আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে দুদকে নতুন অভিযোগ, বিদেশে ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের দাবি
নিয়োগ-পদায়ন, টেন্ডার ও উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ; আগের অনুসন্ধানের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে নতুন অভিযোগগুলো
সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অর্থ লেনদেন ও বিদেশে অর্থপাচারসংক্রান্ত একাধিক নতুন অভিযোগ পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এসব অভিযোগের মধ্যে বিদেশে প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা পাচার, সরকারি বিভিন্ন পদে নিয়োগ ও পদায়নে অর্থ লেনদেন এবং উন্নয়ন প্রকল্পের টেন্ডার থেকে কমিশন নেওয়ার মতো অভিযোগ রয়েছে।
রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) দুদকের প্রধান কার্যালয়ে সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান সংস্থাটির জনসংযোগ বিভাগের সহকারী পরিচালক তানজির আহমেদ।
দুদকের নথি অনুযায়ী, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নিয়োগ, ঢাকা ওয়াসা, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) এবং গাজীপুর সিটি করপোরেশনে কর্মকর্তাদের নিয়োগ ঘিরে মোট ১৮৭ কোটি টাকা লেনদেনের অভিযোগ করা হয়েছে। পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন জেলায় ৩৬ জন জেলা প্রশাসক (ডিসি) নিয়োগ বা পদায়নের ক্ষেত্রে ২ কোটি থেকে ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত অর্থ লেনদেনের অভিযোগও রয়েছে।
এ ছাড়া স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের টেন্ডার, নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতে অনিয়মের অভিযোগ করা হয়েছে। গ্রামীণ অবকাঠামো ও সেতু নির্মাণ প্রকল্পের ব্যয় বাড়িয়ে অর্থ আত্মসাৎ এবং সায়েদাবাদ পানি শোধনাগর ও শেখ রাসেল মিনি স্টেডিয়াম প্রকল্পে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগও এসেছে দুদকের কাছে।
নিয়োগ ও পদায়নে কোটি কোটি টাকা লেনদেনের অভিযোগ
অভিযোগের তালিকায় সবচেয়ে বড় অঙ্কের অর্থ লেনদেনের কথা বলা হয়েছে বিভিন্ন সরকারি পদে নিয়োগকে ঘিরে।
দুদকের নথিতে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নিয়োগে প্রায় ৬০ কোটি টাকা লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। একইভাবে দেশের ৩৬ জন ডিসি পদায়নের ক্ষেত্রে প্রত্যেকের জন্য ২ কোটি থেকে ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত অর্থ লেনদেনের অভিযোগ করা হয়েছে।
ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে আব্দুস সালামকে নিয়োগ দেওয়ার বিনিময়ে ১০ কোটি টাকা ঘুষ নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। এলজিইডির সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মো. আব্দুর রশীদ খানকে নিয়োগে ৫২ কোটি এবং গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে আব্দুল লতিফ খানকে নিয়োগে ৬৫ কোটি টাকা নেওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে।
দুদকের নথিতে বলা হয়েছে, এসব অভিযোগের মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নিয়োগের ৬০ কোটি টাকাসহ চারটি নিয়োগকে ঘিরে মোট অভিযোগের অঙ্ক ১৮৭ কোটি টাকা।
টেন্ডার ও উন্নয়ন প্রকল্প নিয়েও অভিযোগ
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালনের সময় বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের টেন্ডার থেকে ১০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন নেওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, নারায়ণগঞ্জ ও কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের টেন্ডার কার্যক্রমেও সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে।
গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন ও সেতু নির্মাণ প্রকল্পের ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও এসেছে। এর মধ্যে কুমিল্লার মুরাদনগরে একটি গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পে ৪৫৩ কোটি টাকা বরাদ্দ ও অর্থ ছাড়ের প্রক্রিয়া নিয়েও অভিযোগে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
এ ছাড়া ঢাকা ওয়াসার সায়েদাবাদ পানি শোধনাগার প্রকল্পের তৃতীয় পর্যায়ে ব্যয় বৃদ্ধির অভিযোগ রয়েছে। শেখ রাসেল মিনি স্টেডিয়াম প্রকল্পের ব্যয় প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা বাড়িয়ে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও করা হয়েছে।
যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে নিয়োগ, বদলি এবং পদোন্নতির ক্ষেত্রেও বড় অঙ্কের অর্থ লেনদেনের অভিযোগ করা হয়েছে।
বিদেশে ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ
দুদকের কাছে করা অভিযোগে সবচেয়ে বড় অঙ্কের অর্থপাচারের যে তথ্য দেওয়া হয়েছে, তার পরিমাণ প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা।
অভিযোগ অনুযায়ী, দুবাইয়ে প্রায় ৪ হাজার ৫০০ কোটি, সিঙ্গাপুরে ৩ হাজার কোটি, অস্ট্রেলিয়ায় ২ হাজার কোটি এবং সুইজারল্যান্ডে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা পাচার করা হয়েছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, এসব অর্থের একটি অংশ বিদেশে জমা রাখা এবং সম্পদ কেনায় ব্যবহার করা হয়েছে।
পর্তুগালে জমি কেনা এবং দুবাইয়ের একটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগের পাশাপাশি সুইস ব্যাংকে অর্থ রাখার অভিযোগও করা হয়েছে।
এ ছাড়া আসিফ মাহমুদের দুই বোন জামাই ও এক ভাগ্নের মাধ্যমে বিদেশে অর্থ স্থানান্তরের অভিযোগ রয়েছে। তার বাবা বিল্লাল হোসেন এবং এপিএস মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধেও ঠিকাদারি সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ, স্থানীয় প্রশাসনে প্রভাব বিস্তার এবং অর্থ আদায়ের অভিযোগ করা হয়েছে।
অন্যদিকে পিও মাহফুজুল আলম ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে ঘুষ লেনদেনে তদবির এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ আনা হয়েছে।
বিলাসী জীবনযাপন ও রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যবহারের অভিযোগ
দুদকের অভিযোগে আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে হেলিকপ্টারে ভ্রমণের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয়, পাঁচ তারকা হোটেলে যাতায়াত, ব্যয়বহুল ফ্ল্যাটে বসবাস এবং দামি গাড়ি ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে।
আগের অনুসন্ধানের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে নতুন অভিযোগ
দুদক জানিয়েছে, আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে একটি অভিযোগের অনুসন্ধান আগে থেকেই চলমান রয়েছে। নতুন করে পাওয়া অভিযোগগুলোও ওই অনুসন্ধানের আওতায় এনে যাচাই-বাছাই ও তদন্ত করা হবে।
দুদকের জনসংযোগ বিভাগের সহকারী পরিচালক তানজির আহমেদের ভাষ্য অনুযায়ী, উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় নিয়োগ, পদায়ন, বদলি, পদোন্নতি এবং বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের টেন্ডারকে কেন্দ্র করে অর্থ লেনদেনের যেসব অভিযোগ এসেছে, সেগুলো অনুসন্ধানে গুরুত্ব দিয়ে দেখা হবে।
তবে দুদক স্পষ্ট করেছে, এসব অভিযোগ এখনো অনুসন্ধানাধীন। অভিযোগের কোনোটি এখনো প্রমাণিত হয়নি। অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য ও প্রমাণ পর্যালোচনার পরই এ বিষয়ে পরবর্তী আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
























