামনের সড়কে ছিনতাইকারী ধরতে গিয়ে ছুরিকাঘাতে আহত হন পুলিশের এসআই সামসুজ্জোহা ও কনস্টেবল মোহাম্মদ হৃদয় হোসেন। পরে ঘটনাস্থল থেকে দুই ছিনতাইকারীকে আটক করা হয়।
১৬ জুন আদাবরে এক মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) এজেন্টকে কুপিয়ে প্রায় সাড়ে তিন লাখ টাকা লুটের ঘটনা ঘটে। আসামিদের ধরতে গিয়ে ছিনতাইকারীদের হামলায় আহত হন আদাবর থানার ওসি জাহিদুল ইসলাম ও এসআই তরুণ। পরে পুলিশের গুলিতে দুই ছিনতাইকারী আহত হন এবং চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
এর আগে ১১ মে মোহাম্মদপুর টাউন হল এলাকায় ছিনতাইকারী ধরতে গিয়ে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। পুলিশ জানায়, ওই সময় ছিনতাইকারীরা চাইনিজ কুড়াল ও চাপাতি নিয়ে আক্রমণের চেষ্টা করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এক পুলিশ সদস্য চার রাউন্ড গুলি ছোড়েন। এতে এক ছিনতাইকারী আহত হয়।
‘টানা পার্টি’র দাপট, কিন্তু মামলা হয় কতটা?
রাজধানীর সড়কে ‘টানা পার্টি’ এখন বহুল আলোচিত নাম। চলন্ত রিকশা, মোটরসাইকেল কিংবা গাড়ি থেকে মুহূর্তের মধ্যে মোবাইল, ব্যাগ বা মূল্যবান জিনিসপত্র টেনে নিয়ে পালিয়ে যাচ্ছে তারা।
তবে এসব ঘটনায় সবসময় মামলা হচ্ছে না। অনেক ভুক্তভোগী পুলিশের কাছে মামলা না করে সাধারণ ডায়েরি বা জিডি করেন।
গত ৯ জুলাই রাতে ধানমন্ডির আবাহনী মাঠের সামনে রিকশায় থাকা সুমন মাতুব্বরের হাত থেকে চলন্ত মোটরসাইকেলে থাকা এক ব্যক্তি মোবাইল ছিনিয়ে নিয়ে যায়।
পরে তিনি থানায় জিডি করেন। তদন্ত কর্মকর্তার সহযোগিতায় একটি ভিডিও ফুটেজ পেলেও মোটরসাইকেলের নম্বর স্পষ্ট না হওয়ায় অপরাধীকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।
সুমনের অভিযোগ, “প্রাণহানি বা ঘটনা ভাইরাল না হলে অনেক সময় ছিনতাইকারী ধরা পড়ে না। আমার ফোন যে নিয়েছে সে ধরা পড়েনি, ফলে সে আবারও একই কাজ করতে পারে।”
তবে ভুক্তভোগীদের মামলা না করে জিডি করতে বাধ্য করার অভিযোগ অস্বীকার করেছে ডিএমপি। উপকমিশনার আকতার হোসেন বলেন, অনেক মানুষ নিজেরাই মামলা করতে চান না, কারণ মামলায় সাক্ষ্য দেওয়ার বিষয় থাকে।
প্রকাশ্য দিবালোকে ছিনতাই
ছিনতাই এখন শুধু রাতের অন্ধকারে সীমাবদ্ধ নেই। দিনের ব্যস্ত সময়েও প্রকাশ্যে এমন ঘটনা ঘটছে।
সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় পথচারীদের চিৎকার শুনে দায়িত্বরত ট্রাফিক পুলিশ সদস্যরা ধাওয়া করে কয়েকজন ছিনতাইকারীকে আটক করেছেন।
২৬ আগস্ট যাত্রাবাড়ী মোড়ে এক নারীর কানের দুল ছিনিয়ে পালানোর সময় সেলিম নামে একজনকে আটক করা হয়।
২৫ আগস্ট জুরাইন রেলগেট এলাকায় এক নারীর ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে মোবাইল ফোন নেওয়ার পর পালানোর সময় শাহজালাল নামে একজনকে গ্রেপ্তার করেন ট্রাফিক পুলিশের সদস্যরা।
২৪ আগস্ট কমলাপুর এলাকায় বাস থেকে নামার সময় এক যাত্রীর পকেট থেকে টাকা নেওয়ার চেষ্টাকালে মোহাম্মদ রাশেদ নামে একজন আটক হন।
২০ আগস্ট কমলাপুর এলাকায় এক নারীর কানের দুল ছিনিয়ে নিয়ে সেটি গিলে ফেলার চেষ্টা করার সময় সাহেদ নামে এক যুবককে স্থানীয়দের সহায়তায় আটক করা হয়।
চার মাসেও শনাক্ত হয়নি রনজিলার ঘাতক
রনজিলার আগে একই কায়দায় প্রাণ হারিয়েছিলেন মুক্তা আক্তার নামে এক গৃহবধূ।
গত ১৯ মার্চ উত্তরা দক্ষিণ মেট্রো স্টেশনের নিচে গাড়িতে থাকা ছিনতাইকারীরা মুক্তার ব্যাগ ধরে টান দেয়। হ্যাঁচকা টানে রাস্তায় পড়ে গুরুতর আহত হন তিনি। কয়েকটি হাসপাতাল ঘুরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পর তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়।
এ ঘটনায় তুরাগ থানায় অজ্ঞাত কয়েকজনকে আসামি করে মামলা করেন তার স্বামী লিমন হোসেন। কিন্তু ঘটনার চার মাস পরও কাউকে শনাক্ত করতে পারেনি পুলিশ।
মামলাটি পরে ডিবিতে হস্তান্তর করা হয়। ডিবির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ছিনতাইয়ে ব্যবহৃত গাড়ির নম্বর পরিষ্কারভাবে দেখা না যাওয়ায় শনাক্তকরণে সমস্যা হয়েছে। তবে একটি মোবাইল নম্বরের সূত্র ধরে তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
অভিযোগ না করলে তথ্যও থাকে না পুলিশের কাছে
গত ৭ জুন ভোরে দিনাজপুরের পার্বতীপুর থেকে ঢাকায় ফেরার পথে ছিনতাইকারীর টানে রাস্তায় পড়ে গুরুতর আহত হন এসকেএফ ফার্মাসিউটিক্যালসের বিক্রয় কর্মকর্তা সোহেলী ইসলাম সোমা। ১১ জুন চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি।
ঘটনার পর কয়েক দিন থানায় কোনো মামলা বা অভিযোগ না থাকায় পুলিশও কোনো তথ্য দিতে পারেনি। পরে ১৩ জুন স্বজন মামলা করলে পরদিন নয়ন নামে একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
অপরাধ বিশেষজ্ঞের চোখে ‘সংঘবদ্ধ অপরাধ’
মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ওমর ফারুকের মতে, ছিনতাইয়ের ধরনে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে।
তার ভাষায়, আগে মাদকাসক্ত বা ছিন্নমূল মানুষের মধ্যে ছিনতাইয়ের প্রবণতা বেশি দেখা গেলেও এখন ভোর কিংবা সকালেও প্রকাশ্যে সংঘবদ্ধভাবে ছিনতাই হচ্ছে। এটি অনেক ক্ষেত্রে ‘অর্গানাইজড ক্রাইম’-এর রূপ নিয়েছে।
তার মতে, ছিনতাইকারীদের গ্রেপ্তারের পর জামিনে বেরিয়ে আবার অপরাধে জড়িয়ে পড়ার বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। একই সঙ্গে দেশের অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতাও অপরাধ বাড়ার একটি কারণ হতে পারে বলে মনে করেন তিনি।
প্রশ্ন একটাই—নিরাপদ ঢাকা কোথায়?
পুলিশের হিসাবে মামলা ও গ্রেপ্তারের সংখ্যা থাকলেও রাজধানীর রাস্তায় সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতা বলছে ভিন্ন কথা। ভোরে রিকশায় বের হওয়া থেকে শুরু করে রাতে বাসা ফেরার পথ—সবখানেই এখন সতর্ক থাকতে হচ্ছে নগরবাসীকে।
রনজিলা পারভিন, মুক্তা আক্তার কিংবা সোহেলী ইসলাম সোমার মতো মানুষের মৃত্যু শুধু একটি ছিনতাইয়ের মামলা নয়; এগুলো রাজধানীর নাগরিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার সামনে বড় প্রশ্নও তুলে দেয়।
ছিনতাইকারী ধরা পড়বে, মামলা হবে—এটাই স্বাভাবিক প্রত্যাশা। কিন্তু তার চেয়েও বড় প্রশ্ন, একজন সাধারণ মানুষ যেন রাস্তায় বের হয়ে ব্যাগ কিংবা মোবাইলের জন্য জীবন না হারান—সেই নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে কবে?

























