সাঈদীর পক্ষে সাক্ষ্য দিতে গিয়ে নিখোঁজ: সুখরঞ্জন বালী গুম মামলায় সাবেক এএসপি গ্রেপ্তার
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জামায়াতে ইসলামীর নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর পক্ষে সাক্ষ্য দিতে এসে নিখোঁজ হওয়া সুখরঞ্জন বালীকে গুমের অভিযোগে সাবেক এক সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) ফজলুর রহমানকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। বৃহস্পতিবার রাতে রাজধানীর নিজ বাসা থেকে তাকে আটক করা হয়। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম।
পিরোজপুরের বাসিন্দা সুখরঞ্জন বালী ২০১২ সালের ৫ নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিতে গিয়ে আদালত প্রাঙ্গণ থেকে নিখোঁজ হন। সে সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিল, তাকে সীমান্ত এলাকায় পাওয়া গেছে। তবে শুরু থেকেই তার পরিবার ও বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন অভিযোগ করে আসছিল, আদালত এলাকা থেকেই তাকে তুলে নেওয়া হয়েছিল। ঘটনাটি সে সময় দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
২০২৫ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর একই বছরের ২১ আগস্ট ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর কার্যালয়ে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করেন সুখরঞ্জন বালী। অভিযোগে তিনি দাবি করেন, সাঈদীর বিরুদ্ধে মিথ্যা সাক্ষ্য দিতে অস্বীকৃতি জানানো এবং পরে তার পক্ষে সাক্ষ্য দিতে সম্মত হওয়ার কারণেই তাকে গুম করে দীর্ঘ সময় নির্যাতন করা হয়েছিল।
ওই অভিযোগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক চেয়ারম্যান বিচারপতি নিজামুল হক নাসিম, সাবেক আইনমন্ত্রী শফিক আহমেদ, সাবেক আইন প্রতিমন্ত্রী কামরুল ইসলাম, সাবেক বিচারক এ টি এম ফজলে কবির, সাবেক তদন্ত কর্মকর্তা হেলাল উদ্দিন এবং সাবেক সংসদ সদস্য এ কে এম আউয়ালসহ মোট ৩২ জনের নাম উল্লেখ করা হয়। পাশাপাশি অজ্ঞাতনামা আরও ১০ থেকে ১৫ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
অভিযোগে সুখরঞ্জন বালী বলেন, ২০১০ সালে ট্রাইব্যুনালের তৎকালীন তদন্ত কর্মকর্তা হেলাল উদ্দিন তাকে ডেকে তার ভাই বিশাবালীর হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে জানতে চান। তিনি জানান, তার ভাই পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে নিহত হন। কিন্তু তাকে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর নাম জড়াতে চাপ দেওয়া হয়। এতে রাজি না হওয়ায় তাকে শারীরিকভাবে নির্যাতন করা হয়েছিল বলে দাবি করেন তিনি।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, পরে সাঈদীর ছেলে মাসুদ সাঈদী প্রকৃত ঘটনা তুলে ধরতে ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দেওয়ার অনুরোধ করেন। সেই অনুরোধে আদালতে উপস্থিত হলেও প্রবেশমুখ থেকেই তাকে আটক করে চোখ ও হাত বেঁধে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়।
সুখরঞ্জন বালীর অভিযোগ, কয়েক মাস ধরে তাকে বিভিন্ন স্থানে আটকে রেখে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হয়। একপর্যায়ে সীমান্ত এলাকায় নিয়ে গিয়ে তাকে ভারতের ভূখণ্ডে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। পরে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর হাতে আটক হয়ে তিনি প্রথমে বশিরহাট সাবজেল এবং পরে দমদম কেন্দ্রীয় কারাগারে ছিলেন।
তিনি আরও দাবি করেন, কারাবন্দি অবস্থায় আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার প্রতিনিধিরা তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে নির্যাতনের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করেন। দেশে ফিরে নিরাপত্তাজনিত আশঙ্কায় তিনি নিজ জেলা পিরোজপুরে না গিয়ে অন্যত্র আত্মগোপনে বসবাস করছেন।
সুখরঞ্জন বালীর অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এ ঘটনায় সাবেক এএসপি ফজলুর রহমানের গ্রেপ্তারকে মামলার তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।

























