প্রথম দিনেই উত্তপ্ত সংসদ বিরোধী দলের ওয়াকআউট
তৃতীয় অধিবেশনের প্রথম দিনই গতকাল ব্যাপক হট্টগোলে জাতীয় সংসদ উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য নিয়ে এ হট্টগোলের সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে বিরোধী দল ওয়াকআউট করে। এদিন মন্ত্রী থেকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ায় মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সংসদের আসনে বসেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পাশের আসন এটি।
স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে সংসদের তৃতীয় অধিবেশন শুরু হয়। শুরুতে নেপালে প্রাকৃতিক দুর্যোগে নিহতদের পাশাপাশি সাবেক ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি, স্পিকার, মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করা হয়।
অধিবেশনের প্রশ্নোত্তর পর্বে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দেওয়া বক্তব্য নিয়ে আপত্তি জানান জামায়াত নেতৃত্বাধীন বিরোধীদলীয় এমপিরা। এ নিয়ে তীব্র হট্টগোলে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে অধিবেশন কক্ষ। সৃষ্টি হয় অচলাবস্থা। পরে স্পিকারের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিরসন হয়। এ সময় স্পিকার চলতি সংসদের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেন।
প্রশ্নোত্তর পর্বে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ ও শফিকুল ইসলাম মাসুদের প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ‘পল্টনের বক্তৃতা’ ও ‘শাহবাগ চত্বর নয়’ মন্তব্য করলে তার প্রতিবাদ জানান বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা। তারা দাঁড়িয়ে হই-হট্টগোল শুরু করেন। স্পিকার বারবার অনুরোধ করলেও তা আমলে না নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করতে থাকেন তারা।
এর আগে হাসনাত আবদুল্লাহ তার সম্পূরক প্রশ্নে গত ছয় মাসে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় গান-বাজনা ও নৌকাবাইচ বন্ধসহ বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরে জানতে চান, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে সফল হয়েছেন কি না এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় পর্যাপ্ত ভূমিকা রাখতে পেরেছেন কি না? জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘স্পিকার, এটা প্রশ্ন হলো, না পল্টনের বক্তৃতা হলো বুঝতে পারিনি।’ তিনি প্রশ্নে উল্লেখ করা বিভিন্ন অপরাধের পরিসংখ্যানের ভিত্তি নিয়েও প্রশ্ন তোলেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে কি না, তা দৃশ্যমান। সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সংঘটিত অপরাধের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। তিনি বলেন, কোনো নির্দিষ্ট ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ব্যর্থ হয়েছে, এমন উদাহরণ বিরোধী দলের সদস্যদের দিতে হবে। নির্দিষ্ট কোনো ঘটনা উল্লেখ করা হলে ৩০০ বিধিতে বক্তব্য দেওয়া যাবে।
এ সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের প্রতিবাদে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা নিজ নিজ আসন থেকে দাঁড়িয়ে হট্টগোল শুরু করেন। পরিস্থিতি শান্ত করতে স্পিকার বলেন, সংসদে কথা বলার স্বাধীনতা রয়েছে এবং যুক্তি দিয়ে একে অপরের বক্তব্য খণ্ডন করা যাবে। পরমতসহিষ্ণুতা না থাকলে গণতন্ত্র ব্যর্থ হবে।
বিরোধী দলের সদস্যদের প্রতিবাদকে সংসদীয় কার্যক্রমের পরিপন্থি বলে মন্তব্য করে স্পিকার বলেন, ‘এটা তো আওয়ামী লীগের আমল না। আপনারা তো ইচ্ছেমতো সরকারকে ক্রিটিসাইজ করতে পারছেন।’ এরপর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে বক্তব্য শেষ করার সুযোগ দেন স্পিকার।
এ সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আমার যে শব্দচয়নে উনাদের আপত্তি, সেটার জবাব আমি দিতে পারব। আপনারা সারা দিন দাঁড়িয়ে থাকতে পারলে আমিও পারব। যদি কথা বলতে না দেন, তাহলে কীসের বাকস্বাধীনতা?’ তিনি বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের মামলায় আসামি গ্রেপ্তার না হওয়ার বিষয়ে নির্দিষ্ট তথ্য দেওয়ার আহ্বান জানান। ‘হাওয়াইভাবে’ অভিযোগ না করে নির্দিষ্ট প্রশ্ন করার কথাও বলেন তিনি।
পরে ফ্লোর নিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের সমালোচনা করে বলেন, ‘আমরা তাঁর ছাত্র হওয়ার জন্য এখানে আসিনি। শিক্ষকতা করতে চাইলে ইউনিভার্সিটিতে গিয়ে করুক।’ তিনি বলেন, সংসদের প্রথম দিন থেকেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে কথা বলছেন। তাঁর বক্তব্য সংসদের কার্যপ্রণালি থেকে এক্সপাঞ্জ করার দাবি জানান তিনি এবং সংসদের মর্যাদা রক্ষায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ক্ষমা চাওয়ার দাবি তোলেন।
এদিকে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠায় স্পিকার বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা হবে। অসংসদীয় কোনো বক্তব্য থাকলে তা কার্যপ্রণালি থেকে এক্সপাঞ্জ করা হবে। তবে সংসদ হচ্ছে কথা বলার জায়গা। যুক্তির মাধ্যমে একে অপরের বক্তব্য খণ্ডন করতে হবে, কিন্তু কারও কথা বলার স্বাধীনতা হরণ করা যাবে না।
জ্বালানি সংকট, ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি নিয়ে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন স্বতন্ত্র সংসদ-সদস্য ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা। বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে তিনি বলেন, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির যে অবস্থা, তাতে ৬৪ জেলায় ৬৪ জন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী থাকলেও মন্দ হতো না।
বেসরকারি দিবসে সরকারি বিল উত্থাপনের প্রতিবাদে সংসদ থেকে ওয়াক আউট করেন জামায়াত-এনসিপি জোটের সদস্যরা। গতকাল রাত ৮টা ৫ মিনিটে আইন-প্রণয়ন কার্যাবলিতে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল এবং ট্রান্সফার অব প্রপার্টি বিল নামে তিনটি বিল উত্থাপনের প্রক্রিয়া শুরু হলে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান এ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
একই সঙ্গে সরকারের বিরুদ্ধে জুলাই জাতীয় সনদ, গণভোটের রায় না মানা, সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন না করাসহ বিভিন্ন অভিযোগ উত্থাপন করেন। সংসদ থেকে ওয়াক আউট করার সময়ে ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল তাদের সংসদে থাকার অনুরোধ জানিয়ে বলেন, আলাপ-আলোচনা না থাকলে সমস্যার সমাধান হবে কীভাবে?
বিরোধী দলের অনুপস্থিতিতে তিনটি বিল উত্থাপন করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ ও আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। পরে উত্থাপিত বিল তিনটি পরীক্ষানিরীক্ষা করে রিপোর্ট দেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে প্রেরণ করা হয়। বিল উত্থাপনের আগে সালাহউদ্দিন আহমেদ বিরোধী দলের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, আসুন আমরা এমন একটি সংসদ উপহার দিই। এখানেই আলোচনা করব, এখানেই বাহাস করব এবং এখানেই জনগণের প্রত্যাশা পূরণের জন্য কাজ করব।























