ঢাকা ১০:১০ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৮ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বিক্রমপুরের সূর্যসন্তান ব্রজেন দাস: ইংলিশ চ্যানেল জয় করে বাঙালির বিশ্বজয়

নিজস্ব সংবাদ :

মুন্সিগঞ্জের বিক্রমপুর বহু গৌরবের জনপদ। ইতিহাস, সংস্কৃতি ও জ্ঞানচর্চার পাশাপাশি এই অঞ্চল জন্ম দিয়েছে এমন এক বীরকে, যিনি উত্তাল সমুদ্রের ঢেউকে জয় করে বিশ্বমঞ্চে উড়িয়ে দিয়েছেন বাঙালির সাফল্যের পতাকা। তিনি ব্রজেন দাস— প্রথম এশীয় যিনি ইংলিশ চ্যানেল অতিক্রম করে ইতিহাসে নিজের নাম স্বর্ণাক্ষরে লিখেছিলেন।

আজ তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হচ্ছে এই কিংবদন্তি সাঁতারুকে।


কুচিয়ামোড়া থেকে বিশ্বমঞ্চ

সিরাজদিখান উপজেলার কুচিয়ামোড়া গ্রামে জন্ম নেওয়া ব্রজেন দাস ছোটবেলা থেকেই নদীমাতৃক পরিবেশে বেড়ে ওঠেন। পদ্মা ও ধলেশ্বরীর স্রোত যেন তাঁর মননে গড়ে তুলেছিল অদম্য সাহস আর অসীম সহনশীলতা।

১৯৫৮ সালে তিনি প্রথমবার ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দেন। সেই সাফল্য শুধু ব্যক্তিগত অর্জন ছিল না; এটি ছিল সমগ্র বাঙালি জাতির জন্য এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। পরে আরও পাঁচবার চ্যানেল অতিক্রম করে তিনি বিশ্বসাঁতারের ইতিহাসে অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে যান।


বিশ্ববরেণ্যদের প্রশংসায় ব্রজেন দাস

তাঁর কৃতিত্ব আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছিল। বিভিন্ন সময় বিশ্বনেতা ও খ্যাতিমান ব্যক্তিত্বরা তাঁর সাফল্যের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন।

  •  শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর সাফল্যকে বাঙালির গৌরব হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন।
  • মোহাম্মদ আলী তাঁকে ‘চ্যানেলের রাজা’ বলে সম্মান জানিয়েছিলেন।
  • রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথ তাঁর অসাধারণ অর্জনের জন্য অভিনন্দন জানিয়েছিলেন।
  • জওহরলাল নেহেরু বলেছিলেন, এই সাফল্য জাতি ও সীমান্তের গণ্ডি ছাড়িয়ে সবার গর্ব।
  • অমিতাভ বচ্চন তাঁর অটোগ্রাফ সংগ্রহ করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে দেখানোর ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন।
  • তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর লে. জে. আজম খান তাঁকে আখ্যা দিয়েছিলেন— ‘বাংলার বাঘ’

শুধু সাঁতারু নন, এক অনুপ্রেরণার প্রতীক

ব্রজেন দাসের জীবনসংগ্রাম প্রমাণ করে, সীমিত সুযোগ-সুবিধা থাকলেও দৃঢ় মনোবল ও কঠোর পরিশ্রম মানুষকে বিশ্বসেরার কাতারে নিয়ে যেতে পারে। তিনি ছিলেন আত্মবিশ্বাস, অধ্যবসায় ও দেশপ্রেমের এক উজ্জ্বল উদাহরণ।

বিক্রমপুরের ঐতিহ্যের সঙ্গে তাঁর নাম আজ অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে। তাঁর সাফল্য নতুন প্রজন্মকে স্বপ্ন দেখতে শেখায়— বাংলাদেশের প্রত্যন্ত গ্রাম থেকেও বিশ্বজয়ের গল্প লেখা সম্ভব।


অম্লান থাকবে তাঁর স্মৃতি

আজ ব্রজেন দাসকে স্মরণ করা মানে শুধু একজন কিংবদন্তি সাঁতারুকে স্মরণ করা নয়; এটি বাঙালির আত্মমর্যাদা, সাহস এবং অদম্য স্পৃহাকে স্মরণ করা।

বিক্রমপুরের এই গর্বিত সন্তান আমাদের ইতিহাসে চিরকাল উজ্জ্বল হয়ে থাকবেন। তাঁর লড়াই, তাঁর স্বপ্ন এবং তাঁর বিশ্বজয়ের কাহিনি আগামী প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করে যাবে অনন্তকাল।

শ্রদ্ধাঞ্জলি, ব্রজেন দাস— বাংলার অদম্য জয়ের প্রতীক।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

আপলোডকারীর তথ্য

বিক্রমপুরের সূর্যসন্তান ব্রজেন দাস: ইংলিশ চ্যানেল জয় করে বাঙালির বিশ্বজয়

আপডেট সময় ০৩:২৫:৫৯ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৫ অগাস্ট ২০২৬

মুন্সিগঞ্জের বিক্রমপুর বহু গৌরবের জনপদ। ইতিহাস, সংস্কৃতি ও জ্ঞানচর্চার পাশাপাশি এই অঞ্চল জন্ম দিয়েছে এমন এক বীরকে, যিনি উত্তাল সমুদ্রের ঢেউকে জয় করে বিশ্বমঞ্চে উড়িয়ে দিয়েছেন বাঙালির সাফল্যের পতাকা। তিনি ব্রজেন দাস— প্রথম এশীয় যিনি ইংলিশ চ্যানেল অতিক্রম করে ইতিহাসে নিজের নাম স্বর্ণাক্ষরে লিখেছিলেন।

আজ তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হচ্ছে এই কিংবদন্তি সাঁতারুকে।


কুচিয়ামোড়া থেকে বিশ্বমঞ্চ

সিরাজদিখান উপজেলার কুচিয়ামোড়া গ্রামে জন্ম নেওয়া ব্রজেন দাস ছোটবেলা থেকেই নদীমাতৃক পরিবেশে বেড়ে ওঠেন। পদ্মা ও ধলেশ্বরীর স্রোত যেন তাঁর মননে গড়ে তুলেছিল অদম্য সাহস আর অসীম সহনশীলতা।

১৯৫৮ সালে তিনি প্রথমবার ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দেন। সেই সাফল্য শুধু ব্যক্তিগত অর্জন ছিল না; এটি ছিল সমগ্র বাঙালি জাতির জন্য এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। পরে আরও পাঁচবার চ্যানেল অতিক্রম করে তিনি বিশ্বসাঁতারের ইতিহাসে অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে যান।


বিশ্ববরেণ্যদের প্রশংসায় ব্রজেন দাস

তাঁর কৃতিত্ব আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছিল। বিভিন্ন সময় বিশ্বনেতা ও খ্যাতিমান ব্যক্তিত্বরা তাঁর সাফল্যের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন।

  •  শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর সাফল্যকে বাঙালির গৌরব হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন।
  • মোহাম্মদ আলী তাঁকে ‘চ্যানেলের রাজা’ বলে সম্মান জানিয়েছিলেন।
  • রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথ তাঁর অসাধারণ অর্জনের জন্য অভিনন্দন জানিয়েছিলেন।
  • জওহরলাল নেহেরু বলেছিলেন, এই সাফল্য জাতি ও সীমান্তের গণ্ডি ছাড়িয়ে সবার গর্ব।
  • অমিতাভ বচ্চন তাঁর অটোগ্রাফ সংগ্রহ করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে দেখানোর ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন।
  • তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর লে. জে. আজম খান তাঁকে আখ্যা দিয়েছিলেন— ‘বাংলার বাঘ’

শুধু সাঁতারু নন, এক অনুপ্রেরণার প্রতীক

ব্রজেন দাসের জীবনসংগ্রাম প্রমাণ করে, সীমিত সুযোগ-সুবিধা থাকলেও দৃঢ় মনোবল ও কঠোর পরিশ্রম মানুষকে বিশ্বসেরার কাতারে নিয়ে যেতে পারে। তিনি ছিলেন আত্মবিশ্বাস, অধ্যবসায় ও দেশপ্রেমের এক উজ্জ্বল উদাহরণ।

বিক্রমপুরের ঐতিহ্যের সঙ্গে তাঁর নাম আজ অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে। তাঁর সাফল্য নতুন প্রজন্মকে স্বপ্ন দেখতে শেখায়— বাংলাদেশের প্রত্যন্ত গ্রাম থেকেও বিশ্বজয়ের গল্প লেখা সম্ভব।


অম্লান থাকবে তাঁর স্মৃতি

আজ ব্রজেন দাসকে স্মরণ করা মানে শুধু একজন কিংবদন্তি সাঁতারুকে স্মরণ করা নয়; এটি বাঙালির আত্মমর্যাদা, সাহস এবং অদম্য স্পৃহাকে স্মরণ করা।

বিক্রমপুরের এই গর্বিত সন্তান আমাদের ইতিহাসে চিরকাল উজ্জ্বল হয়ে থাকবেন। তাঁর লড়াই, তাঁর স্বপ্ন এবং তাঁর বিশ্বজয়ের কাহিনি আগামী প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করে যাবে অনন্তকাল।

শ্রদ্ধাঞ্জলি, ব্রজেন দাস— বাংলার অদম্য জয়ের প্রতীক।