৪৯ বছরে বিএনপি, নেতৃত্বে তারেক রহমান—প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে নতুন প্রত্যয়ের ঘোষণা
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি আজ ৪৯ বছরে পা রাখছে। ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হাত ধরে প্রতিষ্ঠিত দলটি দীর্ঘ রাজনৈতিক পথপরিক্রমায় দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। নানা আন্দোলন, রাজনৈতিক সংঘাত, ক্ষমতার পালাবদল ও প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে এগিয়ে আসা বিএনপি এখন নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে।
১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর রাজধানীর রমনা এলাকায় এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে বিএনপি প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেওয়া হয়। সে সময় অল্প কয়েকটি চেয়ার ও একটি টেবিল ঘিরে সাংবাদিকদের সামনে দল গঠনের ঘোষণা দিয়েছিলেন জিয়াউর রহমান। পরবর্তী সময়ে ১৯ দফা কর্মসূচিকে সামনে রেখে দলটি দেশের রাজনীতিতে নিজেদের অবস্থান শক্ত করে।
প্রতিষ্ঠার কয়েক মাসের মধ্যেই ১৯৭৯ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে উল্লেখযোগ্য সাফল্য পায় বিএনপি। সময়ের সঙ্গে দলটির রাজনৈতিক দর্শন, সাংগঠনিক বিস্তার এবং জনসমর্থন আরও বাড়তে থাকে।
দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলা
বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান ১৯৮১ সালের ৩০ মে নিহত হওয়ার পর দলটি নানা চড়াই-উতরাইয়ের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি একাধিকবার সরকার গঠন করে। ১৯৯১ সালের নির্বাচনের পর খালেদা জিয়া প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হন। এরপর ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের রাজনৈতিক পালাবদলেও বিএনপি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বিশেষ করে ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট বড় ধরনের জয় পেয়ে সরকার গঠন করে। ২০০৬ সালে মেয়াদ শেষে তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের মধ্য দিয়ে ওই সরকারের পাঁচ বছরের শাসনকাল শেষ হয়।
এরপর ওয়ান-ইলেভেনের রাজনৈতিক পরিবর্তনের সময় বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বকে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া এবং তারেক রহমানও কারাবন্দি হন। পরবর্তী সময়ে চিকিৎসার জন্য তারেক রহমান দীর্ঘদিন দেশের বাইরে অবস্থান করেন।
তারেক রহমানের নেতৃত্বে সাংগঠনিক পুনর্গঠন
২০১৮ সালে খালেদা জিয়া কারাগারে যাওয়ার পর দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেন তারেক রহমান। দেশের বাইরে অবস্থান করেও তিনি ভার্চুয়াল যোগাযোগের মাধ্যমে দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখেন এবং সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনায় দিকনির্দেশনা দেন।
বিএনপির দাবি, গত কয়েক বছরে গণতন্ত্র, ভোটাধিকার ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে তাদের ধারাবাহিক আন্দোলন দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছে। ২০২৪ সালের নির্বাচনে অংশ না নিয়ে নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্তও নেয় দলটি।
পরবর্তীতে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের রাজনীতিতে বড় পরিবর্তন আসে। বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা নতুন রাজনৈতিক পরিবেশে সক্রিয় হয়ে ওঠেন।
এরপর জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি বড় ধরনের জয় পেয়ে সরকার গঠন করে। তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর দলটির সামনে এখন নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন এবং রাষ্ট্র পরিচালনার বড় দায়িত্ব রয়েছে।
খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে শোকের ছায়া
বিএনপির দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাসে খালেদা জিয়ার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দলের চেয়ারপারসন হিসেবে তিনি দীর্ঘদিন বিএনপিকে নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং একাধিকবার সরকারপ্রধানের দায়িত্ব পালন করেছেন।
দীর্ঘ কারাবাস ও অসুস্থতার পর উন্নত চিকিৎসা নেওয়ার জন্য দেশ-বিদেশে চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি। শেষ পর্যন্ত গত বছরের ৩০ ডিসেম্বর ভোরে মৃত্যুবরণ করেন খালেদা জিয়া। তার মৃত্যুর পর অনুষ্ঠিত জানাজায় বিপুলসংখ্যক মানুষের উপস্থিতি দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয়।
দলটির নেতাকর্মীরা মনে করেন, খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার এখন তারেক রহমানের নেতৃত্বে এগিয়ে যাচ্ছে।
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে পাঁচ দিনের কর্মসূচি
বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে দলটি পাঁচ দিনব্যাপী কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। কর্মসূচির প্রথম দিন আজ ১ সেপ্টেম্বর সকাল ৬টায় নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়সহ সারা দেশের দলীয় কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলন করা হবে।
সকাল ৯টায় বিএনপির শীর্ষ নেতারা দলের প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করবেন। একই সঙ্গে দলের প্রয়াত চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সমাধিতেও ফাতেহা পাঠ ও পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হবে।
আগামী ৫ সেপ্টেম্বর রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ মিলনায়তনে বিএনপির প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য ও রাজনৈতিক তাৎপর্য নিয়ে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের।
এ ছাড়া প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে বৃক্ষরোপণ এবং মাছ অবমুক্তকরণসহ বিভিন্ন সামাজিক ও সাংগঠনিক কর্মসূচিও নেওয়া হয়েছে।
জনগণের আস্থা ধরে রাখাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ
প্রতিষ্ঠার ৪৯তম বছরে এসে বিএনপির সামনে যেমন রাজনৈতিক সাফল্যের নতুন অধ্যায়, তেমনি রয়েছে বড় দায়িত্বও। দীর্ঘদিন বিরোধী রাজনীতিতে থাকা দলটি এখন রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে। ফলে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ, সুশাসন নিশ্চিত করা, জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা এবং নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নই দলটির জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর বার্তায় বিএনপি জানিয়েছে, জনগণের আস্থা ও ভালোবাসার মর্যাদা দিতে তারা একটি জবাবদিহিমূলক ও জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় কাজ করতে চায়। ৪৯তম বছরে প্রবেশের এই সময়ে দলটির লক্ষ্য এখন রাজনৈতিক ইতিহাসের অর্জন ধরে রেখে রাষ্ট্র পরিচালনায় নিজেদের সক্ষমতা প্রমাণ করা।
























