এক বছর পরও মাইলস্টোনের সেই বিকেল তাড়া করে ফেরে— বিমানের শব্দেই জেগে ওঠে দুঃস্বপ্ন
নিজস্ব সংবাদ :
কেউ হারিয়েছে প্রিয় বন্ধু, কেউ এখনও বহন করছে পোড়া ক্ষতচিহ্ন, আর শিক্ষকদের চোখে ভাসে সহকর্মীদের শেষ মুহূর্ত— সময় পেরোলেও ২১ জুলাইয়ের ট্র্যাজেডি মুছে যায়নি।
স্কুলের ছুটির ঘণ্টা বাজলেই আবারও প্রাণ ফিরে পায় মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের মাঠ। শিশুরা ছুটে বেড়ায়, ক্লাস শেষে হাসিমুখে বাড়ি ফেরে। কিন্তু মাথার ওপর দিয়ে যখনই বিকট শব্দ তুলে কোনো বিমান উড়ে যায়, তখনই অনেকের মনে ফিরে আসে এক বছর আগের সেই বিভীষিকাময় বিকেল।
২০২৫ সালের ২১ জুলাই রাজধানীর উত্তরার দিয়াবাড়িতে অবস্থিত মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিমানবাহিনীর একটি প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনায় বহু প্রাণ ঝরে যায়। সেই দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে যাওয়া শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের জীবনে আজও রয়ে গেছে গভীর মানসিক ক্ষত।
বোনকে খুঁজে পাওয়ার অপেক্ষা ছিল সবচেয়ে দীর্ঘ সময়
অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী নিলয় আল নাফির জন্য সেই দিনের সবচেয়ে ভয়াবহ স্মৃতি ছিল ছোট বোনকে খুঁজে না পাওয়া। দুর্ঘটনার সময় তার বোন অতিরিক্ত ক্লাসে ভবনের ভেতরে ছিল, আর নাফি বাইরে মায়ের সঙ্গে অপেক্ষা করছিল।
হঠাৎ বিকট শব্দ, তারপর বিস্ফোরণ। মুহূর্তেই আগুনে ঢেকে যায় ভবনের একটি অংশ। আতঙ্কিত মা-ছেলে ছুটে যান স্কুলের ভেতরে। কোথাও বোনের সন্ধান নেই। পরে প্রায় এক ঘণ্টা পর স্কুল গেটের কাছে তাকে জীবিত অবস্থায় খুঁজে পান তারা।
নাফির ভাষ্য, দুর্ঘটনার পর তার বোন দীর্ঘদিন আতঙ্কে ছিল। রাতে একা ঘুমাতে পারত না, সব সময় মায়ের কাছাকাছি থাকতে চাইত। ধীরে ধীরে সে স্বাভাবিক জীবনে ফিরেছে।
ক্ষত শুকিয়েছে, কিন্তু স্মৃতি নয়
বর্তমানে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী রুবাইদা নূর আলভীরা দুর্ঘটনার সময় ছিল সেই ভবনের ভেতরেই। আগুনে দগ্ধ হয়ে দীর্ঘ দুই মাসের বেশি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হয়েছে তাকে। এখনও মুখ ও শরীরে রয়ে গেছে পোড়ার দাগ।
আলভীরা জানায়, শারীরিকভাবে অনেকটাই সুস্থ হলেও সেই দিনের স্মৃতি কখনও মুছে যাবে না। হাসপাতাল থেকে বাসায় ফেরার পর বারবার ঘটনাটি মনে পড়ত। এখন সে আবার নিয়মিত স্কুলে আসে, তবে হারিয়ে যাওয়া বন্ধুদের কথা এখনও ভুলতে পারেনি।
বিশেষ করে সহপাঠী আয়মানের কথা মনে পড়লেই মন ভার হয়ে যায় তার।
বন্ধুর হাত ছেড়ে মৃত্যুর মুখোমুখি
আরেক শিক্ষার্থী আশরিফা জান্নাত রাইসা দুর্ঘটনার সময় ভবনের নিচতলায় এক বান্ধবীর হাত ধরে হাঁটছিল। আচমকা বিকট শব্দে কেঁপে ওঠে পুরো ভবন। ধাক্কায় মাটিতে পড়ে যাওয়ার পর আর খুঁজে পায়নি সেই বন্ধুকে।
আগুনের মধ্য দিয়ে কোনোভাবে বাইরে বেরিয়ে এসে রাইসা দেখতে পায় চারদিকে ধ্বংসস্তূপ আর হতাহত মানুষের দৃশ্য। সেই অভিজ্ঞতা এখনও তাকে তাড়া করে।
দুর্ঘটনায় তার দুই হাত পুড়ে যায়। চিকিৎসা শেষে স্কুলে ফিরলেও এখনও বিশেষ গ্লাভস ব্যবহার করতে হয়।
ভয় কাটাতে ছিল দীর্ঘ কাউন্সেলিং
দুর্ঘটনার পর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল শিশুদের মানসিকভাবে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা। এ কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন স্কুলের শিক্ষকরা।
তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণির বাংলা মাধ্যমের সমন্বয়কারী আজমেরি বেগম জানান, দুর্ঘটনার পর শিশুদের মধ্যে আতঙ্ক, অনিদ্রা ও মানসিক অস্থিরতা দেখা দেয়। এজন্য স্কুল কর্তৃপক্ষ অভিভাবকদের সহযোগিতায় ধাপে ধাপে কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করে।
শ্রেণিভিত্তিক এবং ব্যক্তিগত কাউন্সেলিংয়ের পাশাপাশি সরকারি উদ্যোগেও চিকিৎসা ও মানসিক সহায়তা দেওয়া হয়। টানা কয়েক মাস নিয়মিত সেশন পরিচালনার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের আবারও স্বাভাবিক শিক্ষাজীবনে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হয়।
একটি দিন, যা বদলে দিয়েছে বহু জীবনের গল্প
২০২৫ সালের ২১ জুলাইয়ের সেই দুর্ঘটনায় মোট ৩৬ জন প্রাণ হারান। নিহতদের মধ্যে ২৮ জনই ছিলেন শিক্ষার্থী। এছাড়া নিহত হন যুদ্ধবিমানটির পাইলট ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মো. তৌকির ইসলাম।
এক বছর পেরিয়ে গেলেও মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে প্রতিটি বিমানের শব্দ যেন স্মরণ করিয়ে দেয় সেই কালো বিকেলের কথা। জীবনের ছন্দ ফিরেছে, ক্লাস চলছে, মাঠে খেলছে শিশুরা— কিন্তু অনেকের হৃদয়ে এখনও অমলিন হয়ে আছে ২১ জুলাইয়ের সেই বেদনাময় স্মৃতি।