ঢাকা ১১:৫৫ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৮ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

গ্যাস-কয়লা-তেলের সংকটে বিদ্যুৎ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত, এক দিনে লোডশেডিং ৩,৫৯৫ মেগাওয়াট

নিজস্ব সংবাদ :

দেশের বিদ্যুৎ খাতে সংকট যেন কাটছেই না। গ্যাস, কয়লা ও জ্বালানি তেলের সরবরাহ ঘাটতির সঙ্গে বড় কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের একাধিক ইউনিট বন্ধ থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। তীব্র গরমের মধ্যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় রাজধানী থেকে প্রত্যন্ত অঞ্চল—সবখানেই বাড়ছে জনদুর্ভোগ।

পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসির (পিজিসিবি) তথ্য অনুযায়ী, রোববার গভীর রাতে দেশে লোডশেডিং ৩ হাজার ৫৯৫ মেগাওয়াটে পৌঁছায়। পরদিন সোমবার দুপুরেও বিদ্যুতের বড় ঘাটতি অব্যাহত ছিল। দুপুর ১টায় দেশের বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ২৪২ মেগাওয়াট। বিপরীতে সরবরাহ করা হয় ১৩ হাজার ৩৩৮ মেগাওয়াট। ফলে ঘাটতি দাঁড়ায় ২ হাজার ৯০৪ মেগাওয়াট, যা ওই সময়ের মোট চাহিদার প্রায় ১৮ শতাংশ।

বিদ্যুৎ সরবরাহে এমন ওঠানামার কারণে বিতরণ কোম্পানিগুলোও অনেক এলাকায় নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী লোডশেডিং করতে পারছে না। গ্রাহকদের অভিযোগ, বাস্তবে বিদ্যুৎ না থাকার সময় সরকারি হিসাবের চেয়েও বেশি।

সোমবার রাত থেকে দুপুর—গড়ে আড়াই হাজার মেগাওয়াট ঘাটতি

পিজিসিবির ঘণ্টাভিত্তিক তথ্য বলছে, সোমবার রাত ১টায় ১৬ হাজার ৬৭৫ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ ছিল ১৩ হাজার ২৪৮ মেগাওয়াট। ঘাটতি ছিল ৩ হাজার ৪২৭ মেগাওয়াট।

রাত ২টায় চাহিদা আরও বেড়ে ১৬ হাজার ৮০৯ মেগাওয়াটে পৌঁছালেও সরবরাহ নেমে আসে ১৩ হাজার ২১৪ মেগাওয়াটে। এ সময় লোডশেডিং হয় ৩ হাজার ৫৯৫ মেগাওয়াট, যা দিনের সর্বোচ্চ।

সকালে কিছুটা পরিস্থিতির উন্নতি হলেও তা বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। সকাল ৬টায় ঘাটতি ছিল ২ হাজার ২৫৫ মেগাওয়াট। সকাল ৯টায় তা কমে ১ হাজার ৯৬৭ এবং ১১টায় ১ হাজার ৪৪৫ মেগাওয়াটে নামে।

তবে দুপুরে আবার সংকট তীব্র হয়। দুপুর ১২টায় লোডশেডিং বেড়ে ৩ হাজার ১০১ মেগাওয়াটে পৌঁছে। ওই সময় বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ১৪৬ মেগাওয়াট, আর সরবরাহ করা হয় ১৩ হাজার ৪৫ মেগাওয়াট।

রাত ১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত ঘণ্টাভিত্তিক হিসাব পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এ সময়ে গড়ে প্রায় ২ হাজার ৫০০ মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ ঘাটতি ছিল।

এক দিনেই ৭ কোটি ইউনিটের বেশি বিদ্যুৎ ঘাটতি

রোববারও সারা দিন বিদ্যুতের ঘাটতি ছিল উল্লেখযোগ্য। পিজিসিবির দৈনিক হিসাবে, বিকেল ৩টায় উৎপাদন নেমে আসে ১৩ হাজার ৫১৪ মেগাওয়াটে। সে সময় লোডশেডিং ছিল ৩ হাজার ৬৯২ মেগাওয়াট, যা ওই দিনের সর্বোচ্চ। বিকেল ৪টায়ও ঘাটতি ছিল ৩ হাজার ৬৩৯ মেগাওয়াট।

সন্ধ্যার পর তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা করা হলে কিছুটা স্বস্তি আসে। রাত ৯টায় উৎপাদন সর্বোচ্চ ১৫ হাজার ৮২৯ মেগাওয়াটে উঠলেও বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে যায় ১৮ হাজার ৩৩০ মেগাওয়াটে। ফলে তখনও ২ হাজার ৩৯৩ মেগাওয়াট ঘাটতি ছিল।

দিন শেষে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছে প্রায় ৩৪ কোটি ৪৫ লাখ ইউনিট। বিপরীতে চাহিদা ছিল প্রায় ৪১ কোটি ৬০ লাখ ইউনিট। অর্থাৎ এক দিনে ৭ কোটি ১৫ লাখ ইউনিটের বেশি বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হয়নি।

গ্যাসের ঘাটতি প্রায় ৪০ শতাংশ

বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রধান জ্বালানি গ্যাসের সংকট পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে। দেশের গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা ১২ হাজার মেগাওয়াটের বেশি হলেও জ্বালানির অভাবে সেখান থেকে অনেক কম বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে।

কখনো এসব কেন্দ্র থেকে ৩ হাজার ৫০০ মেগাওয়াটের কাছাকাছি, আবার কখনো ৪ হাজার ২০০ থেকে ৫ হাজার ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে।

পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতিদিন প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের প্রয়োজন। রোববার সন্ধ্যায় জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ হয়েছে প্রায় ২৩২ কোটি ২০ লাখ ঘনফুট। অর্থাৎ ঘাটতি ছিল প্রায় ১৪৮ কোটি ঘনফুট বা ৩৯ শতাংশ।

মহেশখালীর একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল থেকে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার পর গ্যাস সংকট আরও প্রকট হয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্পকারখানায়। ঘোড়াশাল, সিদ্ধিরগঞ্জ, মেঘনাঘাট ও আশুগঞ্জের বেশ কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্র গ্যাসের অভাবে পুরোপুরি বা আংশিক বন্ধ রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, নতুন এলএনজি কার্গো দেশে পৌঁছালে সেপ্টেম্বরের প্রথম বা দ্বিতীয় সপ্তাহে গ্যাস সরবরাহ কিছুটা বাড়তে পারে। তবে একটি কার্গো দিয়ে এত বড় ঘাটতি পুরোপুরি পূরণ করা সম্ভব হবে না।

কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রেও অর্ধেক সক্ষমতা কাজে লাগছে না

দেশের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সম্মিলিত উৎপাদন সক্ষমতা ৮ হাজার ৪২৩ মেগাওয়াট। কিন্তু বর্তমানে উৎপাদন হচ্ছে আনুমানিক ৪ হাজার থেকে ৪ হাজার ৮০০ মেগাওয়াট। অর্থাৎ মোট সক্ষমতার প্রায় অর্ধেক ব্যবহার করা যাচ্ছে না।

পায়রা ও মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি করে ইউনিট বন্ধ থাকায় দুটি কেন্দ্র থেকেই উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে না। এ ছাড়া রামপাল ও পটুয়াখালীর আরএনপিএল কেন্দ্রে কয়লার মজুত কমে যাওয়ায় পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে না। বড়পুকুরিয়ার একটি ইউনিটও রক্ষণাবেক্ষণের কারণে বন্ধ।

ভারতের ঝাড়খণ্ডে আদানি পাওয়ারের কেন্দ্র থেকেও পূর্ণ সক্ষমতায় বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে না। ১ হাজার ৪৭০ মেগাওয়াট ক্ষমতার কেন্দ্রটি থেকে পিক সময়ে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াটের মতো বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে না। রোববার সেখান থেকে এসেছে ১ হাজার ১১১ মেগাওয়াট।

এর ওপর নেপাল থেকে আমদানি করা ৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎও আকস্মিক বন্যার কারণে বন্ধ রয়েছে।

তেলভিত্তিক কেন্দ্র বাড়িয়েও মিলছে না কাঙ্ক্ষিত স্বস্তি

গ্যাস ও কয়লার ঘাটতি পূরণ করতে ব্যয়বহুল তেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ওপর নির্ভরতা বাড়াচ্ছে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড। এসব কেন্দ্র সচল রাখতে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন গত এক সপ্তাহে প্রায় ২০ হাজার টন ফার্নেস অয়েল সরবরাহ করেছে, যা স্বাভাবিক সরবরাহের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।

তবে দেশের ৫ হাজার ৬০০ মেগাওয়াটের বেশি সক্ষমতার ফার্নেস অয়েলচালিত কেন্দ্রগুলোর ২৮টি বর্তমানে পুরোপুরি অথবা আংশিক বন্ধ রয়েছে। দিনের বেশির ভাগ সময় এসব কেন্দ্র থেকে দেড় থেকে দুই হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে।

সন্ধ্যার সর্বোচ্চ চাহিদার সময় উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা করা হলেও তেলভিত্তিক বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ অনেক বেশি। রোববার দেশে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনের গড় খরচ ছিল ৭ টাকা ৭৪ পয়সা। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে তেলচালিত কেন্দ্রের ওপর নির্ভর করা আর্থিকভাবে চাপ তৈরি করবে।

ঢাকাতেও দিনে কয়েক দফা বিদ্যুৎ যাচ্ছে

বিদ্যুৎ সংকটের প্রভাব পড়েছে রাজধানীর তুলনামূলক গুরুত্বপূর্ণ ও অভিজাত এলাকাতেও। গুলশান, বনানী, বারিধারা, বসুন্ধরা, ধানমন্ডি, বেইলি রোড ও উত্তরার বিভিন্ন এলাকায় দিনে তিন থেকে চারবার বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

মিরপুর, মোহাম্মদপুর, মগবাজার, বাড্ডা, রামপুরা, পুরান ঢাকা, শ্যামলী ও যাত্রাবাড়ীর অনেক এলাকায় দিনে পাঁচ থেকে ছয়বার পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে। একেক দফায় আধা ঘণ্টা থেকে এক ঘণ্টা বা তারও বেশি সময় বিদ্যুৎ থাকছে না।

বিদ্যুৎ না থাকায় পানির পাম্প, ফ্যান, ফ্রিজ ও বৈদ্যুতিক চুলা চালানো যাচ্ছে না। গ্যাসের চাপ কম থাকায় আগে থেকেই অনেক পরিবার রান্নার কাজে বৈদ্যুতিক চুলার ওপর নির্ভরশীল ছিল। এখন বিদ্যুৎ সংকট তাদের ভোগান্তি আরও বাড়িয়েছে।

শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা, অনলাইনে কাজ এবং দৈনন্দিন জীবনেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত, বাড়ছে শ্রমিকদের ক্ষোভ

বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকটে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছে জ্বালানিনির্ভর শিল্প। বস্ত্র, ডায়িং, সিরামিক ও ইস্পাত কারখানার উৎপাদন কোথাও বন্ধ, কোথাও আবার সীমিত হয়ে গেছে।

নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় গ্যাস সংকটের কারণে কয়েকটি ডায়িং কারখানায় উৎপাদন বন্ধ রাখতে হয়েছে। নরসিংদীর মাধবদীতেও অনেক কারখানা পূর্ণ সক্ষমতায় চলতে পারছে না।

উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় শ্রমিকদের মধ্যে চাকরি ও বেতন নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এরই মধ্যে রোববার মাধবদী এলাকায় প্রায় ৫ হাজার শ্রমিক বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতির প্রতিবাদে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কার্যালয় ঘেরাও করেন এবং ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক অবরোধ করেন। এতে ওই মহাসড়কে যান চলাচল ব্যাহত হয়।

কৃষি ও খামারেও প্রভাব

বিদ্যুৎ সংকট শুধু শহর বা শিল্পাঞ্চলে সীমাবদ্ধ নেই। কৃষিপ্রধান এলাকাগুলোতে সেচ কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। বিদ্যুৎ না থাকায় পোলট্রি ও গবাদিপশুর খামার পরিচালনাতেও সমস্যায় পড়েছেন উদ্যোক্তারা।

কোথাও কোথাও স্থানীয় বাসিন্দারা বিদ্যুৎ সরবরাহের দাবিতে সড়ক অবরোধ ও বিদ্যুৎ অফিস ঘেরাওয়ের কর্মসূচি পালন করেছেন। দীর্ঘস্থায়ী সংকটের কারণে বিদ্যুৎ বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতেও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

সহসাই সংকট কাটার সম্ভাবনা কম

সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমান বিদ্যুৎ সংকটের পেছনে একাধিক কারণ একসঙ্গে কাজ করছে। এলএনজি সরবরাহে বিঘ্ন, দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন ঘাটতি, কয়লার মজুত কমে যাওয়া, জ্বালানি তেলের সংকট এবং বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রের কয়েকটি ইউনিট বন্ধ—সব মিলিয়েই পরিস্থিতি নাজুক হয়েছে।

নতুন এলএনজি কার্গো এলে সেপ্টেম্বরের শুরুতে গ্যাস সরবরাহ কিছুটা বাড়তে পারে। পাশাপাশি বন্ধ থাকা পায়রা ও মাতারবাড়ীর ইউনিট দ্রুত চালু করা এবং অন্যান্য কেন্দ্রের জন্য পর্যাপ্ত কয়লা ও তেল নিশ্চিত করা না গেলে লোডশেডিং দ্রুত সহনীয় পর্যায়ে নামবে না।

এর সঙ্গে তীব্র গরম অব্যাহত থাকলে বিদ্যুতের চাহিদা আরও বাড়তে পারে। ফলে পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতির বদলে সামনে আরও কিছুদিন বড় ধরনের বিদ্যুৎ ঘাটতি মোকাবিলা করতে হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

আপলোডকারীর তথ্য

গ্যাস-কয়লা-তেলের সংকটে বিদ্যুৎ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত, এক দিনে লোডশেডিং ৩,৫৯৫ মেগাওয়াট

আপডেট সময় ০২:৪২:০৯ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

দেশের বিদ্যুৎ খাতে সংকট যেন কাটছেই না। গ্যাস, কয়লা ও জ্বালানি তেলের সরবরাহ ঘাটতির সঙ্গে বড় কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের একাধিক ইউনিট বন্ধ থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। তীব্র গরমের মধ্যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় রাজধানী থেকে প্রত্যন্ত অঞ্চল—সবখানেই বাড়ছে জনদুর্ভোগ।

পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসির (পিজিসিবি) তথ্য অনুযায়ী, রোববার গভীর রাতে দেশে লোডশেডিং ৩ হাজার ৫৯৫ মেগাওয়াটে পৌঁছায়। পরদিন সোমবার দুপুরেও বিদ্যুতের বড় ঘাটতি অব্যাহত ছিল। দুপুর ১টায় দেশের বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ২৪২ মেগাওয়াট। বিপরীতে সরবরাহ করা হয় ১৩ হাজার ৩৩৮ মেগাওয়াট। ফলে ঘাটতি দাঁড়ায় ২ হাজার ৯০৪ মেগাওয়াট, যা ওই সময়ের মোট চাহিদার প্রায় ১৮ শতাংশ।

বিদ্যুৎ সরবরাহে এমন ওঠানামার কারণে বিতরণ কোম্পানিগুলোও অনেক এলাকায় নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী লোডশেডিং করতে পারছে না। গ্রাহকদের অভিযোগ, বাস্তবে বিদ্যুৎ না থাকার সময় সরকারি হিসাবের চেয়েও বেশি।

সোমবার রাত থেকে দুপুর—গড়ে আড়াই হাজার মেগাওয়াট ঘাটতি

পিজিসিবির ঘণ্টাভিত্তিক তথ্য বলছে, সোমবার রাত ১টায় ১৬ হাজার ৬৭৫ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ ছিল ১৩ হাজার ২৪৮ মেগাওয়াট। ঘাটতি ছিল ৩ হাজার ৪২৭ মেগাওয়াট।

রাত ২টায় চাহিদা আরও বেড়ে ১৬ হাজার ৮০৯ মেগাওয়াটে পৌঁছালেও সরবরাহ নেমে আসে ১৩ হাজার ২১৪ মেগাওয়াটে। এ সময় লোডশেডিং হয় ৩ হাজার ৫৯৫ মেগাওয়াট, যা দিনের সর্বোচ্চ।

সকালে কিছুটা পরিস্থিতির উন্নতি হলেও তা বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। সকাল ৬টায় ঘাটতি ছিল ২ হাজার ২৫৫ মেগাওয়াট। সকাল ৯টায় তা কমে ১ হাজার ৯৬৭ এবং ১১টায় ১ হাজার ৪৪৫ মেগাওয়াটে নামে।

তবে দুপুরে আবার সংকট তীব্র হয়। দুপুর ১২টায় লোডশেডিং বেড়ে ৩ হাজার ১০১ মেগাওয়াটে পৌঁছে। ওই সময় বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ১৪৬ মেগাওয়াট, আর সরবরাহ করা হয় ১৩ হাজার ৪৫ মেগাওয়াট।

রাত ১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত ঘণ্টাভিত্তিক হিসাব পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এ সময়ে গড়ে প্রায় ২ হাজার ৫০০ মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ ঘাটতি ছিল।

এক দিনেই ৭ কোটি ইউনিটের বেশি বিদ্যুৎ ঘাটতি

রোববারও সারা দিন বিদ্যুতের ঘাটতি ছিল উল্লেখযোগ্য। পিজিসিবির দৈনিক হিসাবে, বিকেল ৩টায় উৎপাদন নেমে আসে ১৩ হাজার ৫১৪ মেগাওয়াটে। সে সময় লোডশেডিং ছিল ৩ হাজার ৬৯২ মেগাওয়াট, যা ওই দিনের সর্বোচ্চ। বিকেল ৪টায়ও ঘাটতি ছিল ৩ হাজার ৬৩৯ মেগাওয়াট।

সন্ধ্যার পর তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা করা হলে কিছুটা স্বস্তি আসে। রাত ৯টায় উৎপাদন সর্বোচ্চ ১৫ হাজার ৮২৯ মেগাওয়াটে উঠলেও বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে যায় ১৮ হাজার ৩৩০ মেগাওয়াটে। ফলে তখনও ২ হাজার ৩৯৩ মেগাওয়াট ঘাটতি ছিল।

দিন শেষে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছে প্রায় ৩৪ কোটি ৪৫ লাখ ইউনিট। বিপরীতে চাহিদা ছিল প্রায় ৪১ কোটি ৬০ লাখ ইউনিট। অর্থাৎ এক দিনে ৭ কোটি ১৫ লাখ ইউনিটের বেশি বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হয়নি।

গ্যাসের ঘাটতি প্রায় ৪০ শতাংশ

বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রধান জ্বালানি গ্যাসের সংকট পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে। দেশের গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা ১২ হাজার মেগাওয়াটের বেশি হলেও জ্বালানির অভাবে সেখান থেকে অনেক কম বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে।

কখনো এসব কেন্দ্র থেকে ৩ হাজার ৫০০ মেগাওয়াটের কাছাকাছি, আবার কখনো ৪ হাজার ২০০ থেকে ৫ হাজার ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে।

পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতিদিন প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের প্রয়োজন। রোববার সন্ধ্যায় জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ হয়েছে প্রায় ২৩২ কোটি ২০ লাখ ঘনফুট। অর্থাৎ ঘাটতি ছিল প্রায় ১৪৮ কোটি ঘনফুট বা ৩৯ শতাংশ।

মহেশখালীর একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল থেকে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার পর গ্যাস সংকট আরও প্রকট হয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্পকারখানায়। ঘোড়াশাল, সিদ্ধিরগঞ্জ, মেঘনাঘাট ও আশুগঞ্জের বেশ কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্র গ্যাসের অভাবে পুরোপুরি বা আংশিক বন্ধ রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, নতুন এলএনজি কার্গো দেশে পৌঁছালে সেপ্টেম্বরের প্রথম বা দ্বিতীয় সপ্তাহে গ্যাস সরবরাহ কিছুটা বাড়তে পারে। তবে একটি কার্গো দিয়ে এত বড় ঘাটতি পুরোপুরি পূরণ করা সম্ভব হবে না।

কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রেও অর্ধেক সক্ষমতা কাজে লাগছে না

দেশের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সম্মিলিত উৎপাদন সক্ষমতা ৮ হাজার ৪২৩ মেগাওয়াট। কিন্তু বর্তমানে উৎপাদন হচ্ছে আনুমানিক ৪ হাজার থেকে ৪ হাজার ৮০০ মেগাওয়াট। অর্থাৎ মোট সক্ষমতার প্রায় অর্ধেক ব্যবহার করা যাচ্ছে না।

পায়রা ও মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি করে ইউনিট বন্ধ থাকায় দুটি কেন্দ্র থেকেই উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে না। এ ছাড়া রামপাল ও পটুয়াখালীর আরএনপিএল কেন্দ্রে কয়লার মজুত কমে যাওয়ায় পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে না। বড়পুকুরিয়ার একটি ইউনিটও রক্ষণাবেক্ষণের কারণে বন্ধ।

ভারতের ঝাড়খণ্ডে আদানি পাওয়ারের কেন্দ্র থেকেও পূর্ণ সক্ষমতায় বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে না। ১ হাজার ৪৭০ মেগাওয়াট ক্ষমতার কেন্দ্রটি থেকে পিক সময়ে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াটের মতো বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে না। রোববার সেখান থেকে এসেছে ১ হাজার ১১১ মেগাওয়াট।

এর ওপর নেপাল থেকে আমদানি করা ৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎও আকস্মিক বন্যার কারণে বন্ধ রয়েছে।

তেলভিত্তিক কেন্দ্র বাড়িয়েও মিলছে না কাঙ্ক্ষিত স্বস্তি

গ্যাস ও কয়লার ঘাটতি পূরণ করতে ব্যয়বহুল তেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ওপর নির্ভরতা বাড়াচ্ছে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড। এসব কেন্দ্র সচল রাখতে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন গত এক সপ্তাহে প্রায় ২০ হাজার টন ফার্নেস অয়েল সরবরাহ করেছে, যা স্বাভাবিক সরবরাহের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।

তবে দেশের ৫ হাজার ৬০০ মেগাওয়াটের বেশি সক্ষমতার ফার্নেস অয়েলচালিত কেন্দ্রগুলোর ২৮টি বর্তমানে পুরোপুরি অথবা আংশিক বন্ধ রয়েছে। দিনের বেশির ভাগ সময় এসব কেন্দ্র থেকে দেড় থেকে দুই হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে।

সন্ধ্যার সর্বোচ্চ চাহিদার সময় উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা করা হলেও তেলভিত্তিক বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ অনেক বেশি। রোববার দেশে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনের গড় খরচ ছিল ৭ টাকা ৭৪ পয়সা। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে তেলচালিত কেন্দ্রের ওপর নির্ভর করা আর্থিকভাবে চাপ তৈরি করবে।

ঢাকাতেও দিনে কয়েক দফা বিদ্যুৎ যাচ্ছে

বিদ্যুৎ সংকটের প্রভাব পড়েছে রাজধানীর তুলনামূলক গুরুত্বপূর্ণ ও অভিজাত এলাকাতেও। গুলশান, বনানী, বারিধারা, বসুন্ধরা, ধানমন্ডি, বেইলি রোড ও উত্তরার বিভিন্ন এলাকায় দিনে তিন থেকে চারবার বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

মিরপুর, মোহাম্মদপুর, মগবাজার, বাড্ডা, রামপুরা, পুরান ঢাকা, শ্যামলী ও যাত্রাবাড়ীর অনেক এলাকায় দিনে পাঁচ থেকে ছয়বার পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে। একেক দফায় আধা ঘণ্টা থেকে এক ঘণ্টা বা তারও বেশি সময় বিদ্যুৎ থাকছে না।

বিদ্যুৎ না থাকায় পানির পাম্প, ফ্যান, ফ্রিজ ও বৈদ্যুতিক চুলা চালানো যাচ্ছে না। গ্যাসের চাপ কম থাকায় আগে থেকেই অনেক পরিবার রান্নার কাজে বৈদ্যুতিক চুলার ওপর নির্ভরশীল ছিল। এখন বিদ্যুৎ সংকট তাদের ভোগান্তি আরও বাড়িয়েছে।

শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা, অনলাইনে কাজ এবং দৈনন্দিন জীবনেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত, বাড়ছে শ্রমিকদের ক্ষোভ

বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকটে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছে জ্বালানিনির্ভর শিল্প। বস্ত্র, ডায়িং, সিরামিক ও ইস্পাত কারখানার উৎপাদন কোথাও বন্ধ, কোথাও আবার সীমিত হয়ে গেছে।

নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় গ্যাস সংকটের কারণে কয়েকটি ডায়িং কারখানায় উৎপাদন বন্ধ রাখতে হয়েছে। নরসিংদীর মাধবদীতেও অনেক কারখানা পূর্ণ সক্ষমতায় চলতে পারছে না।

উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় শ্রমিকদের মধ্যে চাকরি ও বেতন নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এরই মধ্যে রোববার মাধবদী এলাকায় প্রায় ৫ হাজার শ্রমিক বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতির প্রতিবাদে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কার্যালয় ঘেরাও করেন এবং ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক অবরোধ করেন। এতে ওই মহাসড়কে যান চলাচল ব্যাহত হয়।

কৃষি ও খামারেও প্রভাব

বিদ্যুৎ সংকট শুধু শহর বা শিল্পাঞ্চলে সীমাবদ্ধ নেই। কৃষিপ্রধান এলাকাগুলোতে সেচ কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। বিদ্যুৎ না থাকায় পোলট্রি ও গবাদিপশুর খামার পরিচালনাতেও সমস্যায় পড়েছেন উদ্যোক্তারা।

কোথাও কোথাও স্থানীয় বাসিন্দারা বিদ্যুৎ সরবরাহের দাবিতে সড়ক অবরোধ ও বিদ্যুৎ অফিস ঘেরাওয়ের কর্মসূচি পালন করেছেন। দীর্ঘস্থায়ী সংকটের কারণে বিদ্যুৎ বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতেও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

সহসাই সংকট কাটার সম্ভাবনা কম

সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমান বিদ্যুৎ সংকটের পেছনে একাধিক কারণ একসঙ্গে কাজ করছে। এলএনজি সরবরাহে বিঘ্ন, দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন ঘাটতি, কয়লার মজুত কমে যাওয়া, জ্বালানি তেলের সংকট এবং বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রের কয়েকটি ইউনিট বন্ধ—সব মিলিয়েই পরিস্থিতি নাজুক হয়েছে।

নতুন এলএনজি কার্গো এলে সেপ্টেম্বরের শুরুতে গ্যাস সরবরাহ কিছুটা বাড়তে পারে। পাশাপাশি বন্ধ থাকা পায়রা ও মাতারবাড়ীর ইউনিট দ্রুত চালু করা এবং অন্যান্য কেন্দ্রের জন্য পর্যাপ্ত কয়লা ও তেল নিশ্চিত করা না গেলে লোডশেডিং দ্রুত সহনীয় পর্যায়ে নামবে না।

এর সঙ্গে তীব্র গরম অব্যাহত থাকলে বিদ্যুতের চাহিদা আরও বাড়তে পারে। ফলে পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতির বদলে সামনে আরও কিছুদিন বড় ধরনের বিদ্যুৎ ঘাটতি মোকাবিলা করতে হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।