ভারতে ছাত্র আন্দোলন আরও বিস্ফোরক: সংসদ অচল, রাহুলের সমর্থন, যন্তর মন্তরে জনসমুদ্র
আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার ও আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের মধ্যে চলমান সংঘাত নতুন মোড় নিয়েছে। বুধবারও টানা তৃতীয় দিনের মতো দেশটির সংসদের দুই কক্ষ অচল হয়ে পড়ে। এদিকে রাজধানী দিল্লির যন্তর মন্তরে শিক্ষার্থীদের অবস্থান কর্মসূচিতে নজিরবিহীন জনসমাগম ও সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত সহায়তা আন্দোলনকে আরও শক্তিশালী করেছে।
বুধবার সংবাদ সম্মেলনে কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী শিক্ষার্থীদের সব দাবির প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানান। তিনি অভিযোগ করেন, গত এক দশকে শতাধিক জাতীয় পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হলেও এখন পর্যন্ত কাউকে কার্যকরভাবে জবাবদিহির আওতায় আনা হয়নি। শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে দুর্নীতি ও ব্যর্থতার দায় নিয়ে পদত্যাগ করার আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর বলপ্রয়োগের ঘটনায় প্রধানমন্ত্রীকে ক্ষমা চাওয়া এবং দায়ীদের শাস্তির দাবি তোলেন।
অন্যদিকে, প্রবল বৃষ্টির মধ্যেও হাজার হাজার শিক্ষার্থী যন্তর মন্তরে অবস্থান কর্মসূচি চালিয়ে যান। একপর্যায়ে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা এবং খাদ্য ও পানীয় প্রবেশে বাধার অভিযোগ ওঠে দিল্লি পুলিশের বিরুদ্ধে। তবে পরিস্থিতি বদলে দেয় সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ব্যক্তি ও বিভিন্ন সংগঠন খাবার, পানি ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী পাঠাতে শুরু করে। অনেকেই বিনামূল্যে রান্না করা খাবার, ফল ও চা বিতরণ করেন। এত বেশি সহায়তা পৌঁছে যায় যে আন্দোলনের সমন্বয়কারীরা সামাজিক মাধ্যমে নতুন করে খাবার না পাঠানোর অনুরোধ জানান।
পর্যবেক্ষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে দিল্লিতে কোনো ছাত্র আন্দোলনকে ঘিরে এমন ব্যাপক জনসমর্থনের নজির খুব কমই দেখা গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এই আন্দোলন নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে এবং কেউ কেউ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের সাম্প্রতিক তরুণ আন্দোলনের সঙ্গে এর তুলনা করছেন।
আন্দোলনের প্রভাব রাজধানীর বাইরে ছড়িয়ে পড়েছে। গুজরাটের আহমেদাবাদে শিক্ষার্থীদের সমর্থনে বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, সেখানে বিক্ষোভ চলাকালে শতাধিক ব্যক্তিকে আটক করা হয়েছে।
সংসদেও দিনভর উত্তেজনা বিরাজ করে। বিরোধী দলগুলো শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে অনড় থাকায় প্রশ্নপত্র ফাঁস ইস্যুতে আলোচনা শুরু করা সম্ভব হয়নি। সরকার আলোচনার প্রস্তাব দিলেও আন্দোলনকারীরা স্পষ্ট জানিয়ে দেন, আলোচনায় বসতে হলে সরকারকে যন্তর মন্তরে আসতে হবে অথবা নিরপেক্ষ কোনো স্থানে বৈঠকের আয়োজন করতে হবে।
আন্দোলনকারী ছাত্রনেতারা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, দাবি পূরণ না হলে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আরও বিপুলসংখ্যক মানুষ দিল্লিতে সমবেত হবেন। তাদের ভাষায়, এখন পর্যন্ত যা হয়েছে, সেটি কেবল শুরু।
এদিকে সংসদ ভবনের ভেতর ও বাইরে বিরোধী দলগুলোর বিক্ষোভ অব্যাহত থাকে। রাহুল গান্ধী, প্রিয়াঙ্কা গান্ধীসহ বিরোধী জোটের নেতারা কালো পোশাক পরে সংসদে উপস্থিত হয়ে প্রতিবাদ জানান। ফলে লোকসভা ও রাজ্যসভার কার্যক্রম আবারও স্থগিত করতে বাধ্য হন স্পিকার ও চেয়ারম্যান।
সরকারি সূত্র বলছে, সরকার আলোচনায় আগ্রহী হলেও শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের প্রশ্নে কোনো ছাড় দিতে রাজি নয়। অন্যদিকে শিক্ষার্থী ও বিরোধী দলগুলোও তাদের অবস্থান থেকে সরে আসার কোনো ইঙ্গিত দেয়নি। ফলে রাজনৈতিক অচলাবস্থা আরও দীর্ঘ হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এদিকে আন্দোলনকে ঘিরে রাজনৈতিক পাল্টাপাল্টি অভিযোগও তীব্র হয়েছে। ক্ষমতাসীন বিজেপির কয়েকজন নেতা এই আন্দোলনের পেছনে বিদেশি প্রভাব বা ষড়যন্ত্রের ইঙ্গিত দিলেও বিরোধী দলগুলো সেই অভিযোগ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বুধবার নিরাপত্তাজনিত কারণে দিল্লির ১৬টি মেট্রো স্টেশন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়। এতে সাধারণ যাত্রীরা চরম ভোগান্তিতে পড়েন এবং কয়েকটি স্টেশনে যাত্রীদের মধ্যেও ক্ষোভ দেখা যায়। পরে সন্ধ্যার দিকে স্টেশনগুলো পুনরায় চালু করা হয়।
এদিকে পুলিশি আচরণ নিয়ে করা একাধিক অভিযোগের পর দিল্লি হাইকোর্ট গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দিয়েছে। আদালত পুলিশকে সংশ্লিষ্ট সব নথি, তথ্য ও সিসিটিভি ফুটেজ সংরক্ষণের নির্দেশ দিয়ে মন্তব্য করেন, শিক্ষার্থীদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, এ ধরনের অভিযোগ গোটা দেশের বিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছে, তাই নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করা জরুরি।
ভারতের চলমান এই ছাত্র আন্দোলন এখন শুধু শিক্ষাব্যবস্থার সংকট নয়, বরং কেন্দ্রীয় সরকার, বিরোধী রাজনীতি এবং জনমতের বড় এক পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে। পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, সেদিকেই এখন নজর দেশটির রাজনৈতিক মহলের।
























