ঢাকা ১২:০৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৮ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দক্ষিণখানে দন্তচিকিৎসক হত্যা: স্বামী সোহেল রানাকে ২ দিনের রিমান্ড

নিজস্ব সংবাদ :

রাজধানীর দক্ষিণখানে দন্তচিকিৎসক সারা রোকসানা (৪২) হত্যার ঘটনায় তাঁর স্বামী মো. সোহেল রানাকে দুই দিনের রিমান্ডে নেওয়ার অনুমতি দিয়েছেন আদালত। সোমবার ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আমিনুল ইসলাম জুনাঈদের আদালত শুনানি শেষে এ আদেশ দেন।

তদন্ত কর্মকর্তা সোহেল রানাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করেছিলেন। তবে আদালত শুনানি শেষে দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন আদালত সংশ্লিষ্ট প্রসিকিউশন কর্মকর্তারা।

জামিন চাইলেও মিলেনি

শুনানিতে আসামিপক্ষের আইনজীবী দাবি করেন, পারিবারিক মনোমালিন্য থাকলেও সোহেল রানা হত্যাকাণ্ডে জড়িত নন এবং তাঁকে অন্যায়ভাবে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা বলেন, ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটনে বিস্তারিত জিজ্ঞাসাবাদ প্রয়োজন।

রিমান্ডের আদেশ হওয়ার পর আদালত ভবন থেকে বের করে নেওয়ার সময় সাংবাদিকদের কাছে সোহেল রানা বলেন, তিনি নির্দোষ এবং সঠিক তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন চান


যেভাবে উদ্ধার হয় মরদেহ

গত ৩০ জুলাই দক্ষিণখানের ফায়দাবাদ এলাকার জামতলা গলির একটি ভবনের দ্বিতীয় তলার ফ্ল্যাট থেকে সারা রোকসানার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরদিন নিহতের বোন দক্ষিণখান থানায় হত্যা মামলা করেন।

মামলার তথ্য অনুযায়ী, সোহেল রানা সকালে মেয়েকে স্কুলে পৌঁছে কর্মস্থলে যান। বাসায় একা ছিলেন সারা রোকসানা। বিকেলে স্কুল শেষে তাঁদের ১০ বছর বয়সী মেয়ে বাসায় ফিরে মাকে বিছানায় অচেতন অবস্থায় দেখতে পায়। ডাকাডাকিতে সাড়া না পেয়ে সে স্কুলে ফিরে গিয়ে অধ্যক্ষের ফোন থেকে বাবাকে খবর দেয়।

পরবর্তীতে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে এবং ময়নাতদন্তের জন্য শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠায়।


চুরি নাকি পরিকল্পিত হত্যা?

ঘটনার পর প্রথমে ধারণা করা হয়েছিল, জানালার গ্রিল কেটে চোর বা ডাকাত প্রবেশ করে লুটপাটের পর হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। পরিবার জানিয়েছিল, আলমারি থেকে প্রায় ২০ লাখ টাকার স্বর্ণালংকার খোয়া গেছে

তবে তদন্তে কিছু অসঙ্গতি সামনে আসে। পুলিশ আদালতে জানায়—

  • গ্রিল কাটা থাকলেও আশপাশের কেউ কোনো শব্দ শোনেননি,
  • ভেতরের বারান্দায় পাওয়া জুতার ছাপ সোহেল রানার জুতার সঙ্গে মিলেছে,
  • বাইরের ছাদ বা বিপরীত পাশে অন্য কোনো জুতার ছাপ পাওয়া যায়নি,
  • নিহতের মেয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁর মা সাধারণত ভেতর থেকে দরজা আটকে রাখতেন, কিন্তু ঘটনার দিন তা করা হয়নি,
  • সোহেল রানা বাসায় ফিরে স্ত্রীকে ওই অবস্থায় দেখেও তাঁকে স্পর্শ বা চিকিৎসার চেষ্টা করেননি,
  • আলমারির কিছু অংশ অক্ষত ছিল এবং পুরোনো গয়নার খালি বাক্সগুলো গুছিয়ে রাখা ছিল।

এসব কারণে তদন্তকারীদের ধারণা, এটি সাধারণ চুরি বা ডাকাতির ঘটনা নাও হতে পারে


দাম্পত্য কলহের তথ্যও তদন্তে

রিমান্ড আবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, সোহেল রানা দীর্ঘদিন ধরে দাম্পত্য কলহের কথা স্বীকার করেছেন এবং স্ত্রীর একটি সম্পর্ক নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন।

নিহতের পরিবারের অভিযোগ, সোহেল রানা স্ত্রীকে প্রায়ই মানসিক ও শারীরিকভাবে নির্যাতন করতেন এবং তাঁর একাধিক নারীর সঙ্গে সম্পর্ক ছিল। পরিবারের সদস্যদের দাবি, মৃত্যুর কিছুদিন আগে সারা রোকসানা নিজের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন।


তদন্তে এখন গুরুত্ব পাচ্ছে যেসব প্রশ্ন

এই হত্যাকাণ্ডে এখন কয়েকটি বিষয়কে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে—

  • গ্রিল কাটার ঘটনাটি কি সাজানো ছিল?
  • স্বর্ণালংকার সত্যিই খোয়া গেছে কি না,
  • ঘটনার সময় ফ্ল্যাটে আর কেউ প্রবেশ করেছিল কি না,
  • পারিবারিক বিরোধের সঙ্গে হত্যার কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না।

পুলিশ জানিয়েছে, রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে হত্যার প্রকৃত কারণ ও ঘটনার পেছনের বাস্তব চিত্র উদ্ঘাটনের চেষ্টা চলছে

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

আপলোডকারীর তথ্য

দক্ষিণখানে দন্তচিকিৎসক হত্যা: স্বামী সোহেল রানাকে ২ দিনের রিমান্ড

আপডেট সময় ০৩:০৮:২০ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৪ অগাস্ট ২০২৬

রাজধানীর দক্ষিণখানে দন্তচিকিৎসক সারা রোকসানা (৪২) হত্যার ঘটনায় তাঁর স্বামী মো. সোহেল রানাকে দুই দিনের রিমান্ডে নেওয়ার অনুমতি দিয়েছেন আদালত। সোমবার ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আমিনুল ইসলাম জুনাঈদের আদালত শুনানি শেষে এ আদেশ দেন।

তদন্ত কর্মকর্তা সোহেল রানাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করেছিলেন। তবে আদালত শুনানি শেষে দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন আদালত সংশ্লিষ্ট প্রসিকিউশন কর্মকর্তারা।

জামিন চাইলেও মিলেনি

শুনানিতে আসামিপক্ষের আইনজীবী দাবি করেন, পারিবারিক মনোমালিন্য থাকলেও সোহেল রানা হত্যাকাণ্ডে জড়িত নন এবং তাঁকে অন্যায়ভাবে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা বলেন, ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটনে বিস্তারিত জিজ্ঞাসাবাদ প্রয়োজন।

রিমান্ডের আদেশ হওয়ার পর আদালত ভবন থেকে বের করে নেওয়ার সময় সাংবাদিকদের কাছে সোহেল রানা বলেন, তিনি নির্দোষ এবং সঠিক তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন চান


যেভাবে উদ্ধার হয় মরদেহ

গত ৩০ জুলাই দক্ষিণখানের ফায়দাবাদ এলাকার জামতলা গলির একটি ভবনের দ্বিতীয় তলার ফ্ল্যাট থেকে সারা রোকসানার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরদিন নিহতের বোন দক্ষিণখান থানায় হত্যা মামলা করেন।

মামলার তথ্য অনুযায়ী, সোহেল রানা সকালে মেয়েকে স্কুলে পৌঁছে কর্মস্থলে যান। বাসায় একা ছিলেন সারা রোকসানা। বিকেলে স্কুল শেষে তাঁদের ১০ বছর বয়সী মেয়ে বাসায় ফিরে মাকে বিছানায় অচেতন অবস্থায় দেখতে পায়। ডাকাডাকিতে সাড়া না পেয়ে সে স্কুলে ফিরে গিয়ে অধ্যক্ষের ফোন থেকে বাবাকে খবর দেয়।

পরবর্তীতে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে এবং ময়নাতদন্তের জন্য শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠায়।


চুরি নাকি পরিকল্পিত হত্যা?

ঘটনার পর প্রথমে ধারণা করা হয়েছিল, জানালার গ্রিল কেটে চোর বা ডাকাত প্রবেশ করে লুটপাটের পর হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। পরিবার জানিয়েছিল, আলমারি থেকে প্রায় ২০ লাখ টাকার স্বর্ণালংকার খোয়া গেছে

তবে তদন্তে কিছু অসঙ্গতি সামনে আসে। পুলিশ আদালতে জানায়—

  • গ্রিল কাটা থাকলেও আশপাশের কেউ কোনো শব্দ শোনেননি,
  • ভেতরের বারান্দায় পাওয়া জুতার ছাপ সোহেল রানার জুতার সঙ্গে মিলেছে,
  • বাইরের ছাদ বা বিপরীত পাশে অন্য কোনো জুতার ছাপ পাওয়া যায়নি,
  • নিহতের মেয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁর মা সাধারণত ভেতর থেকে দরজা আটকে রাখতেন, কিন্তু ঘটনার দিন তা করা হয়নি,
  • সোহেল রানা বাসায় ফিরে স্ত্রীকে ওই অবস্থায় দেখেও তাঁকে স্পর্শ বা চিকিৎসার চেষ্টা করেননি,
  • আলমারির কিছু অংশ অক্ষত ছিল এবং পুরোনো গয়নার খালি বাক্সগুলো গুছিয়ে রাখা ছিল।

এসব কারণে তদন্তকারীদের ধারণা, এটি সাধারণ চুরি বা ডাকাতির ঘটনা নাও হতে পারে


দাম্পত্য কলহের তথ্যও তদন্তে

রিমান্ড আবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, সোহেল রানা দীর্ঘদিন ধরে দাম্পত্য কলহের কথা স্বীকার করেছেন এবং স্ত্রীর একটি সম্পর্ক নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন।

নিহতের পরিবারের অভিযোগ, সোহেল রানা স্ত্রীকে প্রায়ই মানসিক ও শারীরিকভাবে নির্যাতন করতেন এবং তাঁর একাধিক নারীর সঙ্গে সম্পর্ক ছিল। পরিবারের সদস্যদের দাবি, মৃত্যুর কিছুদিন আগে সারা রোকসানা নিজের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন।


তদন্তে এখন গুরুত্ব পাচ্ছে যেসব প্রশ্ন

এই হত্যাকাণ্ডে এখন কয়েকটি বিষয়কে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে—

  • গ্রিল কাটার ঘটনাটি কি সাজানো ছিল?
  • স্বর্ণালংকার সত্যিই খোয়া গেছে কি না,
  • ঘটনার সময় ফ্ল্যাটে আর কেউ প্রবেশ করেছিল কি না,
  • পারিবারিক বিরোধের সঙ্গে হত্যার কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না।

পুলিশ জানিয়েছে, রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে হত্যার প্রকৃত কারণ ও ঘটনার পেছনের বাস্তব চিত্র উদ্ঘাটনের চেষ্টা চলছে