প্রাথমিক শিক্ষক বদলিতে বড় সংস্কার: বাদ ‘গণ্যমান্য ব্যক্তি’, যুক্ত হলো ৭ নতুন শর্ত
নিজস্ব সংবাদ :
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক বদলি ও পদায়ন প্রক্রিয়ায় ব্যাপক পরিবর্তন এনেছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। বিভিন্ন মহলের সমালোচনার পর বদলি কমিটি থেকে অস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা ‘গণ্যমান্য ব্যক্তি’ রাখার বিধান বাতিল করা হয়েছে। এর পরিবর্তে স্থানীয় পর্যায়ের কমিটিতে এখন থেকে বিদ্যোৎসাহী বা শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করা হবে। পাশাপাশি জাতীয় কমিটির নেতৃত্বেও পরিবর্তন আনা হয়েছে এবং শিক্ষক বদলিকে আরও স্বচ্ছ ও নিয়মতান্ত্রিক করতে সাতটি নতুন শর্ত সংযোজন করা হয়েছে।
মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, সাম্প্রতিক সময়ে শিক্ষক বদলিকে ঘিরে অনিয়ম ও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ সামনে আসে। বিশেষ করে রাজধানীসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যালয়ে প্রেষণ ও সংযুক্তির মাধ্যমে পদায়নের ক্ষেত্রে অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। এরপর সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে বদলি প্রক্রিয়াকে আরও জবাবদিহিমূলক ও বিকেন্দ্রীকরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
এরই ধারাবাহিকতায় উপজেলা, জেলা, বিভাগীয় ও জাতীয়—এই চার স্তরে বদলি কমিটি গঠন করা হলেও স্থানীয় কমিটিতে সভাপতির মনোনীত ‘গণ্যমান্য ব্যক্তি’ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়ে শিক্ষক সমাজ ও শিক্ষা প্রশাসনে ব্যাপক সমালোচনা দেখা দেয়। নীতিমালায় ‘গণ্যমান্য ব্যক্তি’ কারা, তা স্পষ্ট না থাকায় স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
সমালোচনার পর জারি হওয়া সংশোধিত নীতিমালায় ওই বিধান পরিবর্তন করে কমিটিতে দুজন করে বিদ্যোৎসাহী বা শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিকে অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। উপজেলা বা থানা পর্যায়ে কমিটির সভাপতি থাকবেন সংশ্লিষ্ট ইউএনও, জেলা পর্যায়ে জেলা প্রশাসক এবং বিভাগীয় পর্যায়ে বিভাগীয় কমিশনার।
জাতীয় কমিটির নেতৃত্বে পরিবর্তন
নতুন নীতিমালায় জাতীয় বদলি কমিটির সভাপতির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে (ডিজি)। আগে এই দায়িত্বে ছিলেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা সচিব। এছাড়া যুগ্ম সচিব (বিদ্যালয়) সদস্য এবং অধিদপ্তরের পরিচালক (পলিসি ও অপারেশন) সদস্যসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।
বদলিতে যুক্ত হলো ৭ নতুন শর্ত
শিক্ষক বদলি প্রক্রিয়াকে আরও সুশৃঙ্খল করতে নীতিমালায় সাতটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত যুক্ত করা হয়েছে। এগুলো হলো—
চাকরিতে অন্তত দুই বছর পূর্ণ না হলে বদলির আবেদন করা যাবে না এবং একবার বদলির পর তিন বছর না পেরোলে পুনরায় বদলির সুযোগ মিলবে না।
শুধুমাত্র শূন্য পদ থাকলে সেখানে বদলি করা যাবে।
সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের আবেদন ছাড়া সাধারণভাবে বদলি করা যাবে না। তবে জনস্বার্থ বা প্রশাসনিক প্রয়োজনে জাতীয় কমিটির অনুমোদন সাপেক্ষে বদলি করা যাবে।
যে বিদ্যালয়ে পাঁচজন বা তার কম শিক্ষক রয়েছেন কিংবা শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত ১:৪০-এর বেশি, সেখান থেকে শিক্ষক বদলি করা যাবে না।
একই বিদ্যালয় থেকে একাধিক আবেদন এলে জ্যেষ্ঠ শিক্ষককে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
একটি বিদ্যালয়ে সর্বোচ্চ তিনজন শিক্ষককে সংযুক্তির মাধ্যমে পদায়ন করা যাবে।
সব শর্ত পূরণ সাপেক্ষে নারী শিক্ষকদের স্থায়ী ঠিকানা বা স্বামীর কর্মস্থল/বাসস্থানের কাছাকাছি বিদ্যালয়ে বদলির ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
প্রতি মাসে বসবে বদলি কমিটি
সংশোধিত নীতিমালায় বলা হয়েছে, উপজেলা, জেলা, বিভাগীয় ও জাতীয় পর্যায়ের কমিটিগুলো প্রতি মাসে অন্তত একবার বৈঠক করবে। এসব বৈঠকে বদলির আবেদন যাচাই-বাছাই করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। একই উপজেলা, জেলা বা বিভাগের মধ্যে বদলি সংশ্লিষ্ট কমিটির মাধ্যমে নিষ্পত্তি হবে। আর আন্তঃবিভাগ ও সিটি করপোরেশন এলাকার বদলির সিদ্ধান্ত নেবে জাতীয় কমিটি। নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকদের লটারির মাধ্যমে পদায়নের দায়িত্ব আগের মতোই জেলা কমিটির ওপর থাকবে।
শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের মতে, সংশোধিত নীতিমালায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়ানোর যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে শিক্ষক বদলি নিয়ে দীর্ঘদিনের অনিয়ম, তদবির ও অভিযোগ অনেকটাই কমে আসতে পারে।