আজ রাতেই আকাশে ঝরে পড়বে আলোর উৎসব: খালি চোখে দেখা যেতে পারে পারসেইড উল্কাবৃষ্টি
অন্ধকার রাতের আকাশে হঠাৎ ছুটে যাওয়া আলোর রেখা মানুষকে সবসময়ই মুগ্ধ করে। সেই বিস্ময়কর দৃশ্যের অন্যতম জনপ্রিয় আয়োজন পারসেইড উল্কাবৃষ্টি। আজ বুধবার গভীর রাত থেকে বৃহস্পতিবার ভোর পর্যন্ত বাংলাদেশের আকাশে এই উল্কাবৃষ্টির মনোমুগ্ধকর দৃশ্য দেখা যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মতে, এ বছর পারসেইড পর্যবেক্ষণের পরিবেশ তুলনামূলক অনুকূলে। কারণ আজ অমাবস্যা, ফলে আকাশে চাঁদের আলো থাকবে না। চাঁদের উজ্জ্বলতা না থাকায় রাতের আকাশ আরও অন্ধকার থাকবে এবং উল্কাগুলো অনেক বেশি স্পষ্টভাবে চোখে পড়তে পারে।
কখন দেখা যেতে পারে?
আজ রাত মধ্যরাতের পর থেকে বৃহস্পতিবার ভোর ৫টা পর্যন্ত উল্কাবৃষ্টির সক্রিয়তা সবচেয়ে বেশি থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। আকাশ পরিষ্কার থাকলে এবং আশপাশে কৃত্রিম আলোর দূষণ কম থাকলে প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ১০০টি পর্যন্ত উল্কা দেখা যেতে পারে।
পারসেইড উল্কাবৃষ্টি মূলত পারসেয়াস নক্ষত্রমণ্ডল থেকে ছুটে আসছে বলে মনে হয়। উত্তর আকাশে ইংরেজি ‘W’ অক্ষরের মতো দেখতে ক্যাসিওপিয়া নক্ষত্রমণ্ডল খুঁজে পাওয়া গেলে তার কাছাকাছি পারসেয়াসের অবস্থান শনাক্ত করা সহজ হবে।
টেলিস্কোপ নয়, খালি চোখই যথেষ্ট
এই উল্কাবৃষ্টি উপভোগ করতে বিশেষ কোনো যন্ত্রের প্রয়োজন নেই। বরং খোলা মাঠ, ছাদ বা গ্রামাঞ্চলের অন্ধকার পরিবেশে খালি চোখে আকাশের বড় অংশ দেখা সবচেয়ে কার্যকর।
ভালোভাবে দেখার জন্য কয়েকটি বিষয় অনুসরণ করা যেতে পারে—
- শহরের উজ্জ্বল আলো থেকে দূরে থাকা,
- চাদর বিছিয়ে বা হেলান দেওয়া চেয়ারে আরাম করে শুয়ে থাকা,
- চোখকে অন্ধকারের সঙ্গে মানিয়ে নিতে অন্তত ৩০ মিনিট সময় দেওয়া,
- পর্যবেক্ষণের সময় মোবাইল ফোনের উজ্জ্বল স্ক্রিন ব্যবহার না করা।
‘ছুটন্ত তারা’ আসলে তারা নয়
আমরা যাকে সাধারণভাবে ছুটন্ত তারা বলি, তা আসলে কোনো তারা নয়। এগুলো মহাকাশে ভাসমান ছোট পাথর ও ধূলিকণার টুকরো, যাদের বলা হয় মেটিওরয়েড। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করার সময় প্রচণ্ড গতির ঘর্ষণে এগুলো উত্তপ্ত হয়ে জ্বলে ওঠে এবং আকাশে উজ্জ্বল আলোর রেখা তৈরি করে।
গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, পারসেইড উল্কার গতি ঘণ্টায় দুই লাখ কিলোমিটারেরও বেশি হতে পারে, যা এগুলোকে অত্যন্ত দ্রুতগতির মহাজাগতিক দৃশ্যে পরিণত করে।
পারসেইডের উৎস কোন ধূমকেতু?
এই উল্কাবৃষ্টির উৎস হলো ১০৯পি/সুইফট-টার্টল ধূমকেতু। ধূমকেতুটি সূর্যের চারপাশে ঘুরতে ঘুরতে মহাকাশে বিপুল পরিমাণ ধূলিকণা ছড়িয়ে যায়। পৃথিবী প্রতি বছর আগস্ট মাসে সেই ধূলিকণার অঞ্চলের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করে, আর তখনই দেখা দেয় পারসেইড উল্কাবৃষ্টি।
ধূমকেতুটি সর্বশেষ ১৯৯২ সালে সৌরজগতের অভ্যন্তরীণ অঞ্চলে দেখা গিয়েছিল এবং ২১২৬ সালের আগে এটি আবার সেখানে ফিরে আসবে না।
উজ্জ্বল ‘ফায়ারবল’ দেখারও সুযোগ
পারসেইড উল্কাবৃষ্টির সময় মাঝে মাঝে খুব উজ্জ্বল উল্কা দেখা যায়, যেগুলোকে ফায়ারবল বলা হয়। এগুলো সাধারণ উল্কার তুলনায় অনেক বেশি উজ্জ্বল এবং কখনও কখনও কয়েক সেকেন্ড পর্যন্ত দৃশ্যমান থাকে। মহাকাশে ধূলিকণার ঘনত্ব বেশি হলে এমন ফায়ারবল দেখার সম্ভাবনাও বাড়ে।
কেন এত জনপ্রিয় এই উল্কাবৃষ্টি?
পারসেইডের জনপ্রিয়তার বড় কারণ হলো এটি উত্তর গোলার্ধের গ্রীষ্মকালে দেখা যায়। শীতের তীব্র ঠান্ডায় দীর্ঘ সময় আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকা যেমন কষ্টকর, গ্রীষ্মের উষ্ণ রাতে তা অনেক বেশি আরামদায়ক। তাই আকাশপ্রেমী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ—সবার কাছেই পারসেইড একটি বিশেষ আকর্ষণের নাম।
আজ রাতের আকাশ যদি মেঘমুক্ত থাকে, তবে বাংলাদেশের আকাশেও দেখা মিলতে পারে প্রকৃতির এই অলৌকিক আলোর ঝরনা। শহরের কোলাহল থেকে একটু দূরে গিয়ে ধৈর্য নিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকলেই হয়তো দেখা মিলবে একের পর এক ছুটে চলা আলোর রেখার।

























