কোটি টাকার ‘লন্ডনি বাড়ি’, তবু তালাবদ্ধ বছরের পর বছর—সিলেটজুড়ে নীরব প্রাসাদের গল্প
মনিরুজ্জামান মনির,প্রধান প্রতিবেদক
গ্রামের সবুজ প্রকৃতি, ধানক্ষেত আর আঁকাবাঁকা পথের মাঝখানে হঠাৎ চোখে পড়ে দৃষ্টিনন্দন অট্টালিকা। উঁচু প্রাচীর, আধুনিক নকশা, ঝকঝকে গেট—দূর থেকে দেখে মনে হবে যেন বিদেশের কোনো অভিজাত আবাসন। কিন্তু কাছে গেলেই ধরা পড়ে ভিন্ন চিত্র। গেটে তালা, জানালায় অন্ধকার, উঠানজুড়ে আগাছা। বছরের পর বছর মানুষের পদচারণা নেই। সিলেট অঞ্চলের বহু প্রবাসী পরিবারের এমন বাড়িগুলো স্থানীয়দের কাছে পরিচিত ‘লন্ডনি বাড়ি’ নামে।
সিলেটের বিয়ানীবাজার, গোলাপগঞ্জ, বিশ্বনাথ ও ওসমানীনগরের বিভিন্ন গ্রামে এমন শত শত নয়, বরং কয়েক হাজার বাড়ি ছড়িয়ে রয়েছে বলে স্থানীয়দের ধারণা। একসময় এসব বাড়ি ছিল প্রবাসজীবনের সফলতার প্রতীক, দেশে ফেরার স্বপ্ন আর পরিবারের জন্য নিরাপদ আশ্রয়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাস্তবতা বদলেছে। অধিকাংশ প্রবাসী বছরের বেশিরভাগ সময় বিদেশেই থাকেন। ফলে কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত বাড়িগুলো বছরের পর বছর তালাবদ্ধ পড়ে থাকে।

সরেজমিনে বিভিন্ন এলাকায় দেখা গেছে, অনেক বাড়ি শুধু ঈদ বা বিশেষ কোনো পারিবারিক অনুষ্ঠানে কয়েক দিনের জন্য খোলা হয়। এরপর আবার দীর্ঘ সময়ের জন্য বন্ধ হয়ে যায়। স্থানীয়দের মতে, এসব বাড়ির অনেকগুলো প্রয়োজনের চেয়ে সামাজিক মর্যাদার প্রতীক হিসেবেই নির্মিত হয়েছিল।
তবে প্রবাসীরা বিষয়টিকে ভিন্নভাবে দেখেন। তাদের ভাষায়, এসব বাড়ি শুধু ইট-পাথরের স্থাপনা নয়; বরং জন্মভূমির প্রতি ভালোবাসা, শিকড়ের টান এবং নিজের অস্তিত্বের স্মারক।
যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী বিয়ানীবাজারের বাসিন্দা বলেন, বিদেশে থাকলেও মন পড়ে থাকে নিজের গ্রামের মাটিতে। জীবনের শেষ ঠিকানা হিসেবে অনেকেই গ্রামে বাড়ি নির্মাণ করেন। এমনকি মৃত্যুর পর শেষবারের মতো নিজ বাড়িতে ফিরে আসার আকাঙ্ক্ষাও এই আবেগের অংশ। তাই এসব বাড়ি তাদের কাছে শুধু সম্পদ নয়, নিজের শিকড়ের প্রতীক।
অন্যদিকে, লন্ডনপ্রবাসী ওসমানীনগরের বাসিন্দাজাবের মিয়া মতে, নতুন প্রজন্মকে দেশের সঙ্গে যুক্ত রাখতেই অনেক পরিবার আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন বাড়ি তৈরি করছে। বিদেশে জন্ম নেওয়া সন্তানরা যেন দেশে এসে স্বাচ্ছন্দ্যে থাকতে পারে এবং গ্রামের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখে—এই চিন্তা থেকেই এমন বিনিয়োগ।
তবে স্থানীয়দের একাংশের মতে, দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় এসব বাড়ি ধীরে ধীরে অব্যবহৃত সম্পদে পরিণত হচ্ছে। পরিকল্পিত ব্যবহারের অভাবে এগুলো স্থানীয় অর্থনীতিতেও তেমন কোনো অবদান রাখতে পারছে না।
প্রবাসীদের অর্থে গড়ে ওঠা এসব বাড়ির বড় অংশ বছরের অধিকাংশ সময় খালি পড়ে থাকে। নিয়মিত ব্যবহার না থাকায় সম্পদের যথাযথ মূল্যও পাওয়া যাচ্ছে না।
এরই মধ্যে অনেক বাড়িতে অবহেলার ছাপ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। কোথাও দেয়ালে ফাটল, কোথাও রং উঠে গেছে, আবার কোথাও লোহার গেটে মরিচা ধরেছে। আগাছায় ভরে গেছে অনেক বাড়ির উঠান। স্থানীয়দের আশঙ্কা, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে কোটি টাকার এই স্থাপনাগুলোর অনেকই ধীরে ধীরে ক্ষয় হয়ে যাচ্ছে।
একসময় প্রবাসীদের স্বপ্ন, সাফল্য ও আত্মপরিচয়ের প্রতীক হিসেবে গড়ে ওঠা এসব ‘লন্ডনি বাড়ি’ আজ অনেক ক্ষেত্রেই নীরব স্মৃতিচিহ্ন হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আবেগের এই স্থাপনাগুলো ভবিষ্যতে কীভাবে আরও কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যায়, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
























