ঢাকা ০৯:৪২ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬, ১৪ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ভেনেজুয়েলায় শক্তিশালী জোড়া ভূমিকম্পের পর মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৯২০ জনে পৌঁছেছে।

নিজস্ব সংবাদ :

ভেনেজুয়েলায় শক্তিশালী জোড়া ভূমিকম্পের পর মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৯২০ জনে পৌঁছেছে। এক শতাব্দীরও বেশি সময়ের মধ্যে দেশটিতে সংঘটিত সবচেয়ে ভয়াবহ এই দুর্যোগে হাজারো মানুষ আহত হয়েছেন এবং অসংখ্য ভবন ধসে পড়েছে। ধ্বংসস্তূপে আটকে থাকা মানুষদের উদ্ধারে ধীরগতির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় ক্ষোভ ও হতাশা বাড়ছে।

শুক্রবার দেশটির জাতীয় পরিষদের সভাপতি হোর্হে রদ্রিগেজ জানান, সরকারি হিসাবে এ পর্যন্ত ৯২০ জনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছে। এর আগে অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ জানিয়েছিলেন, ভূমিকম্পে প্রায় তিন হাজার মানুষ আহত হয়েছেন। ক্ষতিগ্রস্ত লা গুয়ারা রাজ্য পরিদর্শনের সময় তিনি বলেন, বিভিন্ন দেশ থেকে উদ্ধারকারী দল সেখানে পৌঁছাতে শুরু করেছে।

স্থানীয় সময় বুধবার সন্ধ্যায় পরপর ৭ দশমিক ২ ও ৭ দশমিক ৫ মাত্রার দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে ভেনেজুয়েলায়। এতে রাজধানী কারাকাসসহ বিভিন্ন অঞ্চলে বহু বহুতল ভবন ধসে পড়ে এবং ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) আশঙ্কা করছে, শেষ পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে। সরকারের আনুষ্ঠানিকভাবে সম্ভাব্য মৃত্যুর সংখ্যা জানানো না হলেও নিখোঁজদের তালিকায় ইতোমধ্যে প্রায় ৪৯ হাজার ৬০০ জনের নাম যুক্ত হয়েছে। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, এই দুর্যোগে প্রায় ৭০ লাখ মানুষ সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, অন্তত ২৫০টি ভবন সম্পূর্ণ বা আংশিক ধ্বংস হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে আটটি হাসপাতাল, রেডক্রসের একটি ভবন এবং ফরাসি দূতাবাসের ভবন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ১৯৬৭ সালের পর এটিই ভেনেজুয়েলার সবচেয়ে ভয়াবহ ভূমিকম্প। ওই সময়ের ভূমিকম্পে ২৪০ জন নিহত হয়েছিলেন। কারাকাসের বাসিন্দারা বলছেন, এত শক্তিশালী কম্পন আগে কখনো অনুভব করেননি। অনেকের কাছে মনে হয়েছে, পুরো ভবন যেন মুহূর্তেই ধসে পড়বে।

ভূমিকম্পের পরও বহু স্থানে ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকা মানুষের আর্তনাদ শোনা গেছে। ফায়ার সার্ভিস, সেনাবাহিনী ও স্বেচ্ছাসেবকদের পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দারাও উদ্ধারকাজে নেমেছেন। প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির অভাবে অনেকেই খালি হাতে ধ্বংসস্তূপ সরানোর চেষ্টা করছেন। বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন থাকায় রাতভর মশালের আলোয় চলে উদ্ধার অভিযান।

লা গুয়ারার বাসিন্দা হুয়ান অর্তিজ জানান, তাঁর এক বন্ধু মারা গেছেন এবং আরেকজন এখনো ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে আছেন। এছাড়া তাঁর পরিচিত অন্তত ২০ জনের কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। কারাকাসের চাকাও এলাকার মেয়র গুস্তাভো দুকে বলেন, অনেক মানুষ এখনো জীবিত অবস্থায় আটকে থাকতে পারেন বলে উদ্ধারকর্মীরা আশা করছেন এবং তাঁদের উদ্ধারে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালানো হচ্ছে।

অসংখ্য পরিবার ঘরবাড়ি হারিয়ে খোলা আকাশের নিচে আশ্রয় নিয়েছে। লা গুয়ারার বাসিন্দা ৬৪ বছর বয়সী পেদ্রো পেরেজ জানান, ভূমিকম্পে তাঁর বাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে এখন রাস্তাতেই দিন কাটছে। একই ধরনের মানবিক সংকট দেখা দিয়েছে উপকূলীয় মোরন শহরেও, যেখানে বিদ্যুৎ ও বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট চলছে।

দুর্গত মানুষের সহায়তায় বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন খাবার, পানি ও ওষুধ বিতরণ করছে। সরকারপন্থী মোটরসাইকেল সংগঠন ‘কোলেকতিভো’র সদস্যদেরও উদ্ধার অভিযানে অংশ নিতে দেখা গেছে।

প্যারামেডিক রত্নি বোম্বার্ট পাঁচ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে ভেঙে পড়া একটি ১৫ তলা ভবনের ধ্বংসস্তূপে তাঁর মাকে খুঁজছেন। তিনি অভিযোগ করেন, শুরুতে সরকারি উদ্ধারকারী দল সেখানে না পৌঁছানোয় স্থানীয় লোকজন নিজেদের উদ্যোগেই উদ্ধার অভিযান শুরু করেন।

উদ্ধারকর্মী দিয়েগো গঞ্জালেস জানান, কাটিয়া লা মার শহরের একটি ধসে পড়া অ্যাপার্টমেন্ট থেকে তাঁর ৩৪ বছর বয়সী কাজিন হিলারি রদ্রিগেজকে বের করতে চার ঘণ্টা ধরে ধ্বংসস্তূপ সরাতে হয়েছে। তাঁর ভাষায়, পুরো শহর কার্যত ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। মানুষ সর্বোচ্চ চেষ্টা করলেও ভারী উদ্ধার সরঞ্জামের অভাবে অভিযান ব্যাহত হচ্ছে।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

আপলোডকারীর তথ্য

ভেনেজুয়েলায় শক্তিশালী জোড়া ভূমিকম্পের পর মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৯২০ জনে পৌঁছেছে।

আপডেট সময় ০২:১৯:২৭ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৭ জুন ২০২৬

ভেনেজুয়েলায় শক্তিশালী জোড়া ভূমিকম্পের পর মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৯২০ জনে পৌঁছেছে। এক শতাব্দীরও বেশি সময়ের মধ্যে দেশটিতে সংঘটিত সবচেয়ে ভয়াবহ এই দুর্যোগে হাজারো মানুষ আহত হয়েছেন এবং অসংখ্য ভবন ধসে পড়েছে। ধ্বংসস্তূপে আটকে থাকা মানুষদের উদ্ধারে ধীরগতির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় ক্ষোভ ও হতাশা বাড়ছে।

শুক্রবার দেশটির জাতীয় পরিষদের সভাপতি হোর্হে রদ্রিগেজ জানান, সরকারি হিসাবে এ পর্যন্ত ৯২০ জনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছে। এর আগে অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ জানিয়েছিলেন, ভূমিকম্পে প্রায় তিন হাজার মানুষ আহত হয়েছেন। ক্ষতিগ্রস্ত লা গুয়ারা রাজ্য পরিদর্শনের সময় তিনি বলেন, বিভিন্ন দেশ থেকে উদ্ধারকারী দল সেখানে পৌঁছাতে শুরু করেছে।

স্থানীয় সময় বুধবার সন্ধ্যায় পরপর ৭ দশমিক ২ ও ৭ দশমিক ৫ মাত্রার দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে ভেনেজুয়েলায়। এতে রাজধানী কারাকাসসহ বিভিন্ন অঞ্চলে বহু বহুতল ভবন ধসে পড়ে এবং ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) আশঙ্কা করছে, শেষ পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে। সরকারের আনুষ্ঠানিকভাবে সম্ভাব্য মৃত্যুর সংখ্যা জানানো না হলেও নিখোঁজদের তালিকায় ইতোমধ্যে প্রায় ৪৯ হাজার ৬০০ জনের নাম যুক্ত হয়েছে। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, এই দুর্যোগে প্রায় ৭০ লাখ মানুষ সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, অন্তত ২৫০টি ভবন সম্পূর্ণ বা আংশিক ধ্বংস হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে আটটি হাসপাতাল, রেডক্রসের একটি ভবন এবং ফরাসি দূতাবাসের ভবন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ১৯৬৭ সালের পর এটিই ভেনেজুয়েলার সবচেয়ে ভয়াবহ ভূমিকম্প। ওই সময়ের ভূমিকম্পে ২৪০ জন নিহত হয়েছিলেন। কারাকাসের বাসিন্দারা বলছেন, এত শক্তিশালী কম্পন আগে কখনো অনুভব করেননি। অনেকের কাছে মনে হয়েছে, পুরো ভবন যেন মুহূর্তেই ধসে পড়বে।

ভূমিকম্পের পরও বহু স্থানে ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকা মানুষের আর্তনাদ শোনা গেছে। ফায়ার সার্ভিস, সেনাবাহিনী ও স্বেচ্ছাসেবকদের পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দারাও উদ্ধারকাজে নেমেছেন। প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির অভাবে অনেকেই খালি হাতে ধ্বংসস্তূপ সরানোর চেষ্টা করছেন। বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন থাকায় রাতভর মশালের আলোয় চলে উদ্ধার অভিযান।

লা গুয়ারার বাসিন্দা হুয়ান অর্তিজ জানান, তাঁর এক বন্ধু মারা গেছেন এবং আরেকজন এখনো ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে আছেন। এছাড়া তাঁর পরিচিত অন্তত ২০ জনের কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। কারাকাসের চাকাও এলাকার মেয়র গুস্তাভো দুকে বলেন, অনেক মানুষ এখনো জীবিত অবস্থায় আটকে থাকতে পারেন বলে উদ্ধারকর্মীরা আশা করছেন এবং তাঁদের উদ্ধারে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালানো হচ্ছে।

অসংখ্য পরিবার ঘরবাড়ি হারিয়ে খোলা আকাশের নিচে আশ্রয় নিয়েছে। লা গুয়ারার বাসিন্দা ৬৪ বছর বয়সী পেদ্রো পেরেজ জানান, ভূমিকম্পে তাঁর বাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে এখন রাস্তাতেই দিন কাটছে। একই ধরনের মানবিক সংকট দেখা দিয়েছে উপকূলীয় মোরন শহরেও, যেখানে বিদ্যুৎ ও বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট চলছে।

দুর্গত মানুষের সহায়তায় বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন খাবার, পানি ও ওষুধ বিতরণ করছে। সরকারপন্থী মোটরসাইকেল সংগঠন ‘কোলেকতিভো’র সদস্যদেরও উদ্ধার অভিযানে অংশ নিতে দেখা গেছে।

প্যারামেডিক রত্নি বোম্বার্ট পাঁচ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে ভেঙে পড়া একটি ১৫ তলা ভবনের ধ্বংসস্তূপে তাঁর মাকে খুঁজছেন। তিনি অভিযোগ করেন, শুরুতে সরকারি উদ্ধারকারী দল সেখানে না পৌঁছানোয় স্থানীয় লোকজন নিজেদের উদ্যোগেই উদ্ধার অভিযান শুরু করেন।

উদ্ধারকর্মী দিয়েগো গঞ্জালেস জানান, কাটিয়া লা মার শহরের একটি ধসে পড়া অ্যাপার্টমেন্ট থেকে তাঁর ৩৪ বছর বয়সী কাজিন হিলারি রদ্রিগেজকে বের করতে চার ঘণ্টা ধরে ধ্বংসস্তূপ সরাতে হয়েছে। তাঁর ভাষায়, পুরো শহর কার্যত ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। মানুষ সর্বোচ্চ চেষ্টা করলেও ভারী উদ্ধার সরঞ্জামের অভাবে অভিযান ব্যাহত হচ্ছে।