ভিডিও বিতর্কে জামায়াত থেকে বহিষ্কার এমপি গাজী নজরুল, সংসদ সদস্য পদ নিয়েও অনিশ্চয়তা
স্টাফ রিপোর্টার |
ব্যক্তিগত মুহূর্তের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার জেরে বড় ধরনের রাজনৈতিক সংকটে পড়েছেন সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম। দলীয় তদন্তে তাঁর বিরুদ্ধে ‘নৈতিক স্খলনের’ অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে দাবি করে তাঁকে দল থেকে বহিষ্কারের ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। একই সঙ্গে বিষয়টি নির্বাচন কমিশনকে (ইসি) জানানো হবে বলেও জানিয়েছে দলটি। এর ফলে এখন প্রশ্ন উঠেছে—তিনি সংসদ সদস্য পদে বহাল থাকতে পারবেন কি না।
বুধবার রাজধানীতে জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের জরুরি বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরে দলটির প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের পক্ষ থেকে জানানো হয়, সংগঠনের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ায় গাজী নজরুলের সদস্যপদ বাতিল করা হয়েছে।
তদন্তে কী পেল জামায়াত?
ভিডিও প্রকাশের পর খুলনা অঞ্চলের পরিচালক ইজ্জত উল্লাহর নেতৃত্বে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি গাজী নজরুল, তাঁর দুই স্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য গ্রহণ করে এবং একটি প্রতিবেদন কেন্দ্রে জমা দেয়।
দলীয় সূত্রের দাবি, তদন্তে দেখা গেছে, দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে পরিচয় দেওয়া ওই নারীর সঙ্গে বিয়ের আগেই একাধিকবার সাক্ষাৎ করেছেন গাজী নজরুল, যা দলীয় নীতিমালার পরিপন্থী। পাশাপাশি এ ঘটনায় দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এসব কারণেই শুধু সাংগঠনিক শাস্তি নয়, সরাসরি বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
ভিডিও নিয়ে কী বলছেন গাজী নজরুল?
ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর প্রথম দিকে জামায়াতের অনেক নেতা-কর্মী সেটিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি বলে দাবি করেন। তবে পরে গাজী নজরুল নিজেই ফেসবুকে জানান, ভিডিওতে থাকা নারী তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম বেগম। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, গত ১৭ জুন প্রথম স্ত্রীর সম্মতিতে পারিবারিকভাবে তাঁদের বিয়ে হয়েছে এবং ভাইরাল হওয়া ভিডিওগুলো বিয়ের পর ধারণ করা।
দলের একটি অংশের নেতারা আবার মনে করছেন, পুরো ঘটনায় গাজী নজরুল একটি ব্ল্যাকমেল চক্রেরও শিকার হয়েছেন।
এলাকাজুড়ে বিক্ষোভ
ঘটনার পর সাতক্ষীরার শ্যামনগরে গাজী নজরুলকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা, তাঁর সংসদ সদস্য পদ বাতিল এবং বিচার দাবিতে মানববন্ধন, বিক্ষোভ ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। স্থানীয় বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতাসহ জনপ্রতিনিধিরা অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং সত্য প্রমাণিত হলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
সংসদ সদস্য পদ কি থাকবে?
সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, কোনো সংসদ সদস্য দল ছেড়ে দিলে বা সংসদে দলের বিপক্ষে ভোট দিলে তাঁর আসন শূন্য হবে। তবে দল থেকে বহিষ্কার করা হলে আসন স্বয়ংক্রিয়ভাবে শূন্য হবে কি না, সে বিষয়ে সংবিধানে স্পষ্ট কোনো বিধান নেই।
অন্যদিকে ৬৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, নৈতিক স্খলনজনিত কোনো ফৌজদারি অপরাধে আদালতের রায়ে কমপক্ষে দুই বছরের সাজা হলে সংসদ সদস্য থাকার অযোগ্যতা তৈরি হয়। গাজী নজরুলের বিরুদ্ধে এমন কোনো আদালতের রায় না থাকায় শুধু দলীয় তদন্তের ভিত্তিতে তাঁর সংসদ সদস্য পদ বাতিলের সুযোগ নেই বলে আইন বিশেষজ্ঞদের একাংশের মত।
তবে বিষয়টি নির্বাচন কমিশনে গেলে কমিশনের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত হবে।
হত্যাচেষ্টার মামলাও দায়ের
এদিকে গাজী নজরুল ইসলামসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে রাজধানীর পল্লবী থানায় হত্যাচেষ্টার মামলা দায়ের করেছেন তাঁর ব্যক্তিগত গাড়িচালক ওবায়দুর রহমান। মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, একটি ভিডিও ফাঁসের ঘটনায় সন্দেহ করে তাঁর ওপর হামলা চালানো হয় এবং হত্যার চেষ্টা করা হয়।
পুলিশ ইতোমধ্যে মামলার এক আসামি আমিনুর রহমানকে গ্রেপ্তার করেছে। আদালত তাঁকে কারাগারে পাঠিয়ে আগামী ২৮ আগস্টের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দিয়েছেন।
রাজনৈতিক ও আইনি প্রশ্ন সামনে
জামায়াতের সিদ্ধান্তের পর গাজী নজরুল ইসলামের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ যেমন অনিশ্চয়তায় পড়েছে, তেমনি তাঁর সংসদ সদস্য পদ বহাল থাকবে কি না—সেটিও এখন নির্বাচন কমিশনের সম্ভাব্য সিদ্ধান্ত এবং সাংবিধানিক ব্যাখ্যার ওপর নির্ভর করছে। একই সঙ্গে ভিডিও বিতর্ক, দলীয় শাস্তি এবং ফৌজদারি মামলাকে ঘিরে ঘটনাটি দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

























