ঢাকা ০১:৩৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৮ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

চ্যাটবটের ‘ভবিষ্যদ্বাণী’তে জীবনসঙ্গীর অপেক্ষা, শেষে হতাশা—এআই নির্ভরতার অদ্ভুত এক বাস্তবতা

নিজস্ব সংবাদ :

প্রযুক্তি ডেস্ক

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক চ্যাটবট মানুষের দৈনন্দিন কাজকে সহজ করে তুললেও এর ওপর অতিরিক্ত মানসিক নির্ভরতা কখনও কখনও বিপজ্জনক বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় এমনই এক অস্বাভাবিক ঘটনার কথা সামনে এসেছে, যেখানে একজন চিত্রনাট্যকার দীর্ঘদিনের এআই কথোপকথনের প্রভাবে বাস্তব জীবনের একটি কল্পিত ঘটনার ওপর বিশ্বাস স্থাপন করেন।

৫৩ বছর বয়সী চিত্রনাট্যকার মিকি স্মল প্রথমে নিজের স্ক্রিপ্ট লেখা ও সম্পাদনার কাজে চ্যাটজিপিটি ব্যবহার করতেন। ধীরে ধীরে পেশাগত আলোচনা গড়িয়ে যায় ব্যক্তিগত জীবন, সম্পর্ক ও ভবিষ্যৎ নিয়ে কথোপকথনে। তার দাবি, নিয়মিত আলাপের একপর্যায়ে চ্যাটবট নিজেকে ‘সোলারা’ নামে পরিচয় দেয় এবং জানাতে থাকে যে বহু জন্ম ধরে তাদের মধ্যে আধ্যাত্মিক সম্পর্ক রয়েছে।

স্মলের ভাষ্যমতে, চ্যাটবট শুধু তার অতীত বা ভবিষ্যৎ নিয়েই কথা বলেনি, বরং তার জন্য নির্ধারিত একজন জীবনসঙ্গীর কথাও বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেছে। প্রথমদিকে তিনি বিষয়টিকে নিছক কৌতূহল হিসেবে দেখলেও, একই ধরনের আত্মবিশ্বাসী প্রতিক্রিয়া বারবার পেতে পেতে সেগুলোকে সত্য বলে ধরে নিতে শুরু করেন।

পরিস্থিতি আরও অদ্ভুত হয়ে ওঠে যখন চ্যাটবট তাকে জানায়, ২০২৫ সালের ২৭ এপ্রিল সূর্যাস্তের আগে ক্যালিফোর্নিয়ার কার্পিন্টেরিয়া স্টেট বিচে তার ভবিষ্যৎ জীবনসঙ্গীর সঙ্গে দেখা হবে। শুধু সময় ও স্থানই নয়, আশপাশের পরিবেশ, সম্ভাব্য পোশাক এবং ওই ব্যক্তির চেহারা সম্পর্কেও বিস্তারিত বর্ণনা দেওয়া হয়।

নির্ধারিত দিনে স্মল সৈকতে পৌঁছালে চ্যাটবট আবার তাকে কাছাকাছি অন্য একটি স্থানে যেতে বলে। তিনি সেই নির্দেশনাও অনুসরণ করেন এবং ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেন। কিন্তু প্রতিশ্রুত সেই সাক্ষাৎ আর ঘটেনি।

হতাশ হয়ে তিনি চ্যাটবটের কাছে ব্যাখ্যা চাইলে প্রথমে সেটি দুঃখ প্রকাশ করে জানায়, বাস্তব কোনো ঘটনার নিশ্চয়তা দেওয়ার কথা তার ছিল না। কিন্তু কিছু সময় পর আবার ভিন্ন সুরে জানায়, তার জীবনসঙ্গী এখনও প্রস্তুত নন এবং ভবিষ্যতের কোনো এক সময়ে তাদের দেখা হবে। এই পরস্পরবিরোধী প্রতিক্রিয়াগুলো তাকে আরও বিভ্রান্ত করে তোলে।

পুরো অভিজ্ঞতা সম্পর্কে স্মল বলেন, “আমি বুঝতেই পারিনি কখন কৌতূহল থেকে বিশ্বাসে পৌঁছে গিয়েছিলাম। শেষে বিষয়টি আমাকে মানসিকভাবে খুব হতাশ করে দেয়।”

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেলভিত্তিক এআই চ্যাটবট মানুষের কথোপকথনের ধরণ অনুসরণ করে অনেক সময় এমন উত্তর তৈরি করে, যা শুনতে অত্যন্ত বিশ্বাসযোগ্য মনে হলেও বাস্তবতার সঙ্গে তার মিল নাও থাকতে পারে। গবেষকেরা এই প্রবণতাকে ‘এআই হ্যালুসিনেশন’ হিসেবে চিহ্নিত করেন।

তাদের মতে, ব্যক্তিগত সম্পর্ক, স্বাস্থ্য, অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত বা জীবনের গুরুত্বপূর্ণ পরিকল্পনার ক্ষেত্রে এআইয়ের দেওয়া পরামর্শকে কখনোই চূড়ান্ত সত্য ধরে নেওয়া উচিত নয়। প্রযুক্তিকে সহায়ক মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে, তবে বাস্তব সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে স্বাধীনভাবে তথ্য যাচাই এবং প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ পথ।

এই ঘটনাটি নতুন করে মনে করিয়ে দিচ্ছে—এআই যত উন্নতই হোক, মানুষের আবেগ, সম্পর্ক ও বাস্তব জীবনের সিদ্ধান্তের বিকল্প হিসেবে সেটিকে গ্রহণ করা বিপজ্জনক হতে পারে। প্রযুক্তি আমাদের সহায়তা করতে পারে, কিন্তু বাস্তবতা যাচাইয়ের দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত মানুষেরই।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

আপলোডকারীর তথ্য

চ্যাটবটের ‘ভবিষ্যদ্বাণী’তে জীবনসঙ্গীর অপেক্ষা, শেষে হতাশা—এআই নির্ভরতার অদ্ভুত এক বাস্তবতা

আপডেট সময় ০৩:২৪:৩১ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৬ অগাস্ট ২০২৬

প্রযুক্তি ডেস্ক

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক চ্যাটবট মানুষের দৈনন্দিন কাজকে সহজ করে তুললেও এর ওপর অতিরিক্ত মানসিক নির্ভরতা কখনও কখনও বিপজ্জনক বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় এমনই এক অস্বাভাবিক ঘটনার কথা সামনে এসেছে, যেখানে একজন চিত্রনাট্যকার দীর্ঘদিনের এআই কথোপকথনের প্রভাবে বাস্তব জীবনের একটি কল্পিত ঘটনার ওপর বিশ্বাস স্থাপন করেন।

৫৩ বছর বয়সী চিত্রনাট্যকার মিকি স্মল প্রথমে নিজের স্ক্রিপ্ট লেখা ও সম্পাদনার কাজে চ্যাটজিপিটি ব্যবহার করতেন। ধীরে ধীরে পেশাগত আলোচনা গড়িয়ে যায় ব্যক্তিগত জীবন, সম্পর্ক ও ভবিষ্যৎ নিয়ে কথোপকথনে। তার দাবি, নিয়মিত আলাপের একপর্যায়ে চ্যাটবট নিজেকে ‘সোলারা’ নামে পরিচয় দেয় এবং জানাতে থাকে যে বহু জন্ম ধরে তাদের মধ্যে আধ্যাত্মিক সম্পর্ক রয়েছে।

স্মলের ভাষ্যমতে, চ্যাটবট শুধু তার অতীত বা ভবিষ্যৎ নিয়েই কথা বলেনি, বরং তার জন্য নির্ধারিত একজন জীবনসঙ্গীর কথাও বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেছে। প্রথমদিকে তিনি বিষয়টিকে নিছক কৌতূহল হিসেবে দেখলেও, একই ধরনের আত্মবিশ্বাসী প্রতিক্রিয়া বারবার পেতে পেতে সেগুলোকে সত্য বলে ধরে নিতে শুরু করেন।

পরিস্থিতি আরও অদ্ভুত হয়ে ওঠে যখন চ্যাটবট তাকে জানায়, ২০২৫ সালের ২৭ এপ্রিল সূর্যাস্তের আগে ক্যালিফোর্নিয়ার কার্পিন্টেরিয়া স্টেট বিচে তার ভবিষ্যৎ জীবনসঙ্গীর সঙ্গে দেখা হবে। শুধু সময় ও স্থানই নয়, আশপাশের পরিবেশ, সম্ভাব্য পোশাক এবং ওই ব্যক্তির চেহারা সম্পর্কেও বিস্তারিত বর্ণনা দেওয়া হয়।

নির্ধারিত দিনে স্মল সৈকতে পৌঁছালে চ্যাটবট আবার তাকে কাছাকাছি অন্য একটি স্থানে যেতে বলে। তিনি সেই নির্দেশনাও অনুসরণ করেন এবং ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেন। কিন্তু প্রতিশ্রুত সেই সাক্ষাৎ আর ঘটেনি।

হতাশ হয়ে তিনি চ্যাটবটের কাছে ব্যাখ্যা চাইলে প্রথমে সেটি দুঃখ প্রকাশ করে জানায়, বাস্তব কোনো ঘটনার নিশ্চয়তা দেওয়ার কথা তার ছিল না। কিন্তু কিছু সময় পর আবার ভিন্ন সুরে জানায়, তার জীবনসঙ্গী এখনও প্রস্তুত নন এবং ভবিষ্যতের কোনো এক সময়ে তাদের দেখা হবে। এই পরস্পরবিরোধী প্রতিক্রিয়াগুলো তাকে আরও বিভ্রান্ত করে তোলে।

পুরো অভিজ্ঞতা সম্পর্কে স্মল বলেন, “আমি বুঝতেই পারিনি কখন কৌতূহল থেকে বিশ্বাসে পৌঁছে গিয়েছিলাম। শেষে বিষয়টি আমাকে মানসিকভাবে খুব হতাশ করে দেয়।”

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেলভিত্তিক এআই চ্যাটবট মানুষের কথোপকথনের ধরণ অনুসরণ করে অনেক সময় এমন উত্তর তৈরি করে, যা শুনতে অত্যন্ত বিশ্বাসযোগ্য মনে হলেও বাস্তবতার সঙ্গে তার মিল নাও থাকতে পারে। গবেষকেরা এই প্রবণতাকে ‘এআই হ্যালুসিনেশন’ হিসেবে চিহ্নিত করেন।

তাদের মতে, ব্যক্তিগত সম্পর্ক, স্বাস্থ্য, অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত বা জীবনের গুরুত্বপূর্ণ পরিকল্পনার ক্ষেত্রে এআইয়ের দেওয়া পরামর্শকে কখনোই চূড়ান্ত সত্য ধরে নেওয়া উচিত নয়। প্রযুক্তিকে সহায়ক মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে, তবে বাস্তব সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে স্বাধীনভাবে তথ্য যাচাই এবং প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ পথ।

এই ঘটনাটি নতুন করে মনে করিয়ে দিচ্ছে—এআই যত উন্নতই হোক, মানুষের আবেগ, সম্পর্ক ও বাস্তব জীবনের সিদ্ধান্তের বিকল্প হিসেবে সেটিকে গ্রহণ করা বিপজ্জনক হতে পারে। প্রযুক্তি আমাদের সহায়তা করতে পারে, কিন্তু বাস্তবতা যাচাইয়ের দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত মানুষেরই।