ঢাকা ০২:১৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬, ১৪ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

হুথিদের হামলায় মধ্যপ্রাচ্যে নতুন উত্তেজনা, কঠিন কূটনৈতিক সমীকরণে পাকিস্তান

নিজস্ব সংবাদ :

ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের সাম্প্রতিক হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যে আবারও উত্তেজনা বেড়েছে। এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে অস্বস্তিকর অবস্থানে পড়েছে পাকিস্তান। একদিকে দীর্ঘদিনের মিত্র সৌদি আরবের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, অন্যদিকে প্রতিবেশী ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক—দুইয়ের ভারসাম্য বজায় রাখা ইসলামাবাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে।

আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ পাকিস্তানকে এমন এক অবস্থানে নিয়ে এসেছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান বিরোধ আরও তীব্র হলে দেশটি সরাসরি আঞ্চলিক সংঘাতের প্রভাবের মুখে পড়তে পারে।

সৌদি-ইরান সমীকরণে বাড়ছে চাপ

কূটনৈতিক সূত্রগুলোর মতে, সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা প্রশমনে অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগে পাকিস্তান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। একই সময়ে গত বছর সৌদি আরবের সঙ্গে একটি পারস্পরিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর করে ইসলামাবাদ। সেই চুক্তির আওতায় বর্তমানে হাজারো পাকিস্তানি সেনাসদস্য ও যুদ্ধবিমান ইউনিট সৌদি আরবে দায়িত্ব পালন করছে।

ফলে সৌদি আরবের নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়লে পাকিস্তানের ওপরও চাপ তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

হুথিদের হামলার পর নতুন উদ্বেগ

চলতি সপ্তাহে হুথিদের নিয়ন্ত্রিত একটি বিমানবন্দরে সৌদি হামলার অভিযোগ ওঠার পর পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে হুথিরা। এতে কয়েক বছর ধরে কার্যকর থাকা যুদ্ধবিরতির পরিবেশ নড়বড়ে হয়ে পড়ে।

পাকিস্তানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, ইসলামাবাদের শীর্ষ রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্ব ইরানকে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে—সৌদি আরবের ওপর হামলাকে পাকিস্তান নিজেদের নিরাপত্তার জন্যও হুমকি হিসেবে বিবেচনা করবে।

পাকিস্তানি সেনাদের নিরাপত্তা নিয়েও শঙ্কা

সরকারি সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ইয়েমেন সীমান্তসংলগ্ন সৌদি অঞ্চলে পাকিস্তানি সেনা মোতায়েন রয়েছে। ফলে সংঘাত বিস্তৃত হলে তারাও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারেন।

বিশ্লেষকদের মতে, পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে সৌদি আরব পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় পাকিস্তানের কাছ থেকে সামরিক সহায়তা চাইতে পারে। তখন ইসলামাবাদের সামনে কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হবে।

মধ্যস্থতার ভূমিকাও হতে পারে জটিল

পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরে আঞ্চলিক কূটনীতিতে ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান ধরে রাখার চেষ্টা করছে। তবে বর্তমান সংকটে সেই ভূমিকা আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-এর মধ্যে নীতিগত পার্থক্য বাড়ছে। এই পরিবর্তনও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে ইসলামাবাদ।

এদিকে সাম্প্রতিক উত্তেজনার কারণে ইরানের একটি প্রতিনিধিদলের পাকিস্তান সফরও নির্ধারিত সময়ের তুলনায় পিছিয়ে যায়। পরে দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নেতৃত্বে প্রতিনিধিদল ইসলামাবাদ সফর করে এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা হয় বলে জানা গেছে।

জ্বালানি নিরাপত্তাও বড় উদ্বেগ

বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তানের উদ্বেগ শুধু নিরাপত্তা বা কূটনীতি নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে অর্থনীতি ও জ্বালানি সরবরাহও।

দেশটি মধ্যপ্রাচ্যের তেল ও গ্যাসের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। হরমুজ প্রণালিতে অস্থিরতা তৈরি হলে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে, যা পাকিস্তানের অর্থনীতিতে সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।

সংযমের আহ্বান

পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সব পক্ষকে সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছে। সরকারি অবস্থান অনুযায়ী, চলমান সংকটের সমাধানে সংলাপ ও কূটনীতির বিকল্প নেই।

তবে নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, যদি হুথিদের হামলা আরও বিস্তৃত হয় কিংবা সৌদি আরব সরাসরি সামরিক সহায়তা চায়, তাহলে পাকিস্তানকে নিরপেক্ষ অবস্থান ধরে রাখা কঠিন হয়ে যেতে পারে।

ইসলামাবাদের এক কূটনৈতিক সূত্রের ভাষায়, যুদ্ধ বন্ধ হওয়াই সবার জন্য সবচেয়ে ভালো সমাধান। কিন্তু সৌদি আরব আনুষ্ঠানিকভাবে সহায়তা চাইলে পাকিস্তান তার মিত্র দেশের পাশেই দাঁড়াবে—এমন সম্ভাবনাই বর্তমানে সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

আপলোডকারীর তথ্য

হুথিদের হামলায় মধ্যপ্রাচ্যে নতুন উত্তেজনা, কঠিন কূটনৈতিক সমীকরণে পাকিস্তান

আপডেট সময় ১২:০৫:৪০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬

ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের সাম্প্রতিক হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যে আবারও উত্তেজনা বেড়েছে। এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে অস্বস্তিকর অবস্থানে পড়েছে পাকিস্তান। একদিকে দীর্ঘদিনের মিত্র সৌদি আরবের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, অন্যদিকে প্রতিবেশী ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক—দুইয়ের ভারসাম্য বজায় রাখা ইসলামাবাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে।

আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ পাকিস্তানকে এমন এক অবস্থানে নিয়ে এসেছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান বিরোধ আরও তীব্র হলে দেশটি সরাসরি আঞ্চলিক সংঘাতের প্রভাবের মুখে পড়তে পারে।

সৌদি-ইরান সমীকরণে বাড়ছে চাপ

কূটনৈতিক সূত্রগুলোর মতে, সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা প্রশমনে অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগে পাকিস্তান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। একই সময়ে গত বছর সৌদি আরবের সঙ্গে একটি পারস্পরিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর করে ইসলামাবাদ। সেই চুক্তির আওতায় বর্তমানে হাজারো পাকিস্তানি সেনাসদস্য ও যুদ্ধবিমান ইউনিট সৌদি আরবে দায়িত্ব পালন করছে।

ফলে সৌদি আরবের নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়লে পাকিস্তানের ওপরও চাপ তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

হুথিদের হামলার পর নতুন উদ্বেগ

চলতি সপ্তাহে হুথিদের নিয়ন্ত্রিত একটি বিমানবন্দরে সৌদি হামলার অভিযোগ ওঠার পর পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে হুথিরা। এতে কয়েক বছর ধরে কার্যকর থাকা যুদ্ধবিরতির পরিবেশ নড়বড়ে হয়ে পড়ে।

পাকিস্তানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, ইসলামাবাদের শীর্ষ রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্ব ইরানকে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে—সৌদি আরবের ওপর হামলাকে পাকিস্তান নিজেদের নিরাপত্তার জন্যও হুমকি হিসেবে বিবেচনা করবে।

পাকিস্তানি সেনাদের নিরাপত্তা নিয়েও শঙ্কা

সরকারি সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ইয়েমেন সীমান্তসংলগ্ন সৌদি অঞ্চলে পাকিস্তানি সেনা মোতায়েন রয়েছে। ফলে সংঘাত বিস্তৃত হলে তারাও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারেন।

বিশ্লেষকদের মতে, পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে সৌদি আরব পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় পাকিস্তানের কাছ থেকে সামরিক সহায়তা চাইতে পারে। তখন ইসলামাবাদের সামনে কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হবে।

মধ্যস্থতার ভূমিকাও হতে পারে জটিল

পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরে আঞ্চলিক কূটনীতিতে ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান ধরে রাখার চেষ্টা করছে। তবে বর্তমান সংকটে সেই ভূমিকা আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-এর মধ্যে নীতিগত পার্থক্য বাড়ছে। এই পরিবর্তনও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে ইসলামাবাদ।

এদিকে সাম্প্রতিক উত্তেজনার কারণে ইরানের একটি প্রতিনিধিদলের পাকিস্তান সফরও নির্ধারিত সময়ের তুলনায় পিছিয়ে যায়। পরে দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নেতৃত্বে প্রতিনিধিদল ইসলামাবাদ সফর করে এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা হয় বলে জানা গেছে।

জ্বালানি নিরাপত্তাও বড় উদ্বেগ

বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তানের উদ্বেগ শুধু নিরাপত্তা বা কূটনীতি নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে অর্থনীতি ও জ্বালানি সরবরাহও।

দেশটি মধ্যপ্রাচ্যের তেল ও গ্যাসের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। হরমুজ প্রণালিতে অস্থিরতা তৈরি হলে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে, যা পাকিস্তানের অর্থনীতিতে সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।

সংযমের আহ্বান

পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সব পক্ষকে সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছে। সরকারি অবস্থান অনুযায়ী, চলমান সংকটের সমাধানে সংলাপ ও কূটনীতির বিকল্প নেই।

তবে নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, যদি হুথিদের হামলা আরও বিস্তৃত হয় কিংবা সৌদি আরব সরাসরি সামরিক সহায়তা চায়, তাহলে পাকিস্তানকে নিরপেক্ষ অবস্থান ধরে রাখা কঠিন হয়ে যেতে পারে।

ইসলামাবাদের এক কূটনৈতিক সূত্রের ভাষায়, যুদ্ধ বন্ধ হওয়াই সবার জন্য সবচেয়ে ভালো সমাধান। কিন্তু সৌদি আরব আনুষ্ঠানিকভাবে সহায়তা চাইলে পাকিস্তান তার মিত্র দেশের পাশেই দাঁড়াবে—এমন সম্ভাবনাই বর্তমানে সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে।