গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে নাকাল জনজীবন, আয় না বাড়লেও বাড়ছে সংসারের খরচ
সকালে চুলা জ্বালাতে গিয়ে গ্যাস নেই। রান্না বন্ধ রাখতে না চাইলে কিনতে হচ্ছে সিলিন্ডার। সারাদিনের কাজ শেষে রাতে বাসায় ফিরেও স্বস্তি নেই—বিদ্যুৎ কখন আসবে, তার অপেক্ষা করতে হচ্ছে। এর মধ্যেই বাজারে গেলেই আগের তুলনায় বেশি টাকা গুনতে হচ্ছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের জন্য।
আয় বাড়ার কোনো দৃশ্যমান পরিবর্তন না থাকলেও কমছে না সংসারের ব্যয়। বরং গ্যাস-বিদ্যুতের বিকল্প ব্যবস্থা, জ্বালানি, খাবার, বাসাভাড়া, যাতায়াত, শিক্ষা ও চিকিৎসার মতো খরচ একের পর এক চাপ তৈরি করছে সাধারণ মানুষের ওপর।
দেশের বিভিন্ন এলাকায় জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহের সংকট, শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়া এবং নিত্যপণ্যের তুলনামূলক চড়া দামের কারণে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর জীবনযাত্রা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। সরকারি পরিসংখ্যানে মূল্যস্ফীতির হার কমার তথ্য এলেও বাজারে তার সুফল খুব একটা টের পাচ্ছেন না ভোক্তারা।
গ্যাসের সংকটে বাড়ছে বাড়তি ব্যয়
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। আগে নির্দিষ্ট সময় বা কিছু এলাকায় গ্যাসের চাপ কম থাকার অভিযোগ থাকলেও এখন অনেক বাসাবাড়িতেই নিয়মিত সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে না। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিদ্যুতের ঘন ঘন আসা-যাওয়া।
গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়ার পাশাপাশি এলএনজি সরবরাহে বিঘ্ন এবং বিদ্যুতের চাহিদা বৃদ্ধিও সংকটকে আরও তীব্র করেছে। সংশ্লিষ্ট হিসাবে, দেশে প্রতিদিন প্রায় ৩ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ নেমে এসেছে প্রায় ১ হাজার ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুটে।
গ্যাসের ঘাটতির প্রভাব সরাসরি পড়ছে বিদ্যুৎ উৎপাদনে। গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলো প্রয়োজন অনুযায়ী জ্বালানি না পাওয়ায় অনেক ক্ষেত্রেই পূর্ণ সক্ষমতায় বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে না। বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য যেখানে দৈনিক ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন, সাম্প্রতিক সময়ে সরবরাহ ৯০০ মিলিয়ন ঘনফুটের নিচেও নেমেছে।
এদিকে গরমের কারণে বিদ্যুতের চাহিদা ১৮ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়েছে। কোনো কোনো সময়ে উৎপাদন ও চাহিদার ব্যবধান ৩ হাজার ৫০০ মেগাওয়াটের বেশি হয়েছে। অর্থাৎ বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা থাকলেও জ্বালানি সংকটে তার পুরোটা ব্যবহার করা যাচ্ছে না।
মিরপুরের বাসিন্দা মাহফুজুর রহমান বলেন, সারাদিন অফিস শেষে বাসায় ফিরে বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগও অনেক সময় থাকে না। সন্ধ্যার পর একাধিকবার বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় দুর্ভোগ বাড়ছে।
একই এলাকার আফসারি খানমের অভিযোগ, আগে মূলত শীতকালে গ্যাসের সমস্যা বেশি দেখা যেত। এখন বছরের অন্য সময়েও নিয়মিত গ্যাস পাওয়া যায় না। পাশাপাশি দিনে কয়েকবার বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে।
গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটের আরেকটি বড় প্রভাব পড়ছে পারিবারিক বাজেটে। গ্যাস না থাকলে রান্নার জন্য সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে। আবার বিদ্যুৎ চলে গেলে কেউ জেনারেটর, কেউ বিকল্প বিদ্যুৎব্যবস্থা ব্যবহার করছেন। ফলে মাসের নির্ধারিত খরচের বাইরে নতুন করে অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ বি. ডি. রহমত উল্লাহর মতে, জ্বালানি সরবরাহ কিছুটা বাড়ানো সম্ভব হলে বিদ্যুৎ বিভ্রাট কমানো যেতে পারে। তবে স্বল্প সময়ে বড় পরিমাণ অতিরিক্ত জ্বালানি সংগ্রহ করে সংকট পুরোপুরি সামাল দেওয়া কঠিন। বিশেষ করে গরমে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও চ্যালেঞ্জিং হয়েছে।
কারখানা বন্ধ, বাড়ছে চাকরি হারানোর শঙ্কা
জ্বালানি সংকটের ধাক্কা শুধু আবাসিক গ্রাহকের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। শিল্প খাতেও এর প্রভাব পড়েছে। গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি ক্রয়াদেশ কমে যাওয়া, ঋণের চাপ ও নগদ অর্থের সংকটসহ নানা কারণে কিছু শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে শ্রমবাজারে।
শিল্প পুলিশ, বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসের তথ্য অনুযায়ী, বিজিএমইএর সদস্য অন্তত ৮০টি কারখানায় প্রায় ১৯ হাজার ১৮৮ শ্রমিক চাকরি হারিয়েছেন বা ছাঁটাইয়ের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ২৭টি কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে।
তবে শিল্পকারখানা বন্ধ হওয়ার প্রবণতা সাম্প্রতিক সময়েই শুরু হয়নি। ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সাত মাসে গাজীপুর, সাভার-আশুলিয়া এবং নারায়ণগঞ্জ-নরসিংদীর শিল্পাঞ্চলে ৯৫টি কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়। এতে ৬১ হাজার ৮৮১ শ্রমিক-কর্মচারী কর্মসংস্থান হারান।
শিল্প পুলিশের হিসাবে, ওই সময় গাজীপুরে ৫৪টি, নারায়ণগঞ্জ-নরসিংদীতে ২৩টি এবং সাভার-আশুলিয়া-ধামরাই এলাকায় ১৮টি তৈরি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়। শুধু গাজীপুরেই প্রায় ৪৫ হাজার ৭৩২ শ্রমিক-কর্মচারী চাকরি হারান।
এদিকে গত ৩ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে এক প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির জানান, ২০২৩ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত তিন বছরে চার শতাধিক পোশাক কারখানা বন্ধ হয়েছে। এর মধ্যে বিজিএমইএর সদস্য ২৮২টি এবং বিকেএমইএর সদস্য ১২৩টি কারখানা রয়েছে।
কারখানা বন্ধের অর্থ শুধু শ্রমিকের চাকরি হারানো নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একটি পরিবারের খাদ্য, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার ব্যয়। আয় বন্ধ হয়ে গেলে অনেক পরিবারকে সঞ্চয় ভাঙতে হয়, কেউ কেউ ধারদেনায় জড়িয়ে পড়েন। স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য ও পরিবহন খাতেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
মূল্যস্ফীতি কমলেও বাজারে স্বস্তি নেই
সরকারি পরিসংখ্যানে মূল্যস্ফীতির হার কিছুটা কমেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে, জুলাইয়ে দেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতি জুনের ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ থেকে কমে ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ হয়েছে। একই সময়ে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৬০ শতাংশ থেকে কমে ৭ দশমিক ১৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ২৮ শতাংশ।
জুলাইয়ের এই মূল্যস্ফীতির হার গত আট মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন হলেও সাধারণ মানুষের জীবনে এর প্রভাব সীমিত।
কারণ মূল্যস্ফীতি কমার অর্থ বাজারদর কমে যাওয়া নয়। এর অর্থ হলো আগের তুলনায় পণ্যের দাম বাড়ার গতি কিছুটা ধীর হয়েছে। আগে যেসব পণ্যের দাম বেড়ে গেছে, সেগুলো আবার আগের অবস্থায় ফিরে আসেনি।
ফলে বাজারে গিয়ে এখনো বাড়তি অর্থ খরচ করতে হচ্ছে ক্রেতাদের। চাল, ডাল, তেল, চিনি, আটা, ডিম, মাছ, মাংস ও সবজিসহ বিভিন্ন নিত্যপণ্যের দাম অনেক পরিবারের মাসিক বাজেটে চাপ তৈরি করছে।
বাজার করতে আসা কাওসার আহমেদের ভাষ্য, গ্যাস ও বিদ্যুতের ঘাটতির কারণে যদি উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যাহত হয়ে পণ্যের দাম বাড়ে, তাহলে সাধারণ মানুষের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে পড়বে।
একই আয়ে বাড়ছে ব্যয়ের তালিকা
সংসারের সংকট এখন শুধু বাজারদরের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। গ্যাস না থাকলে সিলিন্ডার, বিদ্যুৎ না থাকলে বিকল্প ব্যবস্থা—এ ধরনের অতিরিক্ত খরচ নিয়মিত ব্যয়ের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে।
এর বাইরে রয়েছে বাসাভাড়া, যাতায়াত, সন্তানের পড়াশোনা, চিকিৎসা ও খাবারের ব্যয়। ফলে মাসের শুরুতে যে বাজেট তৈরি করা হয়, মাস শেষ হওয়ার আগেই তা এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে।
ব্যয় সামলাতে অনেক পরিবার বাজারের তালিকা ছোট করছে। মাছ-মাংস কম কেনা, বাইরে খাওয়া বন্ধ করা কিংবা সন্তানদের অতিরিক্ত খরচ কমানোর মতো সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে অনেককে। আর যারা চাকরি হারিয়েছেন, তাদের অনেকেই সঞ্চয় ভেঙে কিংবা ধার করে সংসার চালাচ্ছেন।
অর্থনীতির হিসাবে মূল্যস্ফীতি কমার তথ্য ইতিবাচক হলেও সাধারণ মানুষের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো মাস শেষে আয় ও ব্যয়ের ব্যবধান। আয় অপরিবর্তিত রেখে যদি খাদ্য, জ্বালানি ও দৈনন্দিন জীবনের অন্যান্য ব্যয় বাড়তেই থাকে, তাহলে মূল্যস্ফীতির হার কমলেও মানুষের স্বস্তি ফিরবে না।
সব মিলিয়ে গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট, শিল্পকারখানায় উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা এবং নিত্যপণ্যের বাড়তি দাম—তিন দিক থেকে চাপের মুখে পড়েছে সাধারণ মানুষের জীবন। সংকটের ধরন আলাদা হলেও এর প্রভাব গিয়ে পড়ছে একই জায়গায়—পরিবারের আয়-ব্যয়ের হিসাব এবং জীবনযাত্রার মানে।
এ অবস্থায় সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা খুব বেশি নয়। নিয়মিত গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ, কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা এবং নিত্যপণ্যের বাজারে স্থিতিশীলতা—এই তিনটি নিশ্চিত হলেই অনেক পরিবারের মাসিক বাজেটে কিছুটা স্বস্তি ফিরতে পারে।

























