সংসদে নাহিদ ইসলামের কড়া সমালোচনা: রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংস্কারের দাবি
জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনে বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম সরকারের বিভিন্ন নীতি, অর্থনৈতিক পরিকল্পনা এবং প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের তীব্র সমালোচনা করেছেন। একই সঙ্গে তিনি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোতে ব্যাপক সংস্কারের আহ্বান জানান।
রোববার রাতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশনের ১৭তম কার্যদিবসে বাজেটের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, ঋণখেলাপি ও গণহত্যার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের অপরাধকে তিনি একই দৃষ্টিতে দেখেন। তিনি অভিযোগ করেন, অতীতে সাধারণ জীবনযাপন করা অনেক রাজনৈতিক ব্যক্তি ক্ষমতার প্রভাবে অস্বাভাবিকভাবে সম্পদের মালিক হয়েছেন। এমনকি কারাবন্দি অবস্থায়ও সরকার-সংশ্লিষ্ট কিছু নেতার সম্পদ কয়েকগুণ বেড়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, যারা একসময় গ্রামাঞ্চলে আত্মগোপনে ছিলেন, তাদের প্রকৃত সম্পদের তথ্য স্থানীয় মানুষের কাছেই রয়েছে। তাই এসব বিষয়ে স্বচ্ছ তদন্ত হওয়া উচিত।
ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত অধিবেশনে নাহিদ ইসলাম ‘জুলাই অভ্যুত্থান জাদুঘর’ দ্রুত চালুর দাবি জানান। তার ভাষ্য, ৫ আগস্টের মধ্যেই জাদুঘরটি উদ্বোধনের পরিকল্পনা ছিল এবং তা বাস্তবায়ন করা জরুরি। পাশাপাশি গণভোটের রায় অনুযায়ী রাষ্ট্রীয় সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ারও আহ্বান জানান তিনি।
সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ বলেন, সীমান্তে ‘পুশব্যাক’ ইস্যু সংসদে আলোচনার সুযোগ না পাওয়ায় বিষয়টি আরও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা দরকার।
ভারতের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক প্রসঙ্গে তিনি বলেন, পারস্পরিক সম্পর্ক অবশ্যই সমতা, মর্যাদা ও জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে পরিচালিত হওয়া উচিত। কেবল কূটনৈতিক সৌজন্য নয়, বাস্তবসম্মত সম্পর্কই দুই দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তরুণদের কর্মসংস্থান ও দক্ষতা উন্নয়নের ওপর জোর দিয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দেশের যুবসমাজকে আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের উপযোগী করে গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে তিনি ব্যাংকিং খাতের নানা অনিয়ম, বিশেষ করে ইসলামী ব্যাংকসহ বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
বাজেটকে অবাস্তব ও উচ্চাভিলাষী আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, নির্ধারিত রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হবে। তার মতে, অর্থনীতি পরিচালনায় বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা, উৎপাদন বৃদ্ধি, বিনিয়োগ সম্প্রসারণ এবং সুষম বণ্টন নিশ্চিত করার দিকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
তিনি অভিযোগ করেন, ২০০৮ সালের পর দীর্ঘ সময়ে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতা সীমিত গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত হয়েছে। এর ফলে সিন্ডিকেট ব্যবস্থা, দলীয়করণ, ব্যাংক খাতে অনিয়ম এবং বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচারের সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। একই সঙ্গে তরুণদের বেকারত্বকে দেশের অন্যতম বড় সংকট হিসেবে উল্লেখ করেন।
২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, আন্দোলনটি শুধু সরকারি চাকরির কোটা নয়, সামগ্রিক সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিরুদ্ধেও ছিল। তার মতে, সেই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় দেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পথ উন্মুক্ত হয়েছে।
ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি নিয়ে সমালোচনা করে তিনি বলেন, শুধু ভোগ ব্যয় বাড়ানোর পরিবর্তে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে বিনিয়োগ এবং নতুন উদ্যোক্তা তৈরিতে রাষ্ট্রের আরও বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত ছিল।
ব্যাংকিং খাতে ঋণখেলাপিদের পুনরায় সুযোগ দেওয়ার সমালোচনা করে নাহিদ ইসলাম বলেন, অর্থ পাচার ও আর্থিক অনিয়মে জড়িতদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে বিদ্যমান আইনের পাশাপাশি নতুন আইনগত কাঠামো প্রয়োজন।
বিদ্যুৎ খাত প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ক্যাপাসিটি চার্জ এবং বিদ্যুৎ ক্রয়-বিক্রয়ের বর্তমান ব্যবস্থার কারণে রাষ্ট্রকে বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে বিদ্যুতের মূল্য, লোডশেডিং এবং শিল্প উৎপাদনের ওপর। তিনি আদানিসহ বিভিন্ন বিদ্যুৎ চুক্তি পুনর্মূল্যায়নের দাবি জানান।
























