অজ্ঞান পার্টির নতুন টার্গেট অটোরিকশাচালক, ৮ মাসে প্রাণ গেল ৩ জনের
যাত্রীবেশে অটোরিকশায় ওঠা, কথাবার্তার মাধ্যমে চালকের সঙ্গে সখ্য তৈরি করা, এরপর সুযোগ বুঝে চেতনানাশক প্রয়োগ—এভাবেই অপরাধ সংঘটিত করছে একটি সংঘবদ্ধ চক্র। চালক অচেতন হয়ে পড়লে তার সঙ্গে থাকা টাকা-পয়সা ও মোবাইল ফোন লুটের পাশাপাশি নিয়ে যাওয়া হচ্ছে অটোরিকশাটিও। রাজধানীতে সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনায় এমনই ভয়ংকর কৌশলের তথ্য পেয়েছে পুলিশ।
দীর্ঘদিন ধরে বাস, ট্রেন, লঞ্চঘাট, টার্মিনাল ও ব্যস্ত জনসমাগমস্থলে যাত্রীদের টার্গেট করে আসছিল অজ্ঞান পার্টির সদস্যরা। তবে সম্প্রতি তাদের নজর পড়েছে অটোরিকশা ও রিকশাচালকদের ওপর। গত এক বছরে এই চক্রের কবলে পড়ে সারা দেশে অন্তত ৩২ জনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে।
আট মাসে রাজধানীতে তিন চালকের মৃত্যু
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, রাজধানীতে অজ্ঞান পার্টি বা ছিনতাইকারী চক্রের হামলায় অন্তত তিন অটোরিকশাচালক প্রাণ হারিয়েছেন। তিনটি ঘটনায় অপরাধের ধরনও ছিল ভিন্ন।
গত ১০ মার্চ শাহজাহানপুরের শান্তিবাগ ভাঙারি গলি এলাকায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার মালিক সিকান্দার মিয়াকে কয়েকজন ধারালো অস্ত্র দিয়ে হামলা করে গুরুতর আহত করে। পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
এরপর ২৮ জুন রাতে খিলগাঁও এলাকা থেকে অটোরিকশা নিয়ে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হন দিদারুল ইসলাম। পরদিন ভোরে ওয়ারীর নবাবপুর রোড এলাকা থেকে অচেতন অবস্থায় তাকে উদ্ধার করা হয়। দ্রুত ঢাকা মেডিকেলে ভর্তি করা হলেও চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২ জুলাই রাতে মারা যান তিনি।
পুলিশের তদন্তে জানা যায়, যাত্রী সেজে অটোরিকশায় উঠে চালককে অচেতন করে সেটি নিয়ে পালিয়ে যায় একটি চক্র। ঘটনাটি তদন্ত করতে গিয়ে সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাদের কাছ থেকে দিদারুলের ছিনতাই হওয়া অটোরিকশা এবং অপরাধে ব্যবহৃত একটি সিএনজি উদ্ধার করা হয়।
মাটির নিচে মিলল চালকের মরদেহ
এদিকে জুলাইয়ে পূর্ব বাড্ডার অটোরিকশাচালক অলিউর রহমান ওরফে অলি নিখোঁজ হন। কয়েক দিন পর উলারটেক এলাকার একটি পরিত্যক্ত জমি থেকে মাটিচাপা অবস্থায় তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
দিদারুল ইসলাম হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদেও অজ্ঞান পার্টির সঙ্গে সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছে পুলিশ। তদন্তসংশ্লিষ্টদের মতে, চালকের আস্থা অর্জন করে পরে তাকে অচেতন করা এবং সুযোগ বুঝে অটোরিকশা নিয়ে পালিয়ে যাওয়াই চক্রটির অন্যতম কৌশল।
নিরাপত্তাহীনতায় চালকেরা
রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে প্রতিদিন জীবিকার প্রয়োজনে হাজার হাজার অটোরিকশাচালক যাত্রী পরিবহন করেন। রাত-বিরাতে অপরিচিত যাত্রী নিয়ে নির্জন বা অপরিচিত এলাকায় যাওয়ার কারণে তাদের ঝুঁকিও বাড়ছে। যাত্রী নিরাপত্তার পাশাপাশি এখন চালকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও জরুরি হয়ে উঠেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চালকদের ওপর হামলা ও অটোরিকশা ছিনতাই ঠেকাতে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে সেখানে নজরদারি বাড়াতে হবে। বিশেষ করে রাতে সিসিটিভি কাভারেজ জোরদার করার পাশাপাশি চালকদের জন্য দ্রুত জরুরি সহায়তা পাওয়ার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে ছিনতাই হওয়া অটোরিকশা বা রিকশা যাতে সহজে অন্যের কাছে বিক্রি বা হস্তান্তর করা না যায়, সে বিষয়েও কার্যকর নজরদারি জরুরি। পুরোনো ও ব্যবহৃত যানবাহনের কেনাবেচার ক্ষেত্রে পরিচয় ও মালিকানার তথ্য যাচাই বাধ্যতামূলক করা গেলে চক্রটির তৎপরতা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।


























